দোতলায় অক্ষয়বাবু ঘরে আলো জ্বলছিল। তবে লোডশেডিংয়ের কথা ভেবে পাশে একটা টেবিলের ওপর চিনে লণ্ঠন দম কমিয়ে রাখা হয়েছে। জানলাগুলো বন্ধ। ওপরে শীতের হাওয়ার উপদ্রব বেশি।
আমরা বসলুম। অক্ষয়বাবু গম্ভীরমুখে বললেন,–স্বকর্ণে শুনলেন কালীর বউ অকারণ ঝগড়া বাধাতে চায়?
কর্নেল হাসলেন,–হ্যাঁ ভদ্রমহিলা সম্ভবত মানসিক রোগী।
অক্ষয়বাবুর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল,–ঠিক। ঠিক ধরেছেন! আমার ভয় হয় কবে না সত্যি এ বাড়িতে কারও দিকে বঁটি ছুঁড়ে মারে। কালীর উচিত ওকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া। কে বলবে বলুন?
কর্নেল বললেন,–জঙ্গলের রাস্তায় গঙ্গার ধারে গিয়েছিলুম। কাছেই শ্মশান আছে দেখলুম।
–ওটাই সাবেক আমলের শ্মশান। শ্মশানকালীর মন্দির ছিল ধ্বংস হয়ে গেছে।
–আপনি কি ওখানে গিয়েই অদৃশ্য হাতের চাটি খেয়েছিলেন? অক্ষয়বাবুর মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল। ঝটপট বললেন,–আজ্ঞে হাঁ। নিতান্ত কৌতূহল। শ্মশানের কাছাকাছি যেই না গেছি, অমনি মাথায় জোরে চাটি। আছাড় খেয়ে পুরনো আমলের ঘাটের একটুকরো পাথরে পড়ে গিয়েছিলুম। পড়বি তো পড়, সেই বাঁ হাটু ঠুকে–উঃ! একটুও নড়ানো যাচ্ছে না। কলকাতা গিয়ে চিকিৎসা করাব কি না ভাবছি।
এই সময় খট খটাং করে চাপা শব্দ হতে থাকল। অক্ষয়বাবু আঁতকে উঠে বললেন,–ওই শুনুন! আয়রন চেস্টের ভেতর বইটা যেন লাফাচ্ছে!
কর্নেল পকেট থেকে তার খুদে কিন্তু জোরালো আলোর টর্চ বের করে আয়রনচেস্টের কাছে গেলেন। তারপর ওটার গায়ে কান পেতে বললেন, হ্যাঁ। একটা কিছু নড়াচড়া করছে বটে!
–বইটা! ভূতুড়ে বইটা!
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। কনেলে বললেন,–আয়রনচেস্টের চাবিটা দিতে আপত্তি না থাকলে একবার দিন।
না, না। আপত্তি কীসের? এই নিন।–বলে অক্ষয়বাবু বালিশের তলা থেকে একটা প্রকাণ্ড চাবি তার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। কর্নেল চাবিটা লুফে নিয়ে আয়রনচেস্ট খুললেন। ভারী এবং মোটা ইস্পাতের দরজার হাতল টানার সঙ্গে সঙ্গে কর্নেলের মুখের ওপর একটা বই ছিটকে পড়ল। উনি দ্রুত মুখ ঘুরিয়েছিলেন। তাই বইটা ওঁর দাড়িতে লেগেছিল। বইটা ধরে উনি আয়রনচেস্টের ভেতরটা দেখে নিয়ে দরজা বন্ধ করলেন। তারপর তালা এঁটে দিলেন।
কর্নেল চাবিটা অক্ষয়বাবুকে ফেরত দিয়ে বইটা খুলছেন, এমন সময় লোডশেডিং হয়ে গেল। অক্ষয়বাবু হাত বাড়িয়ে চিনা লণ্ঠনের দম বাড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন–দেখলেন? দেখলেন?
কর্নেল তুম্বা মুখে বললেন,–থাক। বইটা এখন খোলার দরকার নেই। বলা যায় না, লণ্ঠনটা নিভে গেলে কেলেঙ্কারি। আমার টর্চ জ্বেলে যদি পড়ার চেষ্টা করি, হয়তো প্রেতাত্মা আমার টর্চ বিগড়ে দেবে। ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই।
হলুদ মলাটে লাল সুতোয় সেলাই করা এবং লাল কালিতে লেখা ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ। ঠিক একই বই কলকাতায় ভক্তিবাবু দিয়ে গেছেন কর্নেলকে। বইটা উনি কিটব্যাগে ঢুকিয়ে চেন এঁটে দিলেন। তারপর বললেন,–আচ্ছা অক্ষয়বাবু, বাই এনি চান্স আপনি ভক্তিভূষণ হাটি নামে কোনও ভদ্রলোককে চেনেন?
অক্ষয়বাবু বললেন,–ভক্তিভূষণ হাটি? না তো। কোথায় থাকেন তিনি?
–কলকাতায়।
–তা ওঁর কথা কেন জিগ্যেস করছেন কর্নেলসায়েব?
–উনিও এক কপি ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’ কিনে আপনার মতো বিপদে পড়েছেন।
–অ্যাঁ? বলেন কী?
–তবে ওঁকে অবশ্য প্রেতাত্মা আছাড় মারেনি। চাটিও মারেনি। উনি দিব্যি চলাফেরা করে বেড়াচ্ছেন।
অক্ষয়বাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন,–উনিও কি আপনার সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। বইখানা আমি আপনার মতো আলমারির লকারে চাবি এঁটে রেখে এসেছি।
–আলমারির ভেতর কোনও শব্দটব্দ
–আমি শুনিনি। তবে আমার কাজের লোক ষষ্ঠীচরণ শুনেছে।
এই সময় ধানু কফি এবং স্ন্যাক্সের ট্রে নিয়ে এল। এতক্ষণ নিচের মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজছিল। এবার থেমে গেল। ধানু ট্রে রেখে দ্রুত চলে গেল।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–ওই জঙ্গলে একটা বুনো ভালুক আছে শুনলাম। দুপুরে বাইনোকুলারে কী একটা কালো জন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমিও দেখেছি।
অক্ষয়বাবু বললেন,–হ্যাঁ। ধানুও ভালুকটার মুখ দেখেছে বলছিল। বুঝতে পারছি না। ওই জঙ্গলে ভালুক কী করে এল। এক হতে পারে, কোনও মাদারির খেলোয়াড় ভালুক হয়তো পালিয়ে এসেছে। শুনেছি, পোষা ভালুক কোনও কারণে হঠাৎ খেপে যায়। তখন বুনো ভালুকের চেয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে। কেউ থানায় পুলিশকে বা ফরেস্ট অফিসে কেন খবর দিচ্ছে না? দেখি, ধানুকে দিয়ে আমিই খবর পাঠাব।
কফি খেয়ে পেয়ালা রেখেছি এবং কর্নেল চুরুট ধরিয়েছেন, এমন সময় হঠাৎ ছাদের ওপর ধুপধুপ শব্দ হল এবং কড়িবরগার ফাঁকে ঝরঝর করে একটু চুনবালি খসে পড়ল। অক্ষয়বাবু আঁতকে উঠে বললেন,–ওই শুনুন! তারপর তিনি ডাকলেন, ধানু! ধানু!
বিদ্যুৎ নেই। তাই কলিংবেল বাজানোর উপায় নেই। ধানু নিচে থেকে সাড়া দিল,–বড়কর্তামশাই! যাচ্ছি!
অক্ষয়বাবু হাঁক দিলেন,–বল্লম! বল্লম নিয়ে চিলেকোঠায় চলে যা ধানু! আবার সেই অত্যাচার!
কর্নেল পকেট থেকে টর্চ বের করে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করলুম। অক্ষয়বাবু বললেন,–যাবেন না কর্নেলসায়েব। আপনারা আমার অতিথি। অতিথির বিপদ হলে মুখ দেখাতে পারব না!
