অমনি দরজার নড়াচড়া এবং শব্দটা থেমে গেল। বললুম,–কী সর্বনাশ!
ভালুকটা নাকি? কর্নেল বললেন,–সার্কাসের ভালুক তো! মানুষের কথা বোঝে।
বললুম,–কালই আপনি থানায় এবং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে বরং খবর দিয়ে আসুন। এভাবে একটা ভালুক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখন কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলা যায় না।
হুঁ। দেব।–বলে কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলোতে থাকলেন।
নবঠাকুর দরজার সামনে এসে বললেন,–কফি খেতে ইচ্ছে হলে বলবেন স্যার! কর্তামশাই আপনার জন্য কেষ্টনগর থেকে কফি আনিয়ে রেখেছেন।
কর্নেল চোখ বুজে বললেন,–কেষ্টনগরে আমরা একবার কফির বদলে চাফি খেয়েছিলুম। মনে আছে জয়ন্ত?
বললুম,–হ্যাঁ। চা আর কফি মিশিয়ে চাফি। তার সঙ্গে অবশ্য সরপুরিয়া ছিল।
নবঠাকুর বললেন,–আজ্ঞে, সরপুরিয়াও আছে। রাত্তিরে খাওয়ার সময়—
কর্নেল বললেন,–না ঠাকুরমশাই। সকালে ব্রেকফাস্টে দেবেন বরং!
-–ঠিক আছে স্যার। ফ্রিজে রাখা আছে। কারেন্ট থাক আর না-ই থাক, সরপুরিয়া কখনও নষ্ট হয় না।
ধানু এসে বলল,–বড়কর্তামশাই আপনাদের ডাকছেন আজ্ঞে!
ঘড়ি দেখে কর্নেল বললেন,–চলো জয়ন্ত! সময় কাটছে না। অক্ষয়বাবুর সঙ্গে গল্প করা যাক।
বললুম,–দরজা খোলা থাকবে?
–থাক।
ধানু বলল,দরজায় শেকল আটকে দিচ্ছি স্যার। ঠাকমশাই আছেন। আমিও আছি। কিচ্ছু চুরি যাবে না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে বললুম,–ফিরে গিয়ে যদি দেখেন, বইটা কিটব্যাগ থেকে বেরিয়ে টেবিলের তলায় কিংবা বিছানায় চলে গেছে?
যাক না।–কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, প্রেতাত্মাকে স্বাধীনতা দিয়ে দেখা যাক, কী করে।
অক্ষয়বাবু পালঙ্কে একই অবস্থায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বিছিয়ে রাখা পায়ের হাঁটু মেলে ব্যান্ডেজে হাত বোলাচ্ছিলেন। আমাদের দেখে ধুতি টেনে পা ঢেকে বললেন–আসুন কর্নেলসায়েব!
আমরা ওর পালঙ্কের কাছে সেকেলে সোফায় বসলুম। কর্নেল বললেন,–ওপাশের ছাদে কালীবাবুর শ্যালক মাতাল হয়ে গান গাইছিলেন!
অক্ষয়বাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–কালীকে ওই ছোকরাই সর্বস্বান্ত করে ছাড়বে। দিদির কাছে তাপস নাকি নেশার টাকা আদায় করে। কালীর বউ আবার ভাইয়ের এতটুকু বদনাম শুনলে খেপে যায়। তো আপনার সামনেই দু-দুবার অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। এ বিষয়ে আপনি নিশ্চয় কোনও চিন্তাভাবনা করেছেন?
কর্নেল বললেন,–কিছু বুঝতে পারছি না। তবে ওই ভালুকের ব্যাপারটা আলাদা। ওটা নিশ্চয় কোনও সার্কাস দলের ভালুক। অনেক কসরত জানে।
–আমার পা ভালো থাকলে ভালুকটাকে গুলি করে মারতুম!
–আপনার বন্দুক আছে বুঝি?
আছে।–বলে বিছানার ওপাশ থেকে দোনলা বন্দুক তুলে দেখালেন অক্ষয়বাবু! এলাকায় চুরিডাকাতি হয়। তাই বন্দুকের লাইসেন্স জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু ভালুককে গুলি করে মারা যায়। প্রেতাত্মাকে তো যায় না। সেটাই প্রবলেম। আপনি দেখলেন তো! ভূতুড়ে বইটা কী খেল দেখাল!
–হ্যাঁ। আমি মুখ না ঘোরালে নাক ভেঙে দিত!
–ওহ! কী সর্বনেশে বই! ওটাকে কেন যে গঙ্গায় ফেলে দিইনি? আসলে আমার মনে হয়েছিল, এর পেছনে কোনও জটিল রহস্য আছে। তাই আপনাকে ডেকে বইটা না দেখানো পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলুম না। হা-বইটা কি নিচে রেখে এসেছেন?
কর্নেল হাসলেন, আমার ব্যাগে ভরে রেখেছি। তবে ব্যাগটা দেয়ালের ব্র্যাকেট ঝুলিয়েছিলুম। ব্র্যাকেটের হুক ভেঙে ব্যাগটা নিচে পড়ে গিয়েছিল।
–অ্যাঁ! বলেন কী?
–ব্যাগটা টেবিলে সোজা রেখে বাথরুমে ঢুকেছিলুম। এসে দেখি ব্যাগটা কাত হয়ে পড়ে আছে। জয়ন্তের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে!
অক্ষয়বাবু মাথা নেড়ে বললেন,–বইটা তাহলে নিচে রেখে আসা ঠিক হয়নি।
এইসময় হঠাৎ আমাদের পিছন দিকে জানলার ওধারে ফিসফিস শব্দে কারা কথা বলে উঠল। অক্ষয়বাবু নড়ে বসলেন। ইশারায় আঙুল তুললেন।
কর্নেল পালঙ্কের পাশ দিয়ে এগিয়ে জানলা খুললেন। তারপর টর্চের আলো জ্বাললেন। বললেন,–আশ্চর্য! এদিকে তো দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই। খাড়া দেয়াল নেমে গেছে!
অক্ষয়বাবু বললেন,–সেই তো বলছি! আমার বুদ্ধিসুদ্ধি ঘুলিয়ে গেছে। ফিসফিস কথাবার্তার শব্দ ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। আমি হতবাক হয়ে বসে আছি। ভয় যে পাইনি, তা নয়। তবে কর্নেল পাশে আছেন বলে সাহস পাচ্ছিলুম।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপনাদের গৃহদেবতা নৃসিংহদেবের পুজোআচ্চা নিয়মিত হয়। অথচ তিনিও প্রেতাত্মাটাকে জব্দ করতে পারছেন না। এটাই আশ্চর্য!
পাশের বাড়ি থেকে হঠাৎ বিকট মেয়েলি কান্নার শব্দ ভেসে এল। অক্ষয়বাবু বললেন,–ওই আরেক জ্বালা! মেন্টাল পেশেন্ট!
ধানু!–বলে হেঁকে উনি পালঙ্কের পাশে একটু সুইচ টিপলেন।
ধানু বাইরে থেকে বলল,–বলুন আজ্ঞে!
–ভেতরে আসবি তো? কী হয়েছে রাধারানির? অমন কান্নাকাটি করছে কেন?
ধানু ভেতরে ঢুকে বলল,–বলেন তো জেনে আসি আজ্ঞে!
–তোর তো ক্ষান্তমণির সঙ্গে কথা হয়। তাকে চুপিচুপি ডেকে শুনে আয় অমন মড়াকান্না কাঁদছে কেন?
–আজ্ঞে, ক্ষান্তমণি আমার মামাতো বোন বড়কর্তামশাই! আপনি যখন আসেননি, তখন আমি ছোটকর্তামশাইয়ের বাড়ি কাজ করতুম তো। যখন আপনি এলেন, তখন ক্ষান্তমণিকে এনে দিলুম ওনাদের জন্য।
–নে! ইতিহাস শুরু করে দিল। যা! জেনে আয় শিগগির! আমার বড় অস্বস্তি হচ্ছে!
ধানু চলে গেল। কর্নেল বললেন,–বোঝা যাচ্ছে ধানু আপনাদের পরিবারের পুরাতন ভৃত্য!
