–মধুবাবু! ভাষাবিদ পণ্ডিতেরা বলেন সামন্তরাজ’ কথাটা থেকেই অপভ্রংশে সাঁতরা পদবি।
–তা-ই বটে স্যার। আমি ভাবতুম সাঁতরা পদবি জমিদারদের হয় কী করে?….
সবখানে দেখেছি, কর্নেল স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে অনেক তথ্য জোগাড় করে ফেলেন। তা হলে হাটছড়ি গ্রাম এবং অক্ষয় সাঁতরার ব্যাকগ্রাউন্ড জানা গেল। এতক্ষণে আমার মনে ক্ষীণ আশা জাগল, সত্যিই একটা রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা স্টোরি হয়তো পেয়ে যাব এবং দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পাঠকরা তো গোগ্রাসে গিলবে।
সকালে ব্রেক ফাস্ট করে আমরা বাসস্ট্যান্ডে গেলুম। বড় হাটছড়ির বাস ছাড়ল সাড়ে ন’টায়! ভাগ্যিস আমরা বসার সিট পেয়েছিলুম। বাসটা যখন ছাড়ল, তখন বাসটার ভেতরে তিলধারণের জায়গা নেই। তারপর রাস্তায় যেখানে সেখানে থেমে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে পিলপিল করে যাত্রী বাসটার দুধারে, পেছনে, মাথার ওপর যেন মৌমাছির চাকের মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছে। ভয় হচ্ছিল রাস্তার যা অবস্থা, দুধারে গভীর খাদ–বাসটা টাল সামলাতে না পেরে উলটে যাবে না তো?
মাত্র আট কিলোমিটার যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে গেল। কর্নেল একটা সাইকেল রিকশ ডাকলেন। কিন্তু হাটছড়িতে সাঁতরাবাবুদের বাড়ি যাবেন শুনে সে বলল,–পায়ে হেঁটে চলে যান স্যার! ওই কাঠের বিরিজ দেখছেন! রিকশর ভার সহ্য করতে পারবে না। কোন কালের বিরিজ! সাবধানে লোক চলাচল করে।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন,–আমার ওজন সইতে পারবে তো হে? কী মনে হয় তোমার? রিকশওয়ালা পরামর্শ দিল,–কিনারা দিয়ে যাবেন না যেন। শুনেছি, বড় সাঁতরাবাবু বিরিজ ভেঙে নাকি পড়ে গিয়েছিলেন। হাঁটুর মালাইচাকি ভেঙে গিয়েছিল।
–অক্ষয়বাবুর কথা বলছ?
–আজ্ঞে।
–উনি বড়। তাহলে ছোটর নাম কী?
–কালীপদবাবু। উনি রোগা পাকাটি লোক স্যার!
রিশওয়ালা দুজন যাত্রী পেয়ে তক্ষুনি চলে গেল। কর্নেল বাইনোকুলারে ওদিকটা দেখে নিয়ে বললেন,–চলো জয়ন্ত! বেশিদূর নয়। গাছপালার ফাঁকে দোতলা বিশাল একটা পুরোনো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ওটাই সম্ভবত অক্ষয়বাবুর বাড়ি।
কাঠের সাঁকোটার অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। কর্নেল সাবধানে পেরিয়ে গেলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম। সঙ্কীর্ণ রাস্তার দুধারে ঘন গাছপালা ঝোঁপঝাড়। রাস্তায় পুরোনো আমলের ইটের খোয়া মাথা উঁচিয়ে আছে। ডাইনে বাঁক নিয়ে দেখি ভেঙে পড়া গেট এবং ধ্বংসস্তূপ। বাঁ-দিকে কাঁচা রাস্তাটা গ্রামের ভেতর গিয়ে ঢুকেছে। গেটের পর এবড়ো-খেবড়ো খোয়াঢাকা রাস্তার দুধারে পাম গাছের সারি। মাঝে-মাঝে একটা করে গাছ মরে দাঁড়িয়ে আছে কন্ধকাটার মতো। কিছুটা এগিয়ে সামনে নতুন তৈরি পাঁচিল। বাড়িটা দুভাগে ভাগ হয়ে আছে। দুটো দরজা। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–বড়বাবু এবং ছোটবাবুর আলাদা-আলাদা দরজা। তার মানে দুই ভাই পৃথগন্ন। প্রথমে ডাইনের দরজাটার কড়া নাড়া যাক।
কড়া নাড়ার আগেই দরজা খুলে গেল এবং তাগড়াই চেহারার ফতুয়া ও খাটো ধুতি পরা কালো। রঙের একটা লোক করজোড়ে প্রণাম ঠুকে বলল,–সায়েবরা কি কলকাতা থেকে আসছেন?
কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ। আমি অক্ষয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই!
সে বলল,–ভেতরে আসুন আজ্ঞে! বড়কর্তামশাই দোতলার জানলা দিয়ে আপনাদের দর্শন পেয়েছেন।
ভেতরে একটুকরো উঠোন। উঠোনে ফুলের গাছের সঙ্গে আগাছার জঙ্গল গজিয়ে আছে। এক কোণে একটা গাই গরু চরছে। নিঝুম হয়ে আছে বাড়িটা। লোকটা আমাদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে গেল। একটা ঘরের সামনে সে একটু কেশে বলল,–আজ্ঞে ওনারা এসে গেছেন বড়কর্তামশাই।
ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে সাড়া এল,–ভেতরে নিয়ে আয় হতভাগা! যেন বিনয়ের অবতার!
পুরোনো জীর্ণ পর্দা তুলে সে বলল,–আসতে আজ্ঞা হোক!
সত্যিই লোকটা বিনয়ের অবতার। ঘরটা বেশ বড়। বনেদি আসবাবপত্রে সাজানো। এমনকী ঝাড়বাতিও ঝুলছে। কোণের দিকে জানলার পাশে একটা উঁচু মস্ত বড় পালঙ্ক। পালঙ্কে ওঠার জন্য কাঠের ছোট্ট টুলের ওপর বিবর্ণ গালিচা ঢাকা। পালঙ্কে বালিশ ঠেস দিয়ে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এক পা ছড়িয়ে এক পা হাঁটু অব্দি তুলে বসে ছিলেন। নমস্কার করে বললেন,–আসুন কর্নেলসায়েব! এখানে এসে বসুন।…ধানু! তুই এঁদের জন্য কফি নিয়ে আয়। কর্নেলসায়েব কফির ভক্ত। আর শোন! শিগগির রান্নার ব্যবস্থা করতে বল নবঠাকুরকে।
ধানু চলে গেলে অক্ষয়বাবু বললেন,–বাঁ হাঁটুতে ব্যান্ডেজ কর্নেল সায়েব! তাই উঠে বসতে পারছি না। কিছু মনে করবেন না যেন।
বলে একটু করুণ হেসে আমার দিকে তাকালেন,উনি বুঝি সেই রিপোর্টার জয়ন্তবাবু? নমস্কার! নমস্কার কী সৌভাগ্য! এতদিন দৈনিক সত্যসেবকে আপনাদের দুজনকার কত কীর্তিকলাপ পড়েছি। কল্পনাও করিনি, আমার জীবনেও এমন সাংঘাতিক রহস্যময় ঘটনা ঘটবে এবং আপনাদের স্বচক্ষে দর্শন করব!
কর্নেল বললেন,–আপনার স্ত্রী এবং সন্তানাদি–
অক্ষয়বাবু বুড়ো আঙুল নেড়ে বললেন, বিয়েই করিনি তো স্ত্রীসন্তানাদি–সারাজীবন ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি কাহা-কঁহা মুল্লুক। শেষজীবনে পৈতৃক বাড়িতে এসে ঠাই নিয়েছি। আমার বৈমাত্রেয় ভাই কালীপদ পুরো বাড়িটা দখল করে রেখেছিল। মামলা-মোকদ্দমা করে শেষে দখল পেলুম। বাড়ির অর্ধেকটা গঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছিল। ওদিকটা গভর্মেন্ট দখল করে বনবিভাগের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ভাঙনরোধী জঙ্গল গজিয়েছে। নইলে এখান থেকে গঙ্গা দর্শন করা যেত।
