–সেই বইটার কথা বলুন!
অক্ষয়বাবু চাপা গলায় বললেন, আমার দুর্মতি! মাস তিনেক আগে কলকাতা গিয়েছিলুম। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলুম। সেখানে পুরোনো বই বিছিয়ে বসে ছিল একটা লোক। হাঁকছিল, যা নেবেন তাই দু-টাকা। তো হঠাৎ চোখ গেল ওই বইটার দিকে আসল মলাট নেই। হলদে মোটা কাগজে মলাট করে
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, আপনার চিঠিতে বইটার অদ্ভুত আচরণের উল্লেখ আছে। সেই কথা বলুন!
অক্ষয়বাবুর মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। এবার উনি যা-যা বললেন, সবটাই কলকাতার কান্তি খটিক লেনের সেই ভক্তিবাবুর বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। তবে ভক্তিবাবুর দু-দুবার ঠ্যাং ভাঙেনি। অক্ষয়বাবুর ভেঙেছে। এই যা তফাত।
ইতিমধ্যে ধানু কফি আর চানাচুর রেখে গেল ট্রেতে। কর্নেল কফির পেয়ালা তুলে চুমুক দিয়ে বললেন,–বইটা এখন কোথায় রেখেছেন?
অক্ষয়বাবু বললেন,–দেয়ালে আঁটা আয়রনচেস্টে রেখেছি।
–তা হলে তারপর আর কোনও উপদ্রব হচ্ছে না?
–উপদ্রব মানে, রাতদুপুরে আয়রনচেস্টের ভিতর বিঘুঁটে শব্দ শুনতে পাই।
–আপনার বাড়িতে আপনি, কাজের লোক ধানু আর নবঠাকুর ছাড়া আর কেউ নেই?
–আজ্ঞে না।
–পাশের বাড়িতে আপনার বৈমাত্রেয় ভাই কালীপদবাবু থাকেন। তার ফ্যামিলিতে কে-কে আছে?
–ওর দজ্জাল বউ রাধারানি,–রাধারানির এক উড়নচণ্ডী নেশাখোর ভাই–মানে কালীর শ্যালক তাপস, কাজের মেয়ে ক্ষান্তমণি। রাধারানির সন্তানাদি নেই। ভীষণ ঝগড়াটে মেয়ে। খামোকা সকাল-সন্ধ্যা আমার নামে পিণ্ডি চটকায়।
কর্নেল দক্ষিণের জানালার দিকে আঙুল তুলে বললেন,–ওইটে বুঝি আপনাদের গৃহদেবতার মন্দির?
অক্ষয়বাবু বললেন,–হ্যাঁ। নৃসিংহদেব আমাদের গৃহদেবতা। পাঁচশো বছরের পুরনো বিগ্রহ কর্নেলসায়েব! পালা করে পুজোর খরচ বহন করি। এক সপ্তাহ আমি। পরের সপ্তাহ কালী।
–পূজারীর নাম কী?
–আমার রান্নার ঠাকুর নবই বরাবর পূজারী। কালীর সঙ্গে রফা করেছিলুম। বাইরের পূজারী রাখলে অনেক বেশি দিতে হবে। নবঠাকুরকে কালী যা দেয়, তা আমার দেওয়ার অর্ধেক। কম খরচায় কালী পুণ্যার্জন করছে। তবু ওর লোভ যায় না।
–কীসের লোভ?
অক্ষয়বাবু একটু ইতস্তত করে বললেন,–ওর বিশ্বাস, আমাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ধনরত্ন নাকি আমি গোপনে গচ্ছিত রেখেছি। অথচ দেখুন মাত্র তিনবছর হল আমি বাড়ি ফিরেছি। সারাজীবন পাহাড়পর্বত অরণ্যে সাধু-সঙ্গ করে বেড়িয়েছি। কোনও গোপন ধনরত্ন থাকলে তার খবর কালীরই রাখার কথা পিতৃদেবের মৃত্যুকালে কালীই মাথার কাছে ছিল। আমি তখন কোথায়?
–আপনার কী ধারণা?
–কী বিষয়ে?
–পূর্বপুরুষের ধনরত্ন–
অক্ষয়বাবু জোরে মাথা নেড়ে হাসলেন,–কর্নেলসায়েব! ধনরত্ন যা কিছু ছিল, তা আমার ঠাকুর্দাই খরচ করে গেছেন। ঠাকুমার মুখে ছোটবেলায় শুনেছি। খুব খরুচে লোক ছিলেন তিনি।
বলে অক্ষয়বাবু হাত বাড়িয়ে পালঙ্কের পেছনে একটা সুইচ টিপলেন নিচের দিকে ক্রিরিরিরিং করে চাপা শব্দ হল। এতক্ষণে লক্ষ করলুম বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে।
ধানু দরজার বাইরে থেকে সাড়া দিল,–আজ্ঞে বড়কর্তামশাই?
–হতভাগার এই স্বভাব। ভেতরে আয়!
ধানু ভেতরে এলে অক্ষয়বাবু বললেন,–সায়েবদের থাকার ঘর ঠিক করেছিস?
আজ্ঞে, নিচের ঘরে গেসরুমে।
গেস্টরুম বল।-অক্ষয়বাবুর হাসলেন, কর্নেলসায়েবদের নিয়ে যা আপনারা বিশ্রাম করুন। খাওয়া-দাওয়ার পর যথাসময়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
নিচের তলায় পশ্চিমদিকের গেস্টরুমটা মন্দ নয়। দক্ষিণে খোলা বারান্দা। পশ্চিমের দরজা খুললে কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা সরকারি জঙ্গল। তবে দক্ষিণের বারান্দায় রোদ্দুর আছে। বারান্দার নিচে শানবাঁধানো চত্বর। তার শেষে মন্দির। কর্নেল বাইনোকুলারে জঙ্গলে সম্ভব পাখি খুঁজছিলেন। হঠাৎ বললেন,–সর্বনাশ এই জঙ্গলে ভালুক এল কোত্থেকে?
অবাক হয়ে বললুম,ভালুক? বলেন কী!
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, কয়েক সেকেন্ডের দেখা। ঝোপে লুকিয়ে গেল। জয়ন্ত! আমাদের সাবধানে থাকা দরকার।… কর্নেলের কথায় ভয় পেয়েছিলুম। পশ্চিমের দরজা খুললে ভাঙা জমিদারবাড়ির পাঁচিল, তার ওধারে বনদফতরের কাঁটাতারের বেড়া কোনও ভালুককে আটকাতে পারবে না। আবার দক্ষিণেও তাই। পাঁচিল ধসে পড়েছে কবে। তার ওপর আগাছা গজিয়েছে। কাজেই ভালুক ইচ্ছে করলে দুটো দিক থেকেই এসে হানা দিতে পারে।
এখানে ঠান্ডাটা বড্ড বেশি। তাই স্নান করলুম না। আর কর্নেলের তো সামরিক জীবনের অভ্যাস। স্নান না করে দিব্যি দুসপ্তাহ কাটিয়ে দিতে পারেন। আমাদের ঘরে টেবিল-চেয়ার আছে। দুপুরে খাওয়াটা সেখানেই হল। ধানু বাইরে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে তদারক করছিল। নবঠাকুর ভালোই রাঁধেন।
কর্নেল তাকে জিগ্যেস করলেন,–পুরনো বাড়িতে নাকি ভূতের উপদ্রব হয়। এ বাড়িতে হয় না?
নবঠাকুর বললেন,–আগে হত না। ইদানীং হচ্ছে স্যার! রাতবিরেতে নানককম বিদঘুঁটে শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তবে আমি একটু আধটু তন্ত্রমন্ত্র চর্চা করি। মন্ত্র পাঠ শুরু করলেই প্রেতাত্মা পালিয়ে যায়। ধানুকে জিগ্যেস করে দেখুন।
ধানু বলল,–আমি স্যার ওপরতলায় বড়কর্তামশাইয়ের পাশের ঘরে থাকি। অত্যাচারটা ওপরতলায় বেশি হয়। ছাদে মচমচ ধুপ-ধুপ শব্দ শুনতে পাই। বড়কর্তার জানলার পাশে ফিসফিস করে কারা কথাবার্তা বলে, টর্চ জ্বালি। কিন্তু কাউকে দেখতে পাই না।
