পরমেশ্বরী।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, মন্টুবাবু কী একটা ছড়া বলেছিলেন যেন?
অমরজিৎ হাসলেন। ঠাকুরমা আমাদের দু-ভাইকে ওই ছড়াটা শেখাতেন। কিছু বুঝি না।
ছাড়াটা কী যেন?
অমরজিৎ আওড়ালেন :
পঞ্চভূতে ভূ নাই
মুখে ঈশ ভজ ভাই
তালব্য শ পালিয়ে গেলে
যোগফলে অঙ্ক মেলে
হর হর ব্যোমভোলা
খাও ভাই গুড় ছোলা।…
গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে অমরজিৎ জিগ্যেস করলেন, আপনারা কোথায় উঠেছেন কর্নেলসায়েব?
কর্নেল বললেন, সরকারি ডাকবাংলোতে। আমরা কয়েকটা দিন আছি। সকাল নটায় ব্রেকফাস্টের সময় কিংবা সন্ধ্যার দিকে বাংলোয় থাকব। যদি ওখানে যান, খুশি হব। আপনাদের বংশের ঘটনাগুলো ভারি অদ্ভুত। আমারও অনেকরকম হবি আছে। অদ্ভুত-অদ্ভুত ঘটনা ঘটলে আমি সেখানে নাক গলাই।
অমরজিৎ কথাটা শুনেই চাপা গলায় বলে উঠলেন, তাহলে আজ সন্ধ্যায় আমি যাব। কারণ, বলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিলেন। থাক। যথাসময়ে সব বলব।
কর্নেল অর্কিড ভর্তি থলেটা আমাকে দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, জয়ন্ত! পাগলের হাতে কাতুকুতু খেয়ে তুমি জামাটা নোংরা করে ফেলেছ।
দেখে নিয়ে বললুম, ছ্যা, ছ্যা। কালি মাখিয়ে দিয়েছে দিখছি। ওর আঙুলে কালি লেগে ছিল।
কালি নয়। মনে হচ্ছে, পচা পাঁক ঘেঁটেছিল কোথাও। বলে কর্নেল হাসলেন। তুমি একটা কথা মনে রেখ। পাগল যা-যা করবে, তুমিও ঠিক তাই-তাই করলে সে তোমাকে পাগল ভেবে তক্ষুনি পালিয়ে যাবে। তুমি যদি ওকে পাল্টা কাতুকুতু দিতে, দেখতে ও তখুনি বলত, আরে, এ যে দেখছি এক পাগল। তারপর কেটে পড়ত।
বলেন কী? কোনও বইয়ে পড়ছেন বুঝি?
হ্যাঁ। পড়েছি। এই আচরণকে ইংরেজিতে বলে লোগোথেরাপি। এই মন্টু পাগল আজ আমাকেও কাতুকুতু দিতে হামলা করেছিল। আমি উল্টে ওকে কাতুকুতু দিতে গেলুম। কাতুকুতু কাতুকুতু কাতুকুতু। ব্যাস মন্টু থমকে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বলে উঠল, দুচ্ছাই। এ যে দেখছি একটা বদ্ধ পাগল। বলে কেটে পড়ল।
আপনার ‘লোগোথেরাপি’ অনুসারে তোতলাদের সঙ্গে তোতলামি করতে গেলে কিন্তু বিপদ।
না। তোতলামি সারাতে তোতলাদের কোনও নাটকে তোতলার পার্ট দিতে হয়। আমি বলছি পাগলদের কথা। কর্নেল বাইনোকুলারে কী দেখে নিলেন। তারপর বললেন, কী কাণ্ড। পাগল মন্টু একটা গাছের মগডালে চড়ে বসে আছে দেখছি। আগে জানলে ওকে দিয়েই অর্কিডটা পেড়ে নিতুম।
.
দুই
দুপুরে আমাদের ঘরে ক্যান্টিন-বয় খাবার দিতে এল। কর্নেল তাকে জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?
সে বিনীতভাবে বলল, আমি রামপরসাদ আছি স্যার।
আচ্ছা রামপ্রসাদ, এখানে গড়ের জঙ্গলটা কোথায়?
সে একটু ভেবে নিয়ে বলল, জি সার, আপনি কিনি-কিলার কথা বলছেন?
কিচনি কেন?
রামপ্রসাদ মুখে ভয়ের ছাপ ফুটিয়ে বলল, ওহি কিলার চারতরফ খাদা আছে সার। বহত পানি ভি আছে। খাদার পানিতে কিচনি আছে।
কর্নেল হাসলেন। তুমি দেখেছ?
না সার। উয়ো কিচনি যিসকো দেখা দেতি, উয়ো পাগলা হো য়াতা। অর মর যাতা।
রামপ্রসাদ চলে গেলে জিগ্যেস করলুম, কিচনি কী?
জলের প্রেতিনী। শুনলে তো? যাকে সে দেখা দেয়, সে পাগল হয়ে মারা পড়ে। মন্টু–মানে বিক্রমজিৎ সিংহ তাহলে গড়ের জঙ্গলে কিচনি দেখেই পাগল হয়েছে।
যত সব বাজে কুসংস্কার।
কর্নেল মাছের টুকরো থেকে কাটা ছাড়িয়ে মুখে ভরলেন। বললেন, এখানে নদী থাকায় মাছের অভাব নেই। কী অপূর্ব স্বাদ। আমার ধারণা গড়ের জঙ্গলের গড়খাইয়ে যে মাছগুলো আছে, তাদের স্বাদ আরও খাসা। সঙ্গে ছিপ আনলে মাছ ধরার চেষ্টা করতুম।
হেসে ফেললুম। তারপর কিচনি দেখে পাগল হয়ে আমাকে বিপদে ফেলতেন। আপনাকে রাঁচির কাকে উন্মাদাশ্রমে পাঠাতে হত।
তবে যে বললে বাজে কুসংস্কার?
হ্যাঁ। তবে কুসংস্কার মানুষকে নির্বোধ করে ফেলে এই যা।
কর্নেল তারিয়ে-তারিয়ে মাছ খেতে-খেতে বললেন, দেড়টা বাজে। আড়াইটেতে আমরা গড়ের জঙ্গল দেখতে যাব। সাবধান জয়ন্ত, তুমি যেন হঠাৎ কিছু দেখে নির্বোধ হয়ে পড়ো না।
খাওয়ার পর রামপ্রসাদ ট্রে নিতে এল। কর্নেল তাকে বললেন, রামপ্রসাদ! তুমি তখন সবই বললে। কিন্তু কিচনিকেলা কোথায় তা তো বললে না?
সে পশ্চিমের খোলা জানালার দিকে আঙুল তুলে বলল, উয়ো দেখিয়ে সার। ওহি জঙ্গল আছে।
লক্ষ করে দেখলুম, প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটা উঁচু ঢিবি দেখা যাচ্ছে। সেটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। যতদূর দেখা যাচ্ছে, ঢেউ খেলানো মাঠ–কোথাও আবাদি, কোথাও অনাবাদি এবং ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা। তিনদিকে আরও দূরে নীল পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় সাদা মেঘ ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাংলোর নিচে দক্ষিণে একটা কাঁচা রাস্তা এগিয়ে গেছে। এঁকেবেঁকে অসমতল সবুজ প্রান্তরের বুক চিরে রাস্তাটা হয়তো কোনও পাহাড়ি জনপদে পৌঁছেছে।
কিছুক্ষণ পরে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। কর্নেল যথারীতি পিঠে কিটব্যাগ এঁটে এবং তার মধ্যে প্রজাপতি ধরা জাল খুঁজে রেখেছেন। স্টিকটা টিনের ফাঁকে বেরিয়ে আছে। গলায় ঝুলছে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার। রোদ থেকে টাক বাঁচাতে চুপি পরেছেন। পায়ে হান্টিং বুট পরেছেন। একেবারে অভিযাত্রীর প্রতিমূর্তি।
আমরা কাঁচা রাস্তায় জলকাদা বাঁচিয়ে সাবধানে হাঁটছিলুম। কর্নেল মাঝে মাঝে থেমে বাইনোকুলারে কিছু দেখছিলেন। পাখি কিংবা প্রজাপতি।
দূরের কোনও পাহাড়ি গ্রাম থেকে একদল আদিবাসী আসছিল। তারা আমাদের দেখেও দেখল না। পাশ দিয়ে নিজেদের ভাষায় কথা বলতে-বলতে চলে গেল। প্রায় আধঘণ্টা চলার পর দেখলুম, রাস্তাটা গড়ের জঙ্গলকে এড়িয়ে উত্তর-পশ্চিমে চলে গেছে। সেখানে একটা অনুর্বর ব্লাড় জমির উপর দিয়ে কর্নেল হাঁটতে শুরু করলেন। বললেন, গড়ের জঙ্গলে মানুষজন সত্যি যায় না দেখা যাচ্ছে। কোনও পায়ে চলা পথের চিহ্ন নেই।
