দেখেই নেমে এসে বললুম,–কর্নেল! এ সেই শয়তান ভালুকটার কাজ!
কর্নেল মোজাপরা-পায়ের চটি খুলে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে গেলেন। তারপর ওঁর খুদে টর্চ জ্বেলে নৃসিংহদেবের মূর্তির পেছনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। মূর্তিটা পাথরের এবং সিদুরে লাল হয়ে আছে।
একটু পরে উনি বেরিয়ে এসে বললেন, তুমি এখানে থাকো। আমি আসছি।
বলে কালীবাবুর বাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে উধাও হয়ে গেলেন। আমি একা মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে পশ্চিমের জঙ্গল এবং দক্ষিণে ভেঙেপড়া পাঁচিলের দিকে বারবার তাকাচ্ছিলুম। ভালুটা আবার এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে কী করে আত্মরক্ষা করব? আমার মনে হচ্ছিল, কালীপদবাবু কোনও কারণে মন্দিরে এসেছিলেন এবং সেইসময় ভালুকটা এসে ওঁর পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ভালুকের নখ খুব ধারাল। মাথার খুলি পর্যন্ত নখের আঘাতে ভেঙেচুরে দিয়েছে। সোয়েটার ছিঁড়ে ফালাফালা করে ফেলেছে।
একটু পরে কালীপদবাবুর বাড়ির ভেতর থেকে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুম,–জয়ন্ত! জয়ন্ত! শিগগির এখানে এসো।
কর্নেল যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিলেন, সেখান দিয়ে ঢুকে দেখি, উঠোনের কোনায় পাঁচিলে পিঠ ঠেকিয়ে সেই ভালুকটা দুই ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে আছে এবং দুই হাত তুলে আক্রমণের ভঙ্গিতে নাড়ছে। মুখ দিয়ে চাপা হুঙ্কার ছাড়ছে ভালুকটা। দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছে।
কর্নেল তার দিকে রিভলভারের নল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে তিনি সহাস্যে বললেন,–সার্কাসের খেলা দেখো জয়ন্ত! এত বলছি, এবার খেলা শেষ। কথা শুনছে না। ওকে যে ধরব, তার ঝুঁকি আছে। নখগুলো দেখছ? বরং তুমি আমার রিভলভারটাও নাও। অটোমেটিক উইপন। গুলি ভরা আছে। আমাকে আক্রমণ করলেই ওকে গুলি করবে।
কর্নেলের রিভলভারটা হাতে নিয়ে ভালুকটার দিকে তাক করলুম। কিন্তু কর্নেল আমাকে অবাক করে এবার বললেন, আসলে আমি চুরুট ধরানোর সুযোগ পাচ্ছিলুম না। এবার চুরুট ধরিয়ে নিই। হাতে ফায়ারআর্মস নিয়ে চুরুট ধরানো যায় না।
উনি জ্যাকেটের পকেট থেকে চুরুট বের করে লাইটারে ধরালেন। তারপর রিভলভারটা আমার হাত থেকে নিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–আর কী ভক্তিবাবু? খোলস বদলান। জয়ন্তকে এই মজাটা দেখানোর জন্য ডেকেছি। উঁহু হু! যথেষ্ট হয়েছে। আমি জানি, আপনি এই ঘটনায় কী ভূমিকা পালন করেছেন। ভক্তিবাবু! এবার নিজমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করুন।
আমি হতভম্ব হয়ে বললুম,–কী বলছেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ। ইনিই কান্তি খটিক লেনের সেই ভক্তিভূষণ হাটি। একসময় ম্যাজিসিয়ান ছিলেন। তখন নিজেকে বলতেন প্রোফেসর বি বি হাটি। তারপর এশিয়ান সাকাসে ঢোকেন। আমার টাকে গুবরেপোকা ছুঁড়ে মেরেছিল হাটিবাবু। স্রেফ হাতের ম্যাজক। ভক্তিবাবু! এক্ষুনি পুলিশ এসে পড়বে আর দেরি করবেন না!
এবার ভালুকবেশী ভক্তিভূষণ হাটি পিঠের দিকের জিপ টেনে ভালুকের খোলস ছেড়ে বেরুলেন। তারপর করুণ মুখে বললেন, আমাকে ছেড়ে দিন স্যার! লোভে পড়ে আমি অন্যায় করে ফেলেছি। আর কখনও–
তাঁকে থামিয়ে কনেল বললেন,–সব জানি ভক্তিবাবু! আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কলকাতা থেকে জেনেই এসেছি।
বলে এগিয়ে গিয়ে ভালুকের খোলসটা তুলে নিলেন কর্নেল তারপর সেটা আমাকে দিয়ে হাটিবাবুর জামার কলার ধরলেন,–চলুন! এবার যাওয়া যাক।
ভক্তিবাবুর পরনে আঁটো প্যান্ট। গায়ে শার্ট এবং ফুলহাতা সোয়েটার! তাকে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়ে গেলেন কর্নেল। তারপর সেখান থেকে অক্ষয়বাবুর বাড়ির দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকালেন। সিঁড়ি বেয়ে উঠে কর্নেল ডাকলেন,–অক্ষয়বাবু! অক্ষয়বাবু!
নবঠাকুর আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। উদ্ভ্রান্ত চেহারা। অক্ষয়বাবুর কান্না শোনা যাচ্ছিল। আমরা ভেতরে ঢুকলে উনি কান্না থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।
কর্নেল বললেন,–কাল আপনাকে জিগ্যেস করেছিলুম ভক্তিভূষণ হাটি নামে কাউকে চেনেন কি না। এই সেই ভক্তিভূষণ হাটি, ওরফে প্রোফেসর বি বি হাটি। ম্যাজিসিয়ানও বটে, সার্কাসের খেলোয়াড়ও বটে। দেখুন তো এঁকে চিনতে পারছেন কি না?
অক্ষয়বাবু ভাঙাগলায় বললেন,–না।
কর্নেল বললেন,–এই লোকটাই ভালুকের পোশাক পরে ভালুক সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
অক্ষয়বাবু সঙ্গে-সঙ্গে দোনলা বন্দুক তাক করে গর্জে উঠলেন,–ওকে আমি গুলি করে মারব। কালীকে এই শয়তানটাই খুন করেছে।
কর্নেল হাটিবাবুকে নিয়ে তক্ষুনি বসে পড়লেন এবং অক্ষয়বাবুর বন্দুক থেকে পরপর দুটো গুলি বেরিয়ে দেয়ালের ছবিতে লাগল। এ এক সাংঘাতিক অবস্থা! কর্নেল বললেন,জয়ন্ত! অক্ষয়বাবুর হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নাও।
আমি ছুটে গিয়ে ওঁর হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিলুম। অক্ষয়বাবু হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,–ওকে সহজে ছাড়ব না। ওকে পুলিশে দেব। ও হো-হো! আমার ভাই কালীকে ওই ব্যাটাচ্ছেলে ভালুক সেজে মেরে ফেলেছে!
ভক্তিবাবু কী বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল তার মুখ চেপে ধরে বললেন,–একটাও কথা নয়। চলুন আমরা এবার নিচে যাই। পুলিশ আসছে দেখতে পাচ্ছি। বন্দুকটা এবার অক্ষয়বাবুকে ফিরিয়ে দাও জয়ন্ত!
নিচে গিয়ে আবার মন্দির প্রাঙ্গণে আমরা দাঁড়ালুম। নবঠাকুর মন্দিরের বারান্দায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। একটু পরে পুলিশ এসে গেল। একজন প্রকাণ্ড চেহারার পুলিশ অফিসার কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–এস.পি. সায়েব কাল রাতে ওয়্যারলেসে মেসেজ পাঠিয়েছেন। আপনার কথা বলেছেন। আপনার অনেক কীর্তির কথা এ যাবৎ শুনে আসছি। এতদিনে সৌভাগ্যবশত চাক্ষুষ পরিচয় হল। আমার নাম তরুণ রায়। বড়হাটছড়ি থানার অফিসার-ইন-চার্জ।
