–হুঁউ। তবে তুমি স্নান করে ফেলো গরম জলের ব্যবস্থা আছে। আজ আমিও স্নান করব। স্নানের পর খাওয়া-দাওয়া সেরে কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–একটু জিরিয়ে নাও। তিনটেয় বেরুব। শীতের বেলা তিনটে মানে আলোর দফারফা। হাঁসখালির বিলে আজ আর পাওয়া হবে না। গঙ্গার ধারে বাঁধের পথে বরং হাটছড়ি গ্রামের পুরনো শ্মশানে গিয়ে প্রাচীন সামন্তরাজাদের প্রত্ন নিদর্শন দেখব। শুনলুম একসময় ওখানে শ্মশানকালীর মন্দির ছিল। অমাবস্যার রাতে নরবলি হত।
তিনটেয় আমরা গঙ্গার ধারে বাঁধের ওপর নির্জন একফালি রাস্তায় হাঁটছিলুম। ডাইনে নিচে গঙ্গা। বাঁদিকে ঘন জঙ্গল। প্রায় আধ কিলোমিটার হাঁটার পর দেখলুম, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একফালি রাস্তা এসে বাঁধে মিশেছে। নিচে ঘাট। একটু এগিয়ে বিশাল বটগাছ এবং মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ চোখে পড়ল। তার পাশে শ্মশান। এখনও মড়া পোড়ানো হয়। তাই খানিকটা জায়গা জুড়ে চিতার ছাই, ভাঙা মাটির কলসি এইসব জিনিস পড়ে আছে।
কর্নেল বটগাছের পেছনে প্রকাণ্ড পাথরের চাঙড়ের ওপর বসে বললেন,–চুপটি করে বোসো।
বললুম,–এই পাথরটা বুঝি সামন্তরাজাদের আমলের?
-চুপ। কথা নয়।
কর্নেল বাইনোকুলারে গঙ্গাদর্শন করতে থাকলেন। বুঝতে পারছিলুম না, এখানে এভাবে চুপচাপ বসে থাকার মানেটা কী! ক্রমে সূর্য গঙ্গার ওখানে গাছপালার আড়ালে নেমে গেল। কিছুক্ষণ গঙ্গার জলে লাল ছটা ঝকমক করতে থাকল। তারপর ধূসরতা ঘনিয়ে এল। এই সময় চোখে পড়ল, একটা ছোট নৌকা এসে ঘাটে ভিড়ল। অমনি কর্নেল আমাকে ইশারায় গুঁড়ি মেরে বসতে বললেন।
তারপর যা দেখলুম, ভীষণ অবাক হয়ে গেলুম। কম্বল মুড়ি দিয়ে একটা লোক জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। সে নৌকোর মাঝিকে নৌকাটা আরও একটু এগিয়ে আনতে ইশারা করল। সঙ্গে-সঙ্গে কর্নেল দৌড়ে গিয়ে কম্বল মুড়ি দেওয়া লোকটিকে ধরে ফেললেন। আশেপাশের ঝোঁপঝাড় থেকে কয়েকজন পুলিশকেও বেরুতে দেখলুম। কর্নেল বললেন,–অক্ষয়বাবু! কাঠের সাঁকোয় পা হড়কে পড়ে হাঁটু ভাঙার ভান করেছিলেন। এক রিকশওয়ালার কাছে সে-কথা শুনেছি। দ্বিতীয়বার প্রেতাত্মার চাঁটি খেয়ে নয়, মিথ্যামিথ্যি এখানে আবার আছাড় খেয়েছেন বলে নাড়ুবাবু ডাক্তারের সার্টিফিকেট জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আপনি দিব্যি হাঁটতে পারেন। তা ছাড়া আপনি বন্দুকবাজও বটে। ভক্তিবাবুর মুখ বন্ধ করতে গুলি ছুঁড়েছিলেন। ভাগ্যিস, আমি সতর্ক ছিলুম।
ততক্ষণে দুজন কনস্টেবল অক্ষয়বাবুকে ধরে ফেলেছে। কর্নেল একটানে কম্বল সরাতেই দেখা গেল, তার হাতে একটা পুঁটুলি। কেড়ে নিয়ে কর্নেল বললেন,–এর মধ্যে নৃসিংহদেবের রত্নমুকুট আর মুক্তোর হার আছে।
অক্ষয় সাঁতরা মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। নৌকাটা পালিয়ে যাচ্ছিল। একজন কনস্টেবল লাফ দিয়ে নৌকায় উঠে আটকাল। মাঝি বলল,–আমার কোনও দোষ নেই স্যার! ধানুকে দিয়ে বড়কর্তাবাবু খবর পাঠিয়েছিলেন নৌকায় চেপে ওপারে যাবেন।
জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে এতক্ষণে ও.সি তরুণ রায়কে আসতে দেখলুম। উনি এসে সহাস্যে বললেন, তাহলে পাখি ডানা মেলতে যাচ্ছিল দেখা যাচ্ছে। বাহ! দিব্যি দুই ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে আছেন সাঁতরাবাবু। চলুন! এবার শ্রীঘরে গিয়ে বসবাস করবেন। বৈমাত্রেয় ভাই কালীপদ সাঁতরাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে খুন করার অভিযোগ আপনাকে গ্রেফতার করা হল। চলুন তাহলে। আর কী?
কর্নেল বাঁধের পথে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন,–পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ধারালো কিছু ভারী জিনিস দিয়ে মাথার পেছনে তিন জায়গায় আঘাত করার কথা বলা হয়েছে। হাতুড়িটা পেছনে ঝোঁপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন অক্ষয়বাবু। আমি সেটা সকালেই কুড়িয়ে পেয়েছিলুম। হাতুড়িটার একদিক শূলের মতো। অন্যদিক ভোতা। শূলের দিকে মারলে অনেকটা ভালুকের নখের আঘাত বলে মনে হতে পারে তবে হাতুড়িটা অর্ডার দিয়ে বানানো। এক আঘাতেই মগজের ঘিলু ভেদ করে ফেলবে। মিঃ রায়! আপনারা এগোন। আমরা দুজনে ধীরেসুস্থে যাচ্ছি।
পুলিশের দলটি আসামিকে নিয়ে এগিয়ে গেল। নৌকাটায় একজন কনস্টেবল বসে আছে এবং মাঝি বেচারা কিনারায় লগি মেরে উজানে নিয়ে চলেছে।
কর্নেল একখানে দাঁড়িয়ে চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন,–কী জয়ন্ত? কেমন রোমাঞ্চকর স্টোরি পেয়ে গেলে! আসলে অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি বলে একটা প্রবচন আছে। নিজেকে নিরাপদে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যেই অক্ষয় সাঁতরা এতসব আয়োজন করেছিলেন। তাঁর বন্ধু ভক্তিভূষণ হাটি কবুল করেছেন, একসময় অক্ষয় সাঁতরা এশিয়ান সার্কাসের ম্যানেজার ছিলেন। বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনে চাকরি ছেড়ে হাটছড়িতে ফিরে এসেছিলেন। তার বাবার মৃত্যুর আগে নবঠাকুরকে গোপনে একটা চাবি দিয়ে বলেছিলেন, অক্ষয় ফিরে এলে যেন চাবিটা তাকে তিনি দেন। নবঠাকুর জানতেন না চাবিটা কীসের। অক্ষয়বাবুও সম্ভবত জানতেন না। কালীপদবাবুই তাকে গোপন কথাটা বলে থাকবেন। কারণ ধনরত্নের লোভ সাংঘাতিক লোভ।
–নবঠাকুর তা-ই বলেছেন বুঝি?
হা।–বলে কর্নেল পা বাড়ালেন, চলো জয়ন্ত! বাংলোয় ফিরে কড়া কফি খাওয়া যাক। গঙ্গার হাওয়া বেজায় ঠান্ডা।…
৩.১০ সিংহগড়ের কিচনি-রহস্য
সেবার অক্টোবর মাসে কর্নেলের সঙ্গে সিংহগড়ে বেড়াতে গিয়ে এক অদ্ভুত পাগলের পাল্লায় পড়েছিলাম। অদ্ভুত বলার কারণ, সে আচমকা একটা গাছের ডাল থেকে আমার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে কাতুকুতু দিয়ে অস্থির করছিল একটা ছড়া শেখানোর জন্য।
