পাগল হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল, ভয় পেয়ে পালাল।
কিচনি দেখে?
ওরে বাবা। বোলো না। নাম করলেই বিপদ।
কিন্তু আপনাকে তো কিচনি কিছু বলেন না!
পাগল গম্ভীর মুখে বলল, ওর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেছে। বলে দুপা পিছিয়ে সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকাল সে। এই! তোমরা রাঁচি থেকে আমাকে ধরতে আসো নি তো?
কখনও না। আমরা কলকাতা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি। তা আপনি নাকি ক’মাস আগে এই গড়ের জঙ্গলে এসে কী দেখে ভয় পেয়েছিলেন। তারপর পাগল হয়ে
পাগল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আমি পাগল না রে ভাই। আমাকে পাগল বললে খুব দুঃখ পাই।
ঠিক আছে আপনি পাগল না। কিন্তু এখানে কেন এসেছিলেন? কেন এখানে এখনও আসেন?
কী কথার ছিরি! আসব না? ছোটবেলা থেকে আসি। আমার চৌদ্দ পুরুষের জায়গা। ঠাকুরমা বলতেন, রোজ গড়ের জঙ্গলে যাবি। বলে সে ঠোঁটে তর্জনী রাখল। নাহ্। বলব না। ঠাকুরমা পইপই করে বলেছিলেন, কাউকে কিছু বলবিনে।
দাদাকেও বলবেন না?
কখনও না।
দিদিকে?
উঁহু।
জোরে মাথা নেড়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে নিচে নামল। তারপর ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে কোথায় লুকিয়ে গেল।
কর্নেল পাথরের চত্বরে উঠে বাইনোকুলারে তাকে খুঁজতে থাকলেন। তারপর বললেন, আশ্চর্য তো! কোথায় গেলেন মন্টুবাবু?
হয়তো কোথাও গুঁড়ি মেরে বসে আছেন।
কর্নেল চত্বর থেকে নেমে বললেন, এস তো। যেদিক থেকে উনি এসেছিলেন, সেই দিকটা একবার দেখা যাক।
উত্তর-পশ্চিম কোণে পাথরের ঘরের যে অংশটুকু টিকে আছে, সেখানে গিয়ে কর্নেল খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে হেসে উঠলেন।
জিগ্যেস করলুম, হাসছেন কেন?
ওই দেখ জয়ন্ত। এখানে-ওখানে কারা খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। আসলে সর্বত্র প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ গুপ্তধনের গুজব রটনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
প্রকৃত পাগল এই গুপ্তধন সন্ধানীরা। বলে কর্নেল পূর্বদিকে ঘুরলেন। চলো। ফেরা যাক। আলো কমে এসেছে।
.
আমরা পূর্বদিকের ভাঙা তোরণের কাছে পৌঁছুলুম। তোরণের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটা উঁচু অশ্বত্থ গাছের ডগা থেকে মন্টু পাগলের চিৎকার শোনা গেল। সেই ছড়াটা সুর ধরে সে আওড়াচ্ছে–
পঞ্চভূতে ভূত নাই
মুখে ঈশ ভজ ভাই
তালব্য শ পালিয়ে গেলে
যোগফলে অঙ্ক মেলে
হর হর ব্যোমভোলা
খাও ভাই গুড়ছোলা।…
আমরা সাবধানে গড়খাই পেরিয়ে গিয়ে সে পথে এসেছিলুম, সেই পথে ফিরে চললুম। বাংলোয় পৌঁছতে ছটা বেজে গেল। দোতলায় উঠে কলিংবেল বাজিয়ে রামপ্রসাদকে ডেকে কর্নেল কফি আনতে বললেন। তারপর দক্ষিণের ব্যালকনিতে বসলেন। এই সময় দরজায় কেউ নক করল। কর্নেল বললেন, কাম ইন।
অবাক হয়ে দেখি, সেই চকরাবকরা গেঞ্জি পরা ষণ্ডামার্কা ভদ্রলোক। তিনি নমস্কার করে বললেন, একটু বিরক্ত করতে এলুম। কিছু মনে করবেন না। জানলা দিয়ে আপনাদের গড়ের জঙ্গল থেকে ফিরতে দেখছিলুম। তাই একটা কথা জিগ্যেস করতে ইচ্ছে হল। আপনারা ওখানে ভয়ঙ্কর চেহারার কালেকুচ্ছিত একটা প্রাণীকে দেখতে পাননি?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আমাদের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য। আমরা চিনির দর্শন পাইনি।
ভদ্রলোক চেয়ারে বসে বললেন, ওহ। আমার একটা হরিল এক্সপিরিয়েন্স হয়েছে।
কর্নেল বললেন, বলুন। শোনা যাক।…
.
তিন
ভদ্রলোকের পরিচয় জানা গেল কথার ফাঁকে। তাঁর নাম হীরালাল রায়। পাটনায় থাকেন। বংশ পরম্পরায় বাঙালি। পাটনায় কন্ট্রাক্টর এবং অর্ডার সাপ্লাই-এর ব্যবসা আছে তার। সিংহগড়ে ব্যবসার কাজে এসেছেন। এখানে এসে গড়ের জঙ্গলে কিচনির গল্প শুনেছেন। তাঁর এই একটা স্বভাব। অদ্ভুত কোনও গল্প শুনলেই তার সত্যমিথ্যা যাচাই করা। তাই তিনি জেদের বশে গড়ের জঙ্গলে গিয়েছিলেন।
.
তারপর ঘুরতে-ঘুরতে একখানে থপথপ শব্দ শুনে চমকে ওঠেন। পরক্ষণে তার চোখে পড়ে, বিশাল ব্যাঙের মতো একটা কালো রঙের জন্তু। কিন্তু মাথায় বড়-বড় চুল আছে। মুখটা ভয়ঙ্কর। দুটো লাল চোখ ঠেলে বেরিয়ে আছে।
দেখামাত্র হীরালালবাবু তার লাইসেন্স করা রিভলভার থেকে দুবার গুলি ছোড়েন। লক্ষভ্রষ্ট হয়েছিল গুলি। তিনি আঁতকে দিশাহারা হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে-যেতে একবার ঘুরে দেখেন, বীভৎস জন্তুটা তাকে তাড়া করে আসছে। তখন আবার একবার গুলি ছোড়েন। কিন্তু এবারও গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তখন তিনি প্রাণভয়ে গড়ের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে আসেন।
আমি বলতে যাচ্ছিলুম, তাকে আমরা পালাতে বা গুলি ছুঁড়তে দেখেছি। কিন্তু কর্নেল আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললেন, আমরা কিন্তু কিছুই দেখিনি। তবে একজন পাগলকে উঁচু গাছের মগডালে চড়ে গান গাইতে দেখেছি।
হীরালাল ভুরু কুঁচকে বললেন, পাগল? গাছের ডালে?
হ্যাঁ। বদ্ধ পাগল ছাড়া আর কে গাছের মগডালে চড়ে গান গাইবে?
এই সময় রামপ্রসাদ কফির ট্রে নিয়ে এল। কর্নেল হীরালালবাবুকে কফি খেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি চা-কফি কিছুই খান না। তিনি এবার বললেন, আপনারা কি কলকাতা থেকে আসছেন?
কর্নেল পকেট থেকে তার নেমকার্ড দিলেন। আমিও আমার নেমকার্ড দিলুম। হীরালালবাবু কার্ড দুটো পড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আপনি রিটায়ার্ড কর্নেল! আর আপনি সাংবাদিক। কর্নেলসায়েব আপনি গভমেন্টকে যদি জানান, তাহলে মিলিটারি পাঠিয়ে গড়ের ঙ্গল খুঁজে আজব জন্তুটাকে ধরে চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেবে। আর জয়ন্তবাবু আপনি খবরের কাগজে ব্যাপারটা লিখলে তা আরও ভালো হয়।
