বাঁদিকে নাক বরাবর এগিয়ে যতই ঢিবির ওপর জঙ্গলটার কাছাকাছি হচ্ছিলুম, কে জানে কেন একটু গা-ছমছম করছিল। জঙ্গলের ছায়া পূর্বে কিছুটা এগিয়ে এসেছে। কারণ সূর্য পশ্চিমের আকাশে একটু ঢলে পড়েছে। চারদিকে অসংখ্য গ্রানাইট পাথর ছড়িয়ে আছে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর। গড়খাইয়ের সামনে পৌঁছে কর্নেল বললেন, ওই দেখ জয়ন্ত। ওইখানে ছিল দুর্গপ্রাসাদে যাওয়ার পথ। ব্রিজ ভেঙে জলে পড়ে গেছে। তবে এই টুকরোগুলোর ওপর দিয়ে জঙ্গলে ঢোকা যায়।
সেখানে গিয়ে লক্ষ করলুম, গড়খাইয়ের এপারে পুরনো রাস্তার কিছু চিহ্ন এখনও আছে। পাথরে বাঁধানো রাস্তার ওপর দু-ধারের মাটি ধুয়ে নেমে পথটাকে লুকিয়ে ফেলেছে। ব্রিজের কাঠামো পাথরে খিলান করা। ওপারে বিশাল তোরণের ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছিল। মধ্যিখানে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। তারপর পাথরের ইটের তৈরি পথের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। নানারকম রঙবেরঙের ফুলে ভরা ঝোঁপঝাড়।
কর্নেল বাইনোকুলারে ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, এস জয়ন্ত। সাবধানে পা ফেলবে। পাথরগুলো পিছল মনে হচ্ছে।
বললাম, ভাববেন না। মাউন্টেনিয়ারিংয়ের ট্রেনিং কাজে লাগাব।
গড়খাইয়ের জলটা কালো এবং কেমন আঁশটে গন্ধ যেন। সম্ভবত রাশিরাশি পাতা পচে এই অবস্থা হয়েছে। পেরিয়ে গিয়ে কর্নেল বললেন, এক মিনিট। দুটো ডাল কেটে লাঠি তৈরি করে নিই। সাপ থাকা খুবই সম্ভব। তা ছাড়া টাল সামলানোর জন্যও লাঠি দরকার।
উনি কিটব্যাগ থেকে ডালকাটা ‘জাঙ্গল নাইফ’ বের করে একটা বেঁটে অজানা গাছের শক্ত দুটো লম্বা ডাল কাটলেন। তারপর লাঠি তৈরি করে একটা আমাকে দিলেন।
দিলেন বটে, কিন্তু সাপের কথা ভেবে প্রতি মুহূর্তে শিউরে উঠছিলুম। ঝোঁপঝাড় এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর একটা উঁচু পাথরের দেয়াল এবং ঘরের একটা অংশ চোখে পড়ল। ঘর বলা উচিত নয়। ঘরের অংশ। লোহার কড়িবরগা কোনও কালে কারা খুলে নিয়ে গেছে। স্থানে স্থানে উঁচু গাছও বিকেলের হাল্কা বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে। জায়গাটা পাখির চিড়িয়াখানা বলা চলে। কর্নেল পাখি দেখছিলেন বাইনোকুলারে। দক্ষিণের ঢালে গাছপালার মাথায় বসে থাকা এক সারস দম্পতির ছবি তুললেন। ক্যামরার টেলিলেন্স ফিট করে নিয়েছিলেন আগেই। তারপর উত্তরে বাইনোকুলারে কী দেখতে-দেখতে চাপা স্বরে বলে উঠলেন। কী আশ্চর্য! জয়ন্ত, বসে পড়।
আমাকে কাঁধ চেপে বসিয়ে দিয়ে কর্নেল বসলেন। জিগ্যেস করলুম, কী?
কর্নেল বললেন, কিচনি নয় মানুষ।
কোনও আদিবাসী হয়তো শিকারে এসেছে?
না। বলে উনি আবার বাইনোকুলার চোখে রাখলেন। আস্তে বললেন, ভদ্রলোককে আমি বাংলোয় দেখেছি। দোতুলার উত্তরদিকের ঘরে উঠেছেন। কিন্তু উনি এখানে কী করছেন?
এতক্ষণে লোকটাকে দেখতে পেলুম। প্যান্ট, চকরাবকরা গেঞ্জি এবং মাথায় টুপি পরা ষণ্ডামার্কা চেহারার একটা লোক। মুখে জমকালো গোঁফ আছে। একটা চ্যাপটা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে এস। একটু পরে সে চমকে ওঠার ভঙ্গিতে ডাইনে ঘুরে দাঁড়াল এবং পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দুহাতে ধরে দুবার গুলি ছুড়ল। নিঝুম জঙ্গলে আচমকা বিকট শব্দ এবং ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি উড়ে পালিয়ে গেল।
লোকটা এবার যেন ভয় পেয়েই পাথর থেকে লাফ দিয়ে নেমে গুঁড়ি মেরে দৌড়োতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে দেখলুম পূর্বের তোরণের ধ্বংস্তূপের কাছে একবার ঘুরে কিছু দেখল এবং আবার একটা গুলি ছুঁড়ে নেমে গেল ঢাল বেয়ে।
কর্নেল এবার একটু উঁচু হয়ে বাইনোকুলারে দেখতে-দেখতে বললেন, পালিয়ে যাচ্ছেন ভদ্রলোক। জানি না, কিচনি দেখে গুলি ছুঁড়ে পালাচ্ছেন কি না। বাংলোয় ফিরে হয়তো আর একজন পাগলের দেখা পাব।
কর্নেলের কৌতুকে কান দিলুম না। বললুম, আপনি অদ্ভুত ঘটনা দেখলে নাক গলান। এটা একটা সাংঘাতিক অদ্ভুত ঘটনা।
হুঁ। একটু অপেক্ষা করো। ভদ্রলোক আরও দূরে চলে গেলে ব্যাপারটা দেখতে যাব।
আমি সেই পাথরের চত্বরটার দিকে লক্ষ রেখেছিলুম। এতক্ষণে দেখলুম, কী আশ্চর্য, সেই মন্টু পাগল চত্বরটাতে উঠে ধেই-ধেই করে নাচছে এবং ছড়াটা আওড়াচ্ছে।
একটু পরে সে অদৃশ্য কোনও লোককে কাতুকুতু দিতে থাকল। মুখে বলছিল সে, কাতুকুতু, কাতুকুতু, কাতুকুতু।
কর্নেল বললেন, পাগলকে দেখে ওই ভদ্রলোক ভয় পেয়ে গুলি করলেন কেন? অমন করে পালিয়েই বা গেলেন কেন? চলো জয়ন্ত আমরা মন্টুবাবুর কাছে যাই।
বললুম, যদি ও ঢিল ছোঁড়ে?
এস তো দেখা যাক।
কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কিছুটা এগিয়ে একটা চাঙড়ে উঠে কর্নেল ডাকলেন, মন্টুবাবু। কাতুকুতু দেব। কাতুকুতু, কাতুকুতু, কাতুকুতু।
অমনি পাগল করজোড়ে বলে উঠল, ওরে বাবা। মরে যাব। মাইরি মরে যাব।
তাহলে চুপটি করে দাঁড়ান।
দাঁড়িয়েই তো আছি মুনিবর। পাগল হেসে অস্থির হল। মুখে দাড়ি দেখলে মাইরি সাধু সন্থেসি মনে হয়। সক্কালে দূর থেকে চোখে কালো চোঙ লাগিয়ে কী দেখছিলে বলো তো?
কর্নেল বললেন, আপনাকে দেখছিলুম। আপনি গাছে-গাছে গেছোবাবা হয়ে ঘোরেন কেন?
পাগল বলল, ঘুরি কি সাধে রে ভাই? দেখতে পেলে যে ওরা ধরে নিয়ে যাবে। তারপর অ্যায়সা কাতুকুতু দেবে, ওরে বাবা!
কথা বলতে-বলতে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কর্নেল। আমি তার পেছনে। পাথরের চত্বরটার কাছাকাছি গিয়ে কর্নেল চাপা গলায় বললেন এক ভদ্রলোক এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হঠাৎ গুলি ছুঁড়তে-ছুঁড়তে পালিয়ে গেলেন কেন?
