রাস্তায় গিয়ে অমরজিৎ বললেন, এখানে একসময় প্রচুর বাঙালি ভদ্রলোক বাস করতেন। এখন অনেকেই বাড়ি বেচে দিয়ে বা ফেলে রেখে চলে গেছেন। কালেভদ্রে বাঙালিরা এখানে বেড়াতে আসেন। আপনারা দয়া করে যদি গরিবের বাড়িতে একবার পায়ের ধুলো দেন, খুশি হব।
কর্নেল বললেন, অবশ্যই। বিশেষ করে আপনার পূর্বপুরুষই এই সিংহগড়ের প্রতিষ্ঠাতা। আপনার কাছে পুরনো কথা শুনলে ভালো লাগবে।
গেটটা লোহার। কিন্তু মরচে ধরে অর্ধেকটা ভেস্তে গেছে। বাউন্ডারি ওয়াল মোটামুটি টিকে আছে। উঠোনে শুকনো ফোয়ারা এবং গাড়িবারান্দা বা পোর্টিকো আছে। দোতলা বাড়ি। আমাদের নিচের হলঘরে বসিয়ে অমরজিৎ ওপরে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, দিদিকে বললুম আপনাদের কথা। আপনারা অতিথি। অন্তত এক কাপ চা না খাওয়ালে চলে?
ঘরটা হলঘরই বটে। একপ্রান্ত থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি আছে সিঁড়িটা কাঠের। বনেদিয়ানার নিদর্শন এটা। কিন্তু ঘরে আসবাবপত্র তেমন কিছু নেই। কয়েকটা ছেঁড়াফাটা গদি আঁটা চেয়ার আর একটা বিশাল গোল টেবিল। একপাশে তক্তাপোশ মাদুর পাতা এবং একটা বিছানা গোটানো আছে।
আমরা চেয়ারে বসলুম। উল্টোদিকে মুখোমুখি অমরজিৎ বসে একটু হেসে বললেন, যমপুরীর যম হয়ে বসে আছি কর্নেলসায়েব। কিন্তু যম তো ধনসম্পদ পাহারা দেয়। আমি কি পাহারা দিচ্ছি? শুধু বংশের স্মৃতি এই বাড়িটা। বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেই গায়ের জোরে কেউ দখল করে ফেলবে। যেমন, বেশ কিছু বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। এদিকে বাড়ি যে বেচব, কিনবে কে? এদিকটায় লোকে আসতে চায় না। কারণ, টাউনশিপের দিকে যেসব সুযোগসুবিধা–রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, জলের কল এসব আছে, এদিকটায় সেসব নেই। কুয়ো থেকে জল তুলতে হয়। বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। পুর্বদিকে ধারিয়া নদীর ধারে একটা জেলেবসতি আছে। তারা গরিব লোক। মহাজন তাদের রক্ত শুষে নেয়।
কর্নেল বললেন, আপনি দেবতার অভিশাপের কথা বলেছিলেন।
অমরজিৎ জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠাকুরদার ঠাকুরদা যে দুর্গপ্রাসাদে বাস করতেন, সেটা এখন ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গল। ঠাকুরদা বাবার আমলে জমিদারির খানিকটা টিকে ছিল। তিনিই এই বাড়িটা তৈরি করেছিলেন। মাঝে-মাঝে এসে এই বাগানবাড়িতে বাস করতেন। পরে দুর্গপ্রাসাদ মেরামতের অভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। তখন শেষ জীবনটা এ বাড়িতে কাটান। সেই সময় দুর্বুদ্ধিবশে তিনি গৃহদেবতার রত্নালঙ্কার বিক্রি করে ব্রিটিশ সরকারের প্রাপ্য বার্ষিক কর পরিশোধ করেন। কর না মেটালে জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যেত। ব্যাস! গৃহদেবতার অভিশাপ লাগল। ঘোড়ায় চড়ে যেতে-যেতে হঠাৎ সেই ঘোড়া কেন যেন খেপে গিয়ে তাকে পিঠ থেকে ফেলে দেয়। তিনি পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা যান। আমার ঠাকুরদা শত্রুজিৎ সিংহের বাতিক ছিল পায়রা পোষা। এ বাড়ির ছাদে পায়রা ওড়ানোর সময় তিনি পা ফস্কে নিচে পড়ে মারা যান। আমার বাবার নাম ছিল ইন্দ্রজিৎ। তাঁর শখ ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর। ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে তিনিও
অমরজিৎ হঠাৎ থেমে গেলেন। ওপর থেকে সাদা থানপরা এক মহিলা মৃদুস্বরে ডাকছিলেন, ঝন্টু, ঝন্টু!
অমরজিৎ সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে একটা ট্রে নিয়ে এলেন। তাতে দুকাপ চা আর দুটো প্লেটে দুটো করে সন্দেশ ছিল। তার অনুরোধে সন্দেশ খেতে হল। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, আশ্চর্য লাগছে। পর-পর দুর্ঘটনায় মৃত্যু!
অমরজিৎ বললেন, অভিশাপ। তাছাড়া আর কী বলব? ঠাকুরমা আমাদের দু-ভাই এবং দিদিকে মানুষ করেছিলেন। দিদির বিয়ে দিয়েছিলেন পাটনায়। জামাইবাবু ছিলেন রেলের অফিসার। বিয়ের দু-মাস পরে তিনি ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। অথচ আমাদের বংশের ওপর দেবতার অভিশাপ।. যাই হোক, ঠাকুরমা মারা গেলে দিদি আমাদের দুই নাবালক ভাইয়ের গার্জেন হলেন। জমিদারি বাবার আমলেই হাতছাড়া হয়েছিল। কিছু জমি আর একটা আমবাগানের জোরে প্রাণরক্ষা। এখানকার আম খুব বিখ্যাত। গ্রীষ্মে এলে আম খাওয়াতে পারতুম। তবে চোরের উৎপাতে অস্থির। আজকাল গাছের মুকুল এলে আম ব্যবসায়ীদের বিক্রি করে দিই। একথোক টাকা পাই।
কর্নেলে চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপনার ভাই পাগল হয়েছেন কবে?
গত ডিসেম্বরে মন্টু–মানে বিক্রমজিৎ গড় জঙ্গলে ঢুকেছিল। ওর পাখি পোষার বাতিক আছে। পাখি ধরতে গিয়েছিল ওর বন্ধু মাধবের সঙ্গে। মাধবের কাছেই শুনেছিলুম, হঠাৎ মন্টু পা হড়কে পড়ে যায়। তারপর হাত-পা ছুঁড়ে প্রলাপ বকতে-বকতে দৌড়ুতে থাকে। মাধব আমাকে খবর দিয়েছিল। কয়েকজন লোক নিয়ে ওকে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। হঠাৎ একটা গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আবোলতাবোল কী সব বলতে শুরু করল। ওকে ধরে নিয়ে এলুম। তারপর শেষে কাকে হাসপাতালে রেখে এলুম। কিছুদিন আগে কীভাবে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। শুধু দিদির কথা শোনে। রাতে ওই বিছানায় শুয়ে থাকে। দরজার ভেতরে তালা এঁটে দিই। সারা রাত প্রলাপ বকে। দেবতার অভিশাপ ছাড়া আর কী বলব? বাবার মৃত্যুর পর মা হৃদরোগে মারা যান। শুধু আমি আর দিদি অভিশাপ থেকে এখনও পর্যন্ত মুক্ত আছি। সবই দেবতার রহস্যময় লীলা। আমাদের দুজনকে হয়তো আরও সাংঘাতিক কোনও শাস্তি দেবেন।
.
আপনার দিদির নাম কী?
