কর্নেল বললেন,–ইলেকট্রিক আলো জ্বলে?
আলোর কথা বলবেন না স্যার!-ধানু হাসল, এই আছে, এই নেই। কোনও-কোনও রাতে তো কারেন্ট থাকেই না। সেইজন্য ওই দেখুন, আপনাদের জন্য লণ্ঠনের ব্যবস্থা করে রেখেছি।
–আচ্ছা ধানু, ওই জঙ্গলে বুনো জন্তুজানোয়ার আছে কি না জানো?
জবাব দিলেন নবঠাকুর,–কিছুদিন থেকে একটা ভালুক দেখা যাচ্ছে শুনেছি। তবে আমি দেখিনি স্যার!
ধানু বলল,–হা স্যার! গাঁয়ের লোকেরা নাকি দেখেছে। আমি পরশু সন্ধ্যাবেলা গাইগরু আর বাছুরটাকে ওই গোয়ালঘরে ঢোকাতে যাচ্ছিলুম হঠাৎ টর্চের আলোয় পাঁচিলের ওপর কালো মুন্ডু দেখলুম। মুন্ডুটা তক্ষুনি ওধারে নেমে গেল। গরুটা খুব চমকে উঠেছিল। ভালুকই বটে। সেইজন্যে পাঁচিলের ওপর কাটাঝোঁপ কেটে চাপিয়ে রেখেছি।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার বড়কর্তা ভালুক দেখে সিঁড়িতে পড়ে হাঁটু ভাঙেননি তো?
ধানু গম্ভীর মুখে বলল,–জানি না স্যার! উনি খুলে কিছু বলেননি। রাত দুপুরে কেন নিচে নামছিলেন জানি না। লোডশেডিং ছিল। হঠাৎ হুড়মুড় শব্দ আর ওনার চাচানি শুনে গিয়ে দেখি সিঁড়ির নিচে হাঁটু চেপে ধরে ককাচ্ছেন। সেই রাত্তিরে নাড়ুবাবু ডাক্তারকে বড়হাটছড়ি থেকে ডেকে আনলুম। উনি ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। একমাস বড়কর্তামশাই বিছানায় শুয়ে ছিলেন।
–আবার নাকি আছাড় খেয়ে হাঁটুতে আঘাত পেয়েছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। বড়কর্তামশাইয়ের বিকেলে গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়ার অভ্যাস আছে। গাঁয়ের ভেতর দিয়ে ঘুরে ওই জঙ্গলের মধ্যিখানের রাস্তা ধরে গঙ্গার ধারে যেতে হয়। যেই বিছানা ছেড়ে লাঠি হাতে হাঁটতে শুরু করেছেন, অমনি সেই অভ্যাস চাগিয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যাবেলায় গঙ্গার ধারে আবার আছাড় খেয়ে পড়েছিলেন। ভাগ্যিস জেলেপাড়ার লোকেরা ওনাকে দেখতে পেয়েছিল। ধরাধরি করে বয়ে এনেছিল। আবার নাড়ু ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে গেছেন।
এই সময় নিচে কোথাও ঘণ্টি বাজল ক্রিরিরিরিং! শোনামাত্র ধানু চলে গেল।
খাওয়ার পর কর্নেল দক্ষিণের দরজা খুলে চেয়ার নিয়ে গিয়ে রোদে বসলেন। চুরুট ধরিয়ে বাইনোকুলার তুলে সম্ভবত জঙ্গলে ভালুকটা খুঁজতে থাকলেন। আমি ভাত-ঘুম দিতে বিছানায় গড়িয়ে পড়লুম।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। নবঠাকুরের ডাকে চোখ খুলে দেখি, সে চা এনেছে। বাইরে শেষবেলার ধূসর আলো। তারপরই ভালুকের কথা এবং কর্নেলের সাবধানবাক্য মনে পড়ল। আঁতকে উঠে দেখি, দক্ষিণের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমার গায়ে কম্বল। হা-কর্নেলের কাজ। জিগ্যেস করলুম-ঠাকুরমশাই! কর্নেলসায়েবকে দেখেছেন?
নবঠাকুর বললেন,–সায়েব তো কখন বেরিয়ে গেছেন। বোধ করি, বেড়াতে গেছেন।
চা খাওয়ার পর দক্ষিণের দরজা খোলার সাহস হল না, উত্তরের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরদিকের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলুম। বিদ্যুৎ আছে। কেন না বাড়িতে আলো জ্বলছে। ডানদিকে ছোটকর্তা কালীপদবাবুর বাড়ির দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, এক ভদ্রমহিলা দোতলার জানলা বন্ধ করে দিলেন। বুঝলুম, উনিই সেই দজ্জাল মহিলা। কালীপদবাবুর স্ত্রী। একটু পরে সম্ভবত ওঁরই চিৎকার কানে এল,–ক্ষান্তমণি! অ ক্ষান্ত! বঁটিতে শান দিয়ে রেখেছিস তো?
কেউ চেরা গলায় বলল,–হা গিন্নিমা! এমন শান দিয়েছি যে, এক কোপে দু-দুটো বলি হয়ে যাবে!
সর্বনাশ! নিশ্চয় আমাকে এবং কর্নেলকে লক্ষ করে কথা হচ্ছে। আস্তে ডাকলুম,–ঠাকুরমশাই!
নবঠাকুর কথাগুলো শুনতে পেয়েছিলেন। ফিক করে হেসে বললেন,–কান দেবেন না স্যার! আমরা প্রতিদিন শুনে-শুনে অভ্যস্ত। তবে মজাটা দেখবেন?
বলে সে জোরে ডাকল-ধানু! অ ধানু! জঙ্গলে ভাল্লুক এসেছে। বল্লমটা শান দিয়েছ তো?
ধানু গোয়ালঘরে গরু ঢোকাচ্ছিল। সেখান থেকে সাড়া দিল-বল্লম চকচক করছে ঠাকুরমশাই! ভাল্লুক এঁফোড়-ওফোড় করে ফেলব।
দ্বিগুণ জোরে ভদ্রমহিলা বললেন,–ক্ষান্ত! অ ক্ষান্তমণি! বঁটিখানা দে তো!
ক্ষান্তমণির সাড়া এল,–এই নিন গিন্নিমা! জোরে ছুঁড়ে মারবেন! খ্যাচাং করে মুণ্ডু কেটে যাবে।
তারপর পুরুষকণ্ঠে কেউ ধমক দিল,–কী হচ্ছে সন্ধ্যাবেলায়? শাঁখে ফুঁ না দিয়ে মুণ্ডু কাটাকাটি কেন?
এই সময় কর্নেল ফিরে এলেন। আমার মাথার ওপর কোথাও বেল বেজে উঠল। ধানু হন্তদন্ত হয়ে ওপরে চলে গেল। তারপর কান ফাটানো শাঁখ বাজল। নবঠাকুর পট্টবস্ত্র পরে কোষাকুষি গঙ্গাজলের ঘটি, ফুলের ডালি নিয়ে সিঁড়ির পাশের দরজা খুলে মন্দিরে পুজো দিতে গেলেন। কর্নেল এসে চাপাস্বরে বললেন,–ভাগ্যিস অক্ষয়বাবু বিয়ে করেননি। যা বোঝা গেল, এ বাড়িতে একজন মহিলা থাকলে কেলেঙ্কারি হত। জ্ঞাতিকলহ সাংঘাতিক ব্যাপার!
বললুম,–আপনি প্রজাপতি ধরতে বেরিয়েছিলেন? নাকি হাঁসখালির বিলে হাঁস দেখতে?
কর্নেল হাসলেন,–নাহ্! জঙ্গলে ভালুক খুঁজতে!
–বলেন কী! ভালুক অকারণে হিংস্র হয়ে ওঠে শুনেছি!
–হ্যাঁ। তবে ভালুকের বদলে তার কয়েকগাছা লোম কুড়িয়ে পেয়েছি!
–কোথায়? কোথায়?
–মন্দিরের পেছনে একটা ঝোঁপের ভেতর।
ধানু এসে বিনীতভাবে বলল,–বড়কর্তামশাই সায়েবদের ডাকছেন আজ্ঞে! আপনারা চলুন। ওপরে। ঠাকমশাই মন্দিরে আছেন। আমি কফি তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছি।
কর্নেলের পিঠে কিটব্যাগ এবং তার চেনের ফাঁকে প্রজাপতি ধরা জালের স্টিক উঁচিয়ে আছে। গলা থেকে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার ঝুলছে। মাথার টুপি ঝেড়ে পরলেন। তারপর নিচে নেমে উঠোনের ঘাসে হান্টিং জুতোর তলা ঘষে সাফ করে বললেন,–চলো জয়ন্ত! সাজসরঞ্জাম সঙ্গেই থাক।
