–হ্যাঁ। আমি যখন ফিরে এলুম, তখন বাবার কথামতো ধানু আমার সারভ্যান্ট হয়েছিল। বাবা নাকি মৃত্যুর আগে ধানুকে এই আদেশ দিয়েছিলেন।
কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন, আপনি একটু আগে বললেন, আপনার ভ্রাতৃবধুর কান্না শুনে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। কেন অস্বস্তি হচ্ছে তা বলতে আপত্তি আছে?
অক্ষয়বাবু চাপা গলায় বললেন,–ওই যে নেশাখোর ছোকরা তাপসের কথা বলছিলুম। ও এখানকার যত নেশাখোর গুন্ডা-মস্তানের সঙ্গে মেলামেশা করে। আমার ভয় হয়, কালী বউয়ের ভয়ে ওকে যা প্রশ্রয় দেয়, কবে না টাকার লোভে হতভাগা কালীকেই
বলে উনি চোখ বুজে শিউরে ওঠার ভঙ্গি করলেন। আপনমনে আবার বললেন,–প্রভু নৃসিংহদেব! রক্ষা করো প্রভু!
অক্ষয়বাবু করজোড়ে চোখ বুজে গৃহদেবতার নাম আওড়াতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে ধানু এসে বাইরে সাড়া দিল,–আজ্ঞে বড়কর্তামশাই!
অক্ষয়বাবু চোখ খুলে বললেন–ভেতরে আসতে কি লজ্জা করে হতভাগা?
ধানু ভেতরে ঢুকে বলল,–কেস্টনগরে ছোটকর্তামশাইয়ের শ্বশুরমশাইয়ের হঠাৎ অসুখ। সেই খবর পেয়ে ছোটগিন্নিমা কান্নাকাটি করছেন। ছোটকর্তামশাই বাড়ি ছেড়ে যাবেন কী করে? তাই শালাবাবু আর ক্ষান্তমণি ছোটগিন্নিমাকে নিয়ে কেষ্টনগর যাবেন। সাড়ে নটায় লাস্ট বাস! সেই বাসে চেপে যাবেন আজ্ঞে!
যতসব!–অক্ষয়বাবু রুষ্ঠমুখে বললেন, আমি ভাবি না জানি কী সর্বনাশ হয়েছে বাড়িতে।
ধানু চলে গেল।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–ওঠা যাক। বিকেলে হাঁসখালির বিলে বুনো হাঁসের ছবি তুলতে গিয়ে খুব হাঁটাহাঁটি করেছি। ক্লান্ত লাগছে।
অক্ষয়বাবু বললেন,–হ্যাঁ-হ্যাঁ। আপনি গিয়ে বিশ্রাম করুন। নবঠাকুরকে বলা আছে, যখন খেতে চাইবেন, তখনই ব্যবস্থা হবে। যা শীত পড়েছে! হঠাৎ শীত। বুঝলেন? পরশু আর কাল এদিকে খুব বৃষ্টি হল। তাই এবার শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছে। আর–বইটা!
কর্নেল হাসলেন,–হ্যাঁ, বইটা প্রেতাত্মার। কাজেই একটু দুষ্টুমি করতেই পারে।
নিচে এসে দেখি, ধানু আর নবঠাকুর রান্নাঘরের মেঝেয় বসে গল্প করছেন। আমাদের দেখে ধানু উঠে এসে দরজার শেকল খুলে দিল।
কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন,–বইটার কী অবস্থা দেখা যাক!
তিনি কিটব্যাগের চেন খুলে বললেন,–এ কী? বইটা নেই দেখছি!
আমার চোখ গেল পশ্চিমের দরজার কাছে। দেখলুম, বইটা দরজার নিচে পড়ে আছে। কর্নেলকে বললুম,–ওই দেখুন!
কর্নেল বইটা তুলে এনে কিটব্যাগে ঢুকিয়ে বললেন,–প্রেতাত্মাই বটে! ধানু পাশের বাড়িতে খবর আনতে গিয়েছিল! ঠাকুরমশাই রান্নাঘরে ছিলেন। তখন প্রেতাত্মা চুপিচুপি ঘরে ঢুকে এই কর্মটি করেছে।
বলেই উনি চমকে উঠলেন হঠাৎ,জয়ন্ত! জয়ন্ত টেবিলে ভালুকের নোম পড়ে আছে দেখছ?
অবাক হয়ে দেখলুম, টেবিলে সত্যি কয়েকটা কালো লোম পড়ে আছে।…
.
পাঁচ
একে তো নতুন জায়গায় গেলে আমার ঘুম আসতে চায় না, তার ওপর প্রেতাত্মা এবং ভালুকের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা! কতক্ষণ পরে সবে চোখের পাতায় ঘুমের ঘোর লেগেছে, হঠাৎ সেটা কেটে গেল কী একটা শব্দে। নিঝুম রাতে যে-কোনও ছোট্ট শব্দ বড় হয়ে কানে ধাক্কা দেয়।
মন্দিরের দিকে কার চলাফেরার শব্দ এবং চুপিচুপি কথাবর্তার শব্দ। কর্নেলের নাক ডাকছিল। চাপাস্বরে ডাকলুম-কর্নেল! কর্নেল!
ওঁর নাকডাকা থেমে গেল। তারপর ঘুমজড়ানো গলায় বললেন- ঘুমোও।
জানালার ফাঁকে বাইরের বিদ্যুতের আলো আর দেখা যাচ্ছিল না। বুঝলুম লোডশেডিং চলছে। বাইরের শব্দও থেমে গেল হঠাৎ।
কতক্ষণ আর জেগে থাকা যায়? কর্নেলের পরামর্শ মনে পড়ল। ঘুম না এলে একশো থেকে উলটো দিকে নিরানব্বই-আটানব্বই করে শুনতে হয়। এতে কাজ হয়েছিল। কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছি।
সেই ঘুম ভেঙে গেল বাইরে চিৎকার-চাচামেচিতে। হুড়মুড় করে উঠে বসলুম তারপর মশারি থেকে বেরিয়ে দেখি, কর্নেল বিছানায় নেই। মশারিটা অর্ধেক তোলা আছে। দক্ষিণের দরজা হাট করে খোলা। বাইরে ভোরের আলো গাঢ় কুয়াশায় ধূসর হয়ে আছে। দক্ষিণের মন্দির চত্বর থেকে চাচামেচি হচ্ছিল। তাই দরজা দিয়ে বেরিয়ে বারান্দায় গেলুম। দেখলুম, নবঠাকুর হাউমাউ করে কর্নেলকে কী বলছেন। ধানু ভেউ-ভেউ করে কাঁদছে। দোতলা থেকে অক্ষয়বাবু চিৎকার করে বলছেন,–ধানু! ধানু! কী হয়েছে?
চত্বরে নেমে গিয়ে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম,–কী হয়েছে কর্নেল?
কর্নেল ভারী গলায় বললেন,–মার্ডার!
-মার্ডার–মানে খুন? কে খুন হয়েছে?
কর্নেল বললেন,–কালীবাবু।
তারপর ধানুকে বললেন,–শিগগির থানায় যাও। পুলিশে খবর দাও! গিয়ে বলো, কালীপদবাবু খুন হয়েছেন।
বলে তাকে ধাক্কা দিলেন কর্নেল।
ধাক্কায় কাজ হল। ধানু দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দরজা দিয়ে উধাও হয়ে গেল। নবঠাকুর পূজারীর বেশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কান্নাজড়ানো গলায় আমাকে বললেন,–গঙ্গাস্নান করে পুজো করতে এসে দেখি মন্দিরের দরজা খোলা। ছোটকর্তাবাবু উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ওই দেখুন! রক্তারক্তি অবস্থা!
কর্নেল তাকে ধমক দিয়ে বললেন,–আপনি অক্ষয়বাবুকে গিয়ে বলুন কী হয়েছে–উনি ডাকাডাকি করছেন, শুনতে পাচ্ছেন না?
নবঠাকুর চলে গেলেন। আমি মন্দিরের সিঁড়িতে উঠে দেখলুম, এক রোগাটে গড়নের ভদ্রলোক উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পায়ের দিকটা দরজার বাইরে এবং বাকি অংশ দরজার ভেতরে। পরনে ধুতি। গায়ে জামার ওপর সোয়েটার। কিন্তু সেটা ছিঁড়ে ফালাফালা। মাথার পেছনে চাপচাপ রক্ত।
