হ্যাঁ–একটা অদ্ভুত ছড়া।
তবে ঘটনাটা গোড়া থেকেই বলা যাক। সিংহগড় বিহারের একটা সমৃদ্ধ শিল্পকেন্দ্র। আমরা উঠেছিলুম জনপদ থেকে একটু দূরে ধারিয়া নদীর তীরে একটা টিলার গায়ে সরকারি ডাকবাংলোতে। রাত্রে পৌঁছে ভোরে যথারীতি কর্নেল মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলেন। এবং ফিরে এসে আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরুব, জয়ন্ত। সিংহগড়ের পুরনো বসতি এলাকায় একটা গাছে দুর্লভ প্রজাতির একটা অর্কিড দেখে এলুম। অত উঁচুতে এই প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে উঠতে পারলুম না। এবার গিয়ে দেখা যাক, উঁচু গাছে চড়ার জন্য কোনও লোক খুঁজে পাই নাকি। খিদে পেয়েছিল বলে তাড়াতাড়ি চলে এলুম।
ব্রেকফাস্ট করে আমরা ন’টা নাগাদ বেরিয়েছিলুম। পাহাড়ি এলাকা। পুরনো বসতি নির্জন খাঁ-খাঁ করছিল। রাস্তাটাও এবড়ো-খেবড়ো। দু-ধারে ঢেউ খেলানো মাটির ওপর একটা করে পুরনো বাড়ি। অনেক বাড়িরই চৌহদ্দির পাঁচিল ভেঙে পড়েছে। বাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, বাগানবাড়ির মতো। রাস্তার দু-ধারে যত ঝোঁপঝাড়, তত গাছ। কর্নেল আমাকে একখানে দাঁড়াতে বলে সামনে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। সেই বাড়িটার উঠোনে একটি কিশোর গরু চরাচ্ছিল। ঘাস আর ঝোঁপঝাড় ভর্তি উঠোন।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ওপর থেকে মাথায় ঝাকড়মাকড় চুল, মুখে গোঁফদাড়ি, গায়ে ময়লা, ছেঁড়া হাওয়াই শার্ট, পরনে হাঁটু থেকে ছেঁড়া পাতলুন, একটা লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে হি-হি হেসে বলল, এই ছড়াটা বল দিকি! নইলে কাতুকুতু দেব।
বলেই সে আওড়াল :
পঞ্চভূতে ভূত নাই
মুখে ঈশ ভজ ভাই
তালব্য শ পালিয়ে গেলে
যোগফলে অঙ্ক মেলে
হর হর ব্যোমভোলা
খাও ভাই গুড়ছোলা।।…
আমি চমকে গিয়ে হতবাক। সে আমাকে নোংরা আঙুলে কাতুকুতু দিতে শুরু করল। বল। বল। নইলে কাতুকুতু-কাতুকুতু-কাতুকুতু…
অগত্যা চেঁচিয়ে ডাকলুম, কর্নেল! কর্নেল! কর্নেল সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছেন। আমার চিৎকার কানে ঢুকছে না। এদিকে পাগল আমাকে ছড়াটা না শিখিয়ে ছাড়বে না। বারবার ছড়াটা বলছে আর কাতুকুতু দিচ্ছে। তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতেও পারছি না।
সেই সময় ডানদিকের বাড়ি ভাঙাচোরা গেট সরিয়ে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে একটি ছড়ি। তিনি তাড়া করে এলেন। অ্যাই বাঁদর। আবার বদমাইসি শুরু করেছ? লাঠিপেটা করব হতভাগাকে।
পাগল সঙ্গে-সঙ্গে আমাকে ছেড়ে দিয়ে এক দৌড়ে গাছপালার ভেতর উধাও হয়ে গেল। ভদ্রলোক বললেন, কিছু মনে করবেন না। ও আমার ছোটভাই বিক্রমজিৎ। ক’মাস থেকে উন্মাদ রোগে ভুগছে। রাঁচির কাছে কাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলুম। সেখান থেকে পালিয়ে এসে লোককে জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে। তা আপনারা কি কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছেন?
এতক্ষণে কর্নেল ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। বললেন, কী হয়েছে জয়ন্ত?
ভদ্রলোক বিব্রতভাবে বললেন, তেমন কিছু না। আমার ভাইয়ের কথা হচ্ছিল। আমার ভাই বিক্রমজিৎ উন্মাদ রোগে ভুগছে।
কর্নেল হেসে ফেললেন। জয়ন্তকে কাতুকুতু দিচ্ছিল দেখলুম। আপনি কি এখানকার বাসিন্দা?
ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ। আমার নাম অমরজিৎ সিংহ। এই বাঙালিটোলায় থাকি। ওই আমার বাড়ি। আপনাদের পরিচয় পেলে খুশি হতুম।
কর্নেল তার একটা নেমকার্ড এঁকে দিলেন। উনি সেটা পড়ে বললেন, আপনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার? নেচারিস্ট মানে?
প্রকৃতি প্রেমিক বলতে পারেন। আর আমার এই তরুণ বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার রিপোর্টার। অমরজিৎ আমাদের নমস্কার করে বললেন, কী বলব কর্নেলসায়েব! আমারই পূর্বপুরুষের নামে সিংহগড় নাম। একসময় আমার পূর্বপুরুষ এখানকার জমিদার ছিলেন। তাদের পদবি ছিল রাজা। এখন প্রায় নিঃস্ব অবস্থা বলতে পারেন। অভিশাপ কর্নেলসায়েব। দেবতার অভিশাপ।
কর্নেল বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহ হচ্ছে। তবে আমার এই হবি। ওই গাছের ডগায় একটা অর্কিডের ঝাড় আছে। এই ছেলেটিকে দিয়ে সেটা পেড়ে আনাই আগেই। তারপর কথা হবে।
অমরজিৎ সিংহ বললেন, চলুন। আপনাদের সঙ্গে যাই নইলে পাগল বিক্রমজিৎ হয়তো আবার উৎপাত শুরু করবে। এদিকটাতে বাইরের লোক দেখতে পেলেই ওর পাগলামি বেড়ে যায়।
বাঁ-দিকে পোড়ো একটা বাড়িরই অংশ ছিল জায়গাটা। সেখানে জঙ্গল হয়ে আছে। একটা বিশাল শিরীষ গাছের ডগায় কর্নেল অর্কিড়টা ছেলেটিকে দেখিয়ে দিলেন। সে তরতর করে চড়ে গেল ডগায় এবং কর্নেলের নির্দেশ মতো অর্কিডের ঝাড়টা উপড়ে নিয়ে নেমে এল। কর্নেল তাকে দশ টাকা বখশিস দিলেন। সে খুশি হয়ে চলে গেল।
.
কর্নেল পিঠে আঁটা কিটব্যাগ থেকে একটা পলিথিনের থলি বের করলেন। থলির ভেতর কালো কাদার মতো জিনিসের ওপর অর্কিডের ঝাড়টা বসিয়ে দিয়ে বললেন, ব্যাস! আমার কাজ শেষ।
অমরজিৎ বললেন, থলের তলায় এগুলো কি সার? কর্নেল হাসলেন। সার বলার চেয়ে পরজীবী এই উদ্ভিদের খাদ্য বলা উচিত। ওগুলো পচা কাঠের গুঁড়ো। তার সঙ্গে কিছু মাটি মেশাতে হয়েছে। আসলে কাঠে কার্বন আছে। গাছের ডালের কোনওে খোঁদলে বৃষ্টির জল জমে জায়গাটায় পচন ধরে। সেখানে অর্কিডের সূক্ষ্ম বীজকণিকা বাতাসে উড়ে এসে পড়লে অর্কিড় গজায়। তার খাদ্য ওই পচা কাঠের কার্বন।
