ইতি–আশীর্বাদক অঃ কুঃ
ও.সি. তরুণ রায় চিঠি ভাঁজ করে পকেটে রেখে সহাস্যে বললেন,–অঃ কুঃ মানে অক্ষয়কুমার! অক্ষয়বাবু তাহলে আপনি লাঠি ধরে আজ শেষ রাত্রে মন্দিরে গিয়েছিলেন?
অক্ষয়বাবু জোরে মাথা নেড়ে বললেন,–না, না! আমি চিঠিটা লিখেছিলুম বটে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়ে প্রচণ্ড ব্যাথার চোটে পা বাড়াতে পারিনি। ওই ভালুকবেশী বদমাস জানত না দুটো চাবি ছাড়া বেদি খোলা যাবে না। বেশ বুঝতে পারছি, ওই শয়তানটা কালীপদর চাবি হাতিয়ে রত্নমুকুট আর মুক্তোর হার চুরি করার লোভে কালীকে খুন করেছে! ব্যাটা ওঁত পেতে ছিল কোথায়!
ও.সি. বললেন, কিন্তু হাটিবাবু রত্নমুকুট এবং মুক্তোর হারের কথা জানল কীভাবে?
কালীটা ছিল বোকা! অক্ষয়বাবু বললেন, কালী আমাকে বিশ্বাস করতে না পেরে নিশ্চয় ওকে কিছু বলেছিল। বিশ্বাস করুন, আমি পা নড়াতে পারি না। দু-দুবার আছাড় খেয়ে হাঁটুর মালাইচাকি ভেঙে গেছে। নাড়ু ডাক্তারকে জিগ্যেস করলে জানতে পারবেন। তিনি আমার সাক্ষী। এই দেখুন তাঁর প্রেসক্রিপশন। এক্সরে প্লেটও দেখাচ্ছি।
কর্নেল বললেন,–থাক। মিঃ রায়! অক্ষয়বাবুর বন্দুকটা আপাতত পুলিশের কাছে জমা থাক। কী বলেন?
ও.সি. বন্দুকটা নিয়ে বললেন, হ্যাঁ। ভাইয়ের শোকে অক্ষয়বাবুর মাথার ঠিক নেই। রাগের চোটে যাকে-তাকে গুলি করে মারতে পারেন। বিশেষ করে হাটিবাবুকে লক্ষ করে উনি গুলি ছুঁড়েছিলেন।
কর্নেল বললেন,–অক্ষয়বাবু! তা হলে আপনার বক্তব্য, আমার রহস্য ফাঁস করার ক্ষমতা পরীক্ষার জন্যই আপনি প্রেতাত্মার আয়োজন করেছিলেন?
অক্ষয়বাবু জোর দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। শয্যাশায়ী হয়ে আছি। সময় কাটে না। তাই আপনাকে নিয়ে একটু মজা করতে চেয়েছিলুম। জানতুম না, নির্বোধ কালী ওই ভক্তি হাটির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করবে।
ঠিক আছে।–কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, তা হলে আপনার পরীক্ষায় আমি পাস করেছি। এবার কলকাতা ফিরে যাই। ওঠো জয়ন্ত!
আমরা নিচে গিয়ে গেস্টরুম থেকে আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ও.সি. তরুণ রায়ের সঙ্গে হেঁটে চললুম। দুজন কনস্টেবলও তার আদেশে চলে এল। সাবধানে কাঠের সাঁকো পেরিয়ে গিয়ে কর্নেল বললেন,–তা হলে মিঃ রায়! আমরা বনদফতরের বাংলোয় গিয়ে উঠছি। আশা করি, যথাসময়ে দেখা হবে।
ও.সি একটু হেসে বললেন,–ভাববেন না। পাখি ডানা মেলার সুযোগ পাবে না। এতক্ষণ লোক। চলে গেয়ে যথাস্থানে।
একটা সাইকেল রিকশতে চেপে আমরা গঙ্গার ধারে বনদফতরের বাংলোতে পৌঁছলুম। কর্নেল বললেন,–কৃষ্ণনগরে এস. পি সায়েবকে বলে বাংলোর একটা ঘর বুক করে রেখেছিলুম। আমার ধারণা ছিল, আমরা সাঁতরা বাড়িতে থাকার রাতেই কিছু ঘটবে। অঙ্ক জয়ন্ত, স্রেফ অঙ্ক!
বাংলোর কেয়ারটেকার আমাদের দোতলায় দক্ষিণ-পশ্চিমের একটা ডাবলবেড ঘরে নিয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন,–আগে এক দফা কফি আর কিছু স্ন্যাক্স। সাড়ে নটায় ব্রেকফাস্ট করব।
দক্ষিণের ব্যালকনিতে রোদ পড়েছে। পশ্চিমে গঙ্গা। দক্ষিণে ভাঙনরোধী ঘন জঙ্গল। ঘটনার চাপে আমার স্নায়ু একেবারে বিধ্বস্ত। উর্দিপরা ক্যান্টিনবয় ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স রেখে গেল। তারপর কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্নায়ু চাঙ্গা হল। বললুম,বাস্! কী সাংঘাতিক রহস্য!
কর্নেল হাসলেন,–রহস্যের আর বাকি কী থাকল ডার্লিং?
বললুম, রত্নমুকুট আর মুক্তোর হার স্বচক্ষে দেখতে পেলে জানতুম রহস্য ফাঁই হয়েছে।
–আশা করি দেখতে পাবে!
একটু পরে বললুম,–ওই ভক্তিভূষণ হাটি লোকটি ডাবল এজেন্টের কাজ করেছে। অক্ষয়বাবুর সঙ্গে তার পরিচয় আছে, এটা স্পষ্ট। কারণ দুজনেই ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’ বই নিয়ে আপনাকে লড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আপনিও বলছিলেন, পরে ভালুকের হাতে মৃত্যুর প্ল্যান করা হয়েছিল। যেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, অক্ষয়বাবু সত্যি শয্যাশায়ী। কাজেই ভক্তি হাটি গোপনে কালীবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে অক্ষয়বাবুকে রত্নমুকুট আর মুক্তোর হার থেকে বঞ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছিল। তারপর সে মন্দিরে কালীবাবুকে মেরেছে। কিন্তু সে জানত না, একটা চাবিতে বেদি খুলবে না। মাঝখান থেকে
কর্নেল বললেন,–আর ওসব কথা নয়। কারণ এখনও তোমার নার্ভ চাঙ্গা হয়নি।
–কেন? কেন?
–ভালুকবেশী ভক্তি কী খুঁজতে কালীবাবুর ঘরে ঢুকেছিল?
–টাকাকড়ি সোনাদানা চুরি করতে ঢুকেছিল। কারণ দেবতার সম্পদ সে পায়নি।
কথায় বলে, চোরের কৌপিন লাভ। কিছু না পেলে চোর অগত্যা সাধুর কৌপিন নিয়ে পালায়। কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার কথায় যুক্তি আছে অস্বীকার করা যায় না।
গঙ্গার ধারে প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস বইছিল। তাই ঘরে ঢুকে বিছানায় গড়িয়ে পড়লুম। কিছুক্ষণ পরে ব্রেকফাস্ট এল।
খিদে পেয়েছিল। খাওয়ার পর বললুম,–আপনি আবার হাঁসখালির বিলে হাঁস দর্শনে যাবেন নাকি?
-যাব। তবে আপাতত একবার থানা ঘুরে আসি। প্রোফেসর বি বি হাটি কী করছেন, দেখে আসি।
কর্নেল চলে গেলেন। আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম। এখানে প্রেতাত্মা বা ভালুকের ভাবনা নেই। কাজেই নিরুপদ্রবে ঘুমুনো যাবে। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি।
কর্নেল ফিরে এসে ঘুম ভাঙালেন। তখন সাড়ে বারোটা বাজে। বললুম,–প্রোফেসর হাটির ম্যাজিক দেখলেন?
