কর্নেল বললেন,–আপনাদের যাছে নিশ্চয় একটা ভালুকের খবর গিয়েছিল?
–হ্যাঁ স্যার। তবে বিশ্বাস করতে পারিনি।
–এই দেখুন সেই ভালুক।
–তার মানে?
–এঁর নাম ভক্তিভূষণ হাটি। প্রোফেসর বি. বি. হাটি ম্যাজিশিয়ান। পরে এশিয়ান সার্কাসে যোগ দেন। ইনিই এই ভালুকের পোশাক পরে ওই জঙ্গলে ঘুরতেন। অক্ষয়বাবুর বাড়ি ছাদে উঠে ভূতুড়ে শব্দ করতেন। এঁকে অ্যারেস্ট করুন। জয়ন্ত! ভালুকের পোশাকক্টা ওঁকে দাও!
একদল পুলিশ মন্দিরের দরজায় কালীবাবুর মৃতদেহ দেখছিল। একজন এস, আই বললেন,–সাংঘাতিক মার্ডার স্যার! মাথার খুলি ভেঙে গেছে। পিঠের দিকটা ফালাফালা!
ও.সি. তরুণ রায় বললেন, এই লোকটাকে থানায় নিয়ে যান ব্রতীনবাবু। এই নিন এর ভালুকের পোশাক।
এস আই ব্রতীনবাবু বললেন, কী অদ্ভুত! এই লোকটাই ভালুক সেজে ছোট সাঁতরাবাবুকে খুন করেছে?
হাটিবাবুকে দুজন কনস্টেবল পিছমোড়া করে হাতকড়া পরিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল। ব্রতীনবাবু তাদের সঙ্গে গেলেন। ও.সি বললেন,–অ্যাম্বুলেন্স আনা গেল না। স্ট্রেচার নিয়ে আসতে বলেছি। ডাক্তারবাবু আর ফটোগ্রাফার হরিবাবু এখনই এসে পড়বেন। আইনের কিছু ব্যাপার আছে। কর্নেলসায়েব!
কর্নেল বললেন,–জানি। বডি কী অবস্থায় ছিল, তার ফটো তুলতে হবে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে জানাবেন মৃত না জীবিত। ততক্ষণে ওদিকে চলুন মিঃ রায়। কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিই।
ওঁরা দুজনে কাটাতারের বেড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। চাপা গলায় কর্নেল কথা বলতে থাকলেন।
একটু পরে ফটোগ্রাফার হরিবাবু এসে বললেন,–কোথায় বডি?
একজন কনস্টেবল তাঁকে দেখিয়ে দিল। তখন তিনি জুতো খুলে মন্দিরের বারান্দায় উঠে নানাদিক থেকে ফ্ল্যাশবা জ্বেলে অনেকগুলো ফোটো তুললেন। ততক্ষণে ডাক্তারবাবু এসে পড়েছেন। তিনি হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন,–কী সর্বনাশ! সাঁতরা ফ্যামিলিতে নৃসিংহদেবের অভিশাপ লেগেছে মনে হচ্ছে। অক্ষয়বাবু পড়ে গিয়ে হাঁটু জখম। পর-পর দু-বার। তারপর কালীবাবু ভালুকের পাল্লায় পড়ে গেলেন!
বুঝলুম, ইনিই সেই নাড়ুবাবু-ডাক্তার। বডি পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এসে বললেন,–ডেড। রক্তের অবস্থা দেখে মনে হল অন্তত ঘণ্টা ছয়েক আগে ভালুক ওঁকে আক্রমণ করেছিল। পোস্টমর্টেমে সঠিক সময় জানা যাবে। মাথার পেছনে থাবা মেরেছে। পিঠের দিকে শুধু সোয়েটার ছিঁড়েছে ধারালো নখে। ক্ষতচিহ্ন নেই পিঠে।
হাসপাতাল থেকে চারজন লোক স্ট্রেচার এনেছিল। তারা কালীবাবুর মৃতদেহ তুলে নিয়ে গেল। ও.সি. তরুণ রায় বললেন,–ডাক্তারবাবু! আপনি প্লিজ শিগগির যান। ডেডবডি সম্পর্কে একটা প্রাইমারি রিপোর্ট শিগগির চাই।
অক্ষয়বাবুকে একবার দেখে যেতুম।-নাড়ু ডাক্তার বললেন, হাঁটু দু-দুবার ভেঙে বেচারা শয্যাশায়ী!
–পরে দেখবেন।
ডাক্তারবাবু হন্তদন্ত চলে গেলেন। কর্নেল বললেন,–মিঃ রায়! আসুন। এবার নৃসিংহদেবকে দর্শন করবেন।
জুতো খুলে রেখে দুজনে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর অবাক হয়ে দেখলুম, কর্নেল ওঁকে বিগ্রহের পেছনের দিকে নিয়ে গেলেন এবং দুজনে হাঁটু মুড়ে বসে কী দেখতে থাকলেন।
একটু পরে দুজনে বেরিয়ে এলেন। কর্নেল বললেন, আপনি অক্ষয়বাবুর সঙ্গে কথা বলুন। আর জয়ন্ত, তুমিও মিঃ রায়ের সঙ্গে যাও। হা-পরিচয় করিয়ে দিই মিঃ রায়। এর নাম জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার রিপোর্টার।
ও.সি. বললেন,–নমস্কার! নমস্কার! আমি আপনার লেখার ভক্ত জয়ন্তবাবু! মুখোমুখি আলাপ হয়ে খুশি হলুম। চলুন। অক্ষয়বাবু এ বিষয়ে কী বলেন শোনা যাক।
ভেতরে ঢুকে দেখি, নিচের বারান্দায় ধানু দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। নবঠাকুর তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
আমরা দোতলায় গিয়ে অক্ষয়বাবুর ঘরে ঢুকলাম। ও.সি. বললেন,–আপনিই অক্ষয়কুমার সাঁতরা?
অক্ষয়বাবু নমস্কার করে বললেন,–বসুন। কালী আমার বৈমাত্রেয় ভাই হলেও ওকে স্নেহ করতুম। আমার বুকের পাঁজর ভেঙে গেল দারোগাবাবু!
আমরা বসলুম। অক্ষয়বাবু ভাঙা গলায় ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’ বই কেনা থেকে শুরু করে তার দু-দুবার হাঁটু ভাঙা এবং ভৌতিক উপদ্রব সবিস্তারে বর্ণনা করলেন।
এতক্ষণে কর্নেল এসে বললেন,–মিঃ রায়! যা ভেবেছিলুম ঠিক তা-ই। জিনিসটা আমি নিচে কনস্টেবলদের জিম্মায় রেখে এলুম।
অক্ষয়বাবু বললেন,–কর্নেল! এ কী হল বুঝতে পারছি না! প্রেতাত্মার সঙ্গে ভালুকবেশী ওই লোকটার কী সম্পর্ক?
কর্নেল বললেন, আমি আপনাকে সব বুঝিয়ে বলছি। আপনি শুধু এবার আমাকে আয়রনচেস্টের চাবিটা দিন!
-কেন? কেন?
-প্লিজ অক্ষয়বাবু! প্রেতাত্মারহস্য উন্মোচনের জন্য আপনি আমাকে ডেকেছিলেন। আমি এসেছি। এবার রহস্যটা ফাঁস করা দরকার নয় কি?
অনিচ্ছার ভঙ্গিতে আয়রনচেস্টের চাবি দিলেন অক্ষয়বাবু! কর্নেল চাবি দিয়ে আয়রনচেস্ট খুলে ডাকলেন,–মিঃ রায়! জয়ন্ত! প্রেতাত্মার কীর্তি দেখে যাও!
আমরা ওঁর কাছে গেলুম। কর্নেল বললেন, এখানে আপনারা বসুন। আমি ব্যাপারটা দেখাচ্ছি।
বলে উনি সোজা অক্ষয়বাবুর কাছে গেলেন এবং পালঙ্কের পাশে একটা সুইচ টিপলেন। বিদ্যুৎ ছিল। সুইচ টেপার সঙ্গে-সঙ্গে আয়রনচেস্টের ভেতর একটা ছোট্ট গোলক নড়তে শুরু করল এবং ঘটাং ঘট শব্দ হতে থাকল। তরপর হঠাৎ সেটা খানিকটা এগিয়ে এল। কর্নেল বললেন,–বইটা ছিল গোলকটার সামনে দাঁড় করানো। সুইচ জোরে টিপতেই বইটাকে গোলকটা ধাক্কা মেরেছিল
