কর্নেল গুবরে পোকাটাকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসে বললেন,–প্রেতাত্মার অভিশাপই বটে! জয়ন্ত! পড়বে নাকি বইটা?
বললুম,–নাহ। আপনার ছাদের বাগান থেকে শীতের বৃষ্টিতে তাড়া খেয়ে গুবরে পোকারা চলে আসছে সম্ভবত। আমি গুবরে পোকার চাটি খেতে রাজি নই।
কর্নেল শুধু বললেন, আমার ছাদের বাগানে গুবরে পোকা?…
.
দুই
পরদিন সকালে কর্নেলকে টেলিফোন করলুম। সাড়া পেয়ে তার মতোই বললুম,–মর্নিং কর্নেল! আশা করি রাতে সুনিদ্রা হয়েছে?
কর্নেল বললেন,–আমার হয়েছে। ষষ্ঠীর হয়নি! সে নাকি বেজায় ভূতুড়ে স্বপ্ন দেখেছে।
-বইটার খবর বলুন!
-বইটা পড়তে গিয়ে আচমকা লোডশেডিং। তিন ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ এসেছিল। তবে অত রাতে আর পড়ার ইচ্ছে ছিল না।
-কিন্তু ওটা ঠিক জায়গায় ছিল তো?
বালিশের তলায় রেখেছিলুম। আমার মাথার ওজন আছে। তাই প্রেতাত্মা ওটা বের করতে পারেনি।-বলে কর্নেল হাসলেন, তো তুমি আমার ছাদের বাগানে গুবরে পোকার কথা বলেছিলে! কাল রাতে আমার টাকে যেটা পড়েছিল, সেটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা বোকামি হয়েছিল। সকালে বাগানে উঠে দেখি, একটা ক্যাকটাসের গোড়ায় বজ্জাতটা চিত হয়ে পড়ে আছে। যাই হোক, ওটা পাশের নিমগাছে ক্ষুধার্ত কাকদের দিকে ছুঁড়ে ফেলেছি। কাকগুলো ঠুকরে ওকে ভাগাভাগি করে খেয়েছে।
–এখন কি বইটা আপনি পড়ছেন?
–নাহ! আলমারির ভেতর রেখে তালা বন্ধ করেছি। এবার একটু বেরুব। রাখছি জয়ন্ত!.. কর্নেল টেলিফোন রেখে দিলেন। আজ আমার ইভনিং ডিউটি। বিকেল তিনটে থেকে রাত নটা। ভাবলুম, অফিস যাওয়ার পথে কর্নেলের বাড়ি হয়ে যাব। ব্যাপারটা গোলমেলে লাগছিল। নদীয়া জেলার কোনও হাটছড়ি গ্রামের অক্ষয় সাঁতরা এবং পূর্ব কলকাতার কান্তি খটিক লেনের ভক্তিভূষণ হাটি দুজনেই একই বই কিনে ঝামেলায় পড়েছেন।
আড়াইটে নাগাদ কর্নেলের ডেরায় হাজির হয়েছিলুম। আমাকে দেখে প্রকৃতিবিদ বললেন,–এসো জয়ন্ত! তোমার কথাই ভাবছিলুম!
–বইটার খবর বলুন! কোনও উৎপাত করেনি তো?
করবে কী করে? আলমারির চাবি আমার কাছে। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন তো শোনো। হাটছড়ি গ্রামের খোঁজ পেয়েছি। জি.পি.ও-র মিঃ ঘড়াই জানিয়েছেন, বড়হাটছড়ি কৃষ্ণনগর পোস্টাল সার্কেলে। অতএব কৃষ্ণনগর ডাকঘরে পৌঁছুতে পারলে বাকি খবর পাওয়া যাবে। চলো। বেরুনো যাক।
–আমি যাব কী? অফিস যেতে হবে। বিকেল চারটেয় রাজভবনে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট
কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, তোমার কাগজের চিফ রিপোর্টার সরলবাবুকে একটু আগে জানিয়ে দিয়েছি, জয়ন্ত আমার সঙ্গে এক প্রেতাত্মাকে ইন্টারভিউ করতে যাচ্ছে। সরলবাবু বুদ্ধিমান লোক। বললেন, যেন ঘুণাক্ষরে অন্য কাগজের কেউ টের না পায়। দৈনিক সত্যসেবক এক্সকুসিভ স্টোরি ছাপবে। এই হল ওঁর শর্ত।
নিচে কর্নেলের গাড়ির গ্যারাজ-ঘর অনেকদিন থেকে খালি আছে। কারণ কর্নেল তার পুরনো ল্যান্ডরোভার গাড়িটা রাগ করে বেচে দিয়েছিলেন। গাড়িটা যখন-তখন অচল হয়ে যেত। সেই খালি গ্যারাজে আমার ফিয়াটগাড়ি ঢুকিয়ে রেখে তালা এঁটে দুজনে বেরিয়ে পড়লুম। একটা ব্যাগে একপ্রস্থ জামাকাপড়, দাড়িকাটার সরঞ্জাম, টুথব্রাশ, পেস্ট, সাবান ইত্যাদি সবসময় আমার সঙ্গে থাকে। কারণ রিপোর্টারের চাকরি করি। কখন কোথায় হুট করে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হাতে সময়ও থাকে না।
কর্নেলের পিঠে আঁটা কিটব্যাগ, প্রজাপতি ধরা জাল, গলায় ঝোলানো ক্যামেরা আর বাইনোকুলার–সেই একই ট্যুরিস্টমার্কা বেশভূষা। শীতের কারণে গায়ে পুরু জ্যাকেট আর মাথায় টাকঢাকা টুপিও চড়িয়েছিলেন।
ট্রেনে কৃষ্ণনগর পৌঁছুতে সাড়ে ছ’টা বেজে গিয়েছিল। কর্নেল ট্রাঙ্ককলে সরকারি বাংলোর একটা ডাবলবেড রুম বুক করে রেখেছিলেন। কাজেই রাত কাটাতে কোনও অসুবিধে ছিল না। বাংলোর কেয়ারটেকার মধুবাবু কর্নেলের পরিচিত। রাতে খাওয়ার তদারকে নিজেই তিনি উপস্থিত ছিলেন। কথায়-কথায় কর্নেল তাকে জিগ্যেস করেছিলেন,–আচ্ছা মধুবাবু, বড়হাটছড়ি নামে
একটা গ্রাম আছে গঙ্গার ধারে। চেনেন নকি? আপনি তো স্থানীয় মানুষ। তাই জিগ্যেস করছি।
মধুবাবু বলেছিলেন,–খুব চিনি। এখান থেকে বাসে মাত্র আট কিলোমিটার। তবে গ্রাম আর নেই স্যার! এখন রীতিমতো টাউন। তা সেখানে বেড়াতে যাবেন নাকি?
–ইচ্ছে আছে।
–বেড়ানোর মতো জায়গা নয় স্যার! অবশ্য গঙ্গা আছে। কিন্তু গঙ্গা দর্শনের জন্য বড়হাটছড়ি যাওয়ার মানে হয় না!
–আসলে ওই এলাকায় নাকি একটা বিশাল জলাভূমি আছে। শীতের সময় নানারকম বিদেশি হাঁস আসে শুনে–
মধুবাবু হেসে অস্থির–বুঝেছি। বুঝেছি! আপনি হাঁসখালি বিলের কথা বলছেন। সেটা অবশ্য কাছাকাছিই বটে। ছোটহাটছড়ির পাশেই। ছোটহাটছড়ি স্যার, বড়হটাছড়ির লেজের টুকরো বলতে পারেন। মধ্যিখানে একটা ছোট্ট সোতা বিল থেকে বেরিয়ে গঙ্গায় পড়েছে। সোঁতার ওপর কাঠের ব্রিজ আছে। তবে স্যার, সত্যি বলতে কী, ওটাই ছিল পুরনো আমলের আসল হাটছড়ি। গঙ্গার ভাঙনে ওখান থেকে বসতি সরে গেছে যেখানে, সেটাই এখন বড়হাটছড়ি।
–ছোটহাটছড়িকে তাই নাকি শুধু হাটছড়ি বলা হয়?
–ঠিক ধরেছেন স্যার! মূল নাম তো হাটছড়িই ছিল। ওখানে এখনও একটা জমিদারবাড়ি আছে। অর্ধেকটা গঙ্গায় তলিয়ে গেছে। বাকি অর্ধেকটাতে প্ৰাক্ত জমিদারবংশের কেউ-কেউ থাকেন। জমিদারবংশের পদবি কিন্তু সাঁতরা স্যার!
