এবং ছিটকে এসে আমার দাড়িতে পড়েছিল।
এবার শুনুন ফিসফিস কথাবার্তা–বলে আরেকটা সুইচ টিপলেন কর্নেল।
অমনি জানলার বাইরে ফিসফিস কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল। কর্নেল জানলা খুলে একটা ছোট্ট টেপরেকর্ডার সাবধানে টেনে ছুড়লেন। অক্ষয়বাবুকে লক্ষ্য করলুম। মুখটা পাথরের মুখ হয়ে গেছে যেন।
.
ছয়
বুঝতে পারছিলুম না, অক্ষয় সাঁতরা প্রেতাত্মার ম্যাজিক কেন দেখিয়েছিলেন! কর্নেল ওঁর বিছানার পাশ থেকে বন্দুকটা তুলে নিলেন। তারপর সোফায় এসে বসলেন। ভাবলুম, ভাইয়ের মৃত্যুতে যা খেপে আছেন অক্ষয়বাবু, বন্দুক সরিয়ে রাখা উচিত।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–তা হলে অক্ষয়বাবু! প্রেতাত্মার রহস্য ফাঁস হল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার বন্ধু ভক্তিভূষণ হাটিই আপনাকে এই যান্ত্রিক ম্যাজিক শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
অক্ষয়বাবু গলার ভেতর থেকে বললেন, আমি নিজেই ওটা তৈরি করেছিলুম!
–কেন অক্ষয়বাবু?
–আপনার রহস্যভেদী বলে খ্যাতি আছে। তাই পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলুম আপনাকে।
–পরীক্ষায় আমি পাস করেছি বলুন?
–হুঁ।
–কিন্তু হাটিবাবুকে ভালুক সাজিয়েছিলেন কেন?
–কখনও না। আমি ওকে চিনি না।
–চেনেন। আসলে দু-কপি ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’ বই ফুটপাত থেকে কিনে এক কপি আপনি হাটিবাবুকে দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। এর একটাই উদ্দেশ্য। প্রেতাত্মার ব্যাকগ্রাউন্ডকে মজবুত করা। কলকাতার গোবরা এলাকায় কান্তি খটিক লেনের একটা লোক ওই বই কিনে একই উপদ্রবে ভুগছে। বাহ্! চমৎকার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি হয়ে গেল।
ও.সি মিঃ রায় বললেন,–এই ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরির উদ্দেশ্য কী?
-বৈমাত্রেয় ভাই কালীপদকে হত্যা!
অক্ষয়বাবু নড়ে উঠলেন,ওই লোকটা ভালুক সেজে কালীকে মেরেছে। আমি খোঁড়া হয়ে শয্যাশায়ী।
কর্নেল হাসলেন। প্রথমে প্ল্যান ছিল, কালীপদবাবুকে প্রেতাত্মা হত্যা করবে। কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না ভেবে প্ল্যান বদলানো হল। হাটিবাবু সার্কাসের খেলোয়াড়। বাঘ ভালুককে খেলিয়েছেন। অতএব তাকে কৃত্রিম ভালুকের পোশাকে সাজানোর প্ল্যান হল। নখগুলো দেখুন! ধারালো লোহায় তৈরি। এদিকে আমি এসে গেছি। অতএব হাটিবাবুকে ভালুক সাজিয়ে আমার এবাড়িতে উপস্থিতির সময় কালীবাবুকে খুন করলে দোষটা গিয়ে পড়বে বুনো ভালুকের ওপর।
মিঃ রায় বললেন,–কালীবাবুকে হত্যার মোটিভ কী? কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–বলছি। তার আগে যা ঘটেছে তা বলা দরকার। আমাকে ভুল পথে হাঁটানো হয়েছিল। আমি ভেবেছিলুম, কেউ ভালুক দিয়ে অক্ষয়বাবুকে হত্যার প্ল্যান করেছে। সম্ভবত ওঁর বৈমাত্রেয় ভাই কালীবাবুই হত্যা করতে চান অক্ষয়বাবুকে। কারণ তাহলে সব সম্পত্তি কালীবাবু পাবেন। যাই হোক, কাল সন্ধ্যায় আয়রনচেস্টের ম্যাজিক দেখে আমার ভুল ভেঙেছিল। কিন্তু তখনও আঁচ করতে পারিনি কালীবাবুই ভিকটিম হবেন। কারণ কালীবাবুর স্ত্রী বর্তমান। কালীবাবু মারা গেলে তার সম্পত্তি তার স্ত্রী পাবেন। তাহলে এই খেলার উদ্দেশ্য কী? আজ ভোরে নবঠাকুরের চিৎকার শুনে ছুটে গেলুম। তারপর হতবাক হয়ে দেখলুম, কালীবাবু নিহত। অমনি মনে পড়ল, অক্ষয়বাবু আমাকে বলেছিলেন কালীবাবুর সঙ্গে পৈতৃক ধনরত্ন নিয়ে তার ঝগড়া। সন্দেহবশে তাই মন্দিরে ঢুকে বিগ্রহের পেছনে গেলুম। মিঃ রায় আপনাকেও দেখিয়েছি বেদিতে পিছনদিকে চাবি ঢোকানোর ছিদ্র আছে। ওটা দেখামাত্র আমার মনে পড়ে গেল একটা পুরোনো রহস্যের কথা। বাবা দুই ছেলেকে দুটো চাবি দিয়ে মারা যান। পর-পর দুটো চাবি ছাড়া বিগ্রহ বেদির তালা খুলবে না। জয়ন্ত সেই ঘটনা ‘কা-কা-কা রহস্য’ নামে একটা গল্পে লিখেছিল।
আমি বললুম,–এখানেও কি সেই ব্যাপার?
কর্নেল বললেন, কতকটা। তো ঘটনাটা মনে পড়া মাত্র কালীবাবুর বাড়ির ভেতর গিয়ে ঢুকলুম। সোজা দোতলায় উঠে যে ঘরটা খোলা পেলুম, সেটা কালীবাবুর শোবার ঘর এবং সেই ঘরে ভালুকবেশী ভক্তি হাটি ঢুকে তল্লাশি চালাচ্ছে। পকেট থেকে রিভলভার বের করতেই সে পাশের ঘর দিয়ে পালিয়ে গেল। কী খুঁজছিল সে? বালিশের তলায় কিছু নেই। কিন্তু তোশকের তলায় একটা ভাঁজ করা চিঠি পেয়ে গেলুম। চিঠিটাতে চোখ বুলিয়েই বুঝলুম কী হয়েছে। তারপর ভালুকের খোঁজে ছুটে গেলুম উঠোনে সে লুকোবার চেষ্টা করছিল। যাই হোক, মিঃ রায়! চিঠিটা পড়ে দেখুন।
কর্নেল জ্যাকেটের পকেট থেকে চিঠিটা ওঁকে দিলেন। আমি পাশে বসে আছি। কাজেই চিঠিটা আমারও পড়া হয়ে গেল।
স্নেহের কালীপদ,
অবশেষে ভাবিয়া দেখিলাম, তোমার দাবি সম্পূর্ণ যুক্তিপূর্ণ। তুমি আমার অনুপস্থিতিতে পিতৃদেবের শেষকৃত্য করিয়াছ। বাড়িরও রক্ষণাবেক্ষণ করিয়াছ। কাজেই গৃহদেবতার মুকুট তোমারই প্রাপ্য। আমি শুধু হারছড়া লইয়াই সন্তুষ্ট থাকিব। তুমি অদ্য সন্ধ্যায় কোনও কৌশলে তোমার স্ত্রী এবং শ্যালককে কৃষ্ণনগরে পাঠাইয়া দিবে। কারণ বিশেষ করিয়া তাপসের উপস্থিতিতে বহুমূল্য রত্নরাজি তুমি লুকাইয়া রাখিতে পারিবে না। তাপস মহা ধূর্ত। তোমার স্ত্রী তাহাকে খুবই স্নেহ করে। তাছাড়া স্ত্রীজাতির পেটে কথা থাকে না। তাই উহারা দুইজনেই যেন না জানিতে পারে। তুমি কাল শেষ রাত্রে গোপনে মন্দিরে তোমার চাবি লইয়া উপস্থিত থাকিবে। আমি শয্যাশায়ী। কিন্তু কষ্ট করিয়া লাঠির সাহায্যে মন্দিরে আমার চাবিসহ উপস্থিত হইব। তোমার চাবি দ্বারা অগ্রে বেদির তালা এক পাক ঘুরাইতে হইবে। আমি আমার চাবি দ্বারা দ্বিতীয় পাক ঘুরাইলেই বেদি খুলিয়া যাইবে। তখন দুই ভ্রাতা মিলিয়া পূর্বোক্তরূপে দেবতার রত্ন ভাগ করিয়া লইব। সাবধান! ঘৃণাক্ষরে কেহ যেন জানিতে না পারে।
