কর্নেল সিঁড়ি বেয়ে চিলেকোঠার ছাদে গিয়ে টর্চ জ্বাললেন। আশ্চর্য! ছাদে কেউ নেই। কর্নেল এগিয়ে গিয়ে পশ্চিমের আলিসায় ঝুঁকে টর্চের আলো জ্বেলে বললেন,–আশ্চর্য!
জিগ্যেস করলুম,–কী? কী?
–কয়েকসেকেন্ডের জন্য দেখলুম পাইপ বেয়ে সেই ভালুকটা নামছে! সার্কাসের ভালুক নাকি?
–আর দেখতে পেলেন না?
–নাহ। নিচে ঝোঁপ জঙ্গল আছে।
ধানু বল্লম আর টর্চ হাতে উঠে এল এতক্ষণে। বলল,–বল্লমটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিছু দেখতে পেলেন আপনারা?
কর্নেল বললেন,–নাহ।
ধানু পুবদিকে টর্চের আলো ফেলে বলল,ছাদও পাঁচিল তুলে ভাগ করা হয়েছে। ছোটকর্তামশাইয়ের ছাদে যে আলো ফেলে খুঁজব, তার উপায় নেই! বঁটি নিয়ে ছোট গিন্নিমা তেড়ে আসবেন।
আমার মনে হয় ওদিকে কোনও শব্দ হয়নি।–কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, তা হলে ওঁরা ওঁদের অংশের ছাদে খুঁজতে আসতেন।
ধানু চাপাস্বরে বলল,–কিছু বলা যায় না। ছোটকর্তামশাই পাঁচিল ডিঙিয়ে এ ছাদে এসে ধুপ-ধুপ শব্দ করেন কি না কে জানে?
আমরা সিঁড়ির মুখে গেছি, এমনসময় কালীপদবাবুর অংশের ছাদে কে জড়ানো গলায় গেয়ে উঠল–”তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে-এ-এ….
ধানু হাসি চেপে বলল,–ছোটকর্তামশাইয়ের শালাবাবু। তাপসবাবু আজ্ঞে! নেশা করেছেন মনে হচ্ছে।
কর্নেল বললেন,–বাহ! তাপসবাবুর ভালুকদর্শন হয়েছে।…
.
চার
ছাদ থেকে দোতলায় নেমে কর্নেল বললেন,–ধানু! তোমার কর্তামশাইকে বলো, আমরা আপাতত নিচে যাচ্ছি। আমাকে পোশাক বদলাতে হবে। হাঁসখালির বিলে হাঁস দেখতে গিয়েছিলুম। পোশাকে কাদা লেগে আছে।
নিচে গেস্টরুমের দরজায় লণ্ঠন জ্বেলে রেখে নবঠাকুর রান্নাঘরে ছিলেন। উঁকি মেরে বললেন, –আপনারা কলকাতার মানুষ স্যার! কটায় খাবেন?
কর্নেল বললেন,–তোমার কর্তা কটা বাজলে খান?
–আজ্ঞে নটায়।
-–ঠিক আছে আমরাও ওইসময় খাব। আপাতত এক বালতি জল চাই।
–একটু গরম জল মিশিয়ে দিচ্ছি স্যার! যা ঠান্ডা পড়েছে! জল একেবারে বরফ!
তা-ই দাও।-বলে কর্নেল লণ্ঠন তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। লণ্ঠন টেবিলে রেখে কিটব্যাগ খুলে দেয়ালের ব্র্যাকেটে ঝুলিয়ে দিলেন। টুপিটাও ঝুলিয়ে রেখে চেয়ারে বসলেন।
বললুম,–ভূতুড়ে বইটা দেখছি আপনার কিটব্যাগের ভেতর একেবারে শান্ত হয়ে আছে।
কর্নেল হাসলেন,–ক্লান্তি জয়ন্ত, ক্লান্তি! তখন আরনচেস্টের ভেতর অত নাচানাচি করেছে। তারপর আমার দাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সুড়সুড়ি খেয়েছ। তাই ক্লান্তিতে ঝিমোচ্ছে! ভয়ও পেয়েছে বইকী! আবার যদি দাড়িতে চেপে ধরি?
চাপাস্বরে বললুম,–ব্যাপারটা সত্যি অবিশ্বাস্য! বুদ্ধিতে এর ব্যাখ্যা মেলে না। তা ছাড়া ছাদেই বা ভালুক উঠল কেন?
–ভালুক গাছে চড়তে পারে। পাইপ বেয়ে ছাদে চড়তে পারে না?
–কিন্তু কেন?
–সম্ভবত সার্কাসের ভালুক। এই শীতে গ্রামাঞ্চলেও সার্কাসের দল আসে। কোনও দল থেকে পালিয়ে এসেছে। তো তুমি বলছ, ছাদে চড়ল কেন? অভ্যাস! ট্রাপিজের খেলায় পাকা। তাই ছাদে চড়ে কসরত দেখাচ্ছিল!
.
কর্নেলের চুরুট নিভে গিয়েছিল। লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিলেন। বললুম,–পোশাক বদলাবেন বললেন। কিন্তু সঙ্গে তো আমার মতো বাড়তি একপ্রস্থ পোশক আনেননি আপনি।
–আলবাত এনেছি। কিটব্যাগটা কেমন হৃষ্টপুষ্ট দেখতে পাচ্ছ না? বলার সঙ্গে-সঙ্গে কিটব্যাগটা ব্র্যাকেট থেকে ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল উঠে গিয়ে ব্যাগটা তুলে বললেন,–মরচে ধরা পুরনো ব্র্যাকেট। হুকগুলো ক্ষয়ে গেছে। বরং ব্যাগটা টেবিলে রাখি।
কর্নেল নিচে থেকে ব্র্যাকেটের ভাঙা হুকটা কুড়িয়ে বাইরে ছুঁড়ে পেললেন। বললুম,–কর্নেল! ব্যাপারটা কিন্তু সন্দেহজনক।
উনি কোনও কথা বললেন না। চেন খুলে প্যান্ট-শার্ট বের করে নিলেন। তারপর চেন এঁটে টেবিলে লম্বালম্বি ব্যাগটাকে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। একটু পরে নবঠাকুর এক বালতি জল এনে সংলগ্ন বাথরুমে রেখে এলেন। এতক্ষণে বিদ্যুৎ এল।
কর্নেল জ্যাকেট খুলে সেই ব্র্যাকেটের হুক পরীক্ষা করে শক্ত একটা হুকে ঝুলিয়ে দিলেন। তারপর পোশাক বদলাতে বাথরুমে ঢুকলেন।
একটু পরে দেখি, টেবিলে কিটব্যাগটা কাত হয়ে পড়ল। আমার বুকের ভেতর যেন ঠান্ডাহিম টিল গড়িয়ে গেল। এবার যদি কিটব্যাগটা নাচতে শুরু করে, কী করব ভেবে পাচ্ছিলুম না।
কিন্তু কিটব্যাগটা কাত হয়েই রইল। কর্নেল প্যান্ট-শার্ট বদলে তোয়ালেতে মুখ মুছে দাড়ি এবং টাকের তিনপাশের চুল আঁচড়ে ধোপদুরস্ত হয়ে বেরুলেন। জ্যাকেটটা পরে নিলেন। তারপর খাটের তলা থেকে রবারের চটি পরে চেয়ারে বসলেন। একটু হেসে বললেন,–কিটব্যাগটা দ্বিতীয়বার পড়ায় তুমি যদি ভয় পেয়ে থাক, কিছু বলার নেই।
একটু দ্বিধার সঙ্গে বললুম,–না–মানে। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। কারণ আপনিই বলেন, কোনও ঘটনাকে তার সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে বিচার করা উচিত। কিটব্যাগে ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’ আছে। তাই
কর্নেল হাসলেন,–ব্যালান্স, জয়ন্ত! ব্যালান্স! এ ধরনের লম্বাটে কোনও ব্যাগকে সোজা বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা কঠিন। মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের ব্যাপার। তবে আমি ইচ্ছে করেই ব্যাগটা ওভাবে দাঁড় করিয়ে গিয়েছিলুম। নাহ! তুমি দেখছি, দিনে-দিনে ক্রমশ–
ওঁর কথা থেমে গেল। পশ্চিমদিকের দরজায় আচমকা শব্দ হল এবং নড়তে থাকল। সেইসঙ্গে খরখর খসখস অদ্ভুত শব্দ। কর্নেল সোজা উঠে গিয়ে দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বললেন,–বাবা ভালুক! খামোকা রিভলভারের একটা গুলি খরচ করাবে কেন? আজকাল গুলির যা দাম বাবা! এভাবে কিছু হবে না ডার্লিং! তুমি ভুল পথে হাঁটছ!
