হাসতে-হাসতে বললুম,–বেচারা অক্ষয়বাবু আপনার সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছেন। তাকে ফেলে আপনি পাখির পেছনে ছোটাছুটি করে বেড়াবেন?
না, না। আগে অক্ষয়বাবু, তারপর বিদেশি পাখি–কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, এবং রীতিমতো রোমাঞ্চকর একটা স্টোরি যদি চাও, তাহলে তুমিও আমার সঙ্গী হবে।
–আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা বোগাস! ভদ্রলোকের পাগলামি!
বইটা জয়ন্ত, বইটা আমার পয়েন্ট। ফুটপাতে অনেকসময় অনেক পুরনো এবং দুষ্প্রাপ্য বই পাওয়া যায়। সেইসব বইয়ে যা-ই লেখা থাক, বইগুলোর পেছনে বহুক্ষেত্রে অজানা তথ্য লুকিয়ে থাকে।–কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, এমনকী বইয়ের ভেতরেও থাকে। একবার আমার হাতে একটা বই এসেছিল–
এই সময় তোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
একটু পরে ষষ্ঠী এসে বলল,–এক ভদ্রলোক বাবামশাই! বলছেন, খুব জরুরি দরকার।
–নিয়ে আয়।
ধুতি এবং তাঁতের কাপড়ের পাঞ্জাবি পরা উস্কোখুস্কো চেহারার একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে করজোড়ে নমস্কার করে বললেন,–আজ্ঞে বড় বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছিল।
কর্নেল বললেন,–বসুন। আপনার নাম?
ভদ্রলোক বিনীতভাবে বসে বললেন, আমার নাম ভক্তিভূষণ হাটি। আমি থাকি গোবরার ওদিকে কান্তি খটিক লেনে! আমি ট্যাংরা থানা থেকে আসছি। থানার বড়বাবু বললেন, আপনি কর্নেলসায়েবের কাছে যান। ভূতপ্রেতের কেস পুলিশের আওতায় পড়ে না। পেনাল কোডে নাকি তেমন কোনও ধারা নেই।
ভদ্রলোক বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাগুলো বলছেন দেখে আমার হাসি পাচ্ছিল। কর্নেলও কিন্তু সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন,–বড়বাবু ঠিকই বলেছেন। তো আপনাকে ভূতে জ্বালাচ্ছে বুঝি?
ভক্তিবাবুর কাঁধে একটা ব্যাগ ছিল! ব্যাগে হাত ভরে বললেন,–আগে বইটা দেখাই!
কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন–বই? ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ’?
ভক্তিবাবু অবাক হয়ে বললেন,–আপনি জানতে পেরেছেন? হা-থানার বড়বাবু তাহলে ঠিকই বলেছিলেন। স্যার! খুলেই বলি তা হলে।
ব্যাগের ভেতর হাত তেমনি রেখে ভক্তিবাবু বললেন,–আমি রেলওয়েতে চাকরি করতুম। গতবছর রিটায়ার করেছি। একা মানুষ। পৈতৃক একতলা বাড়ি আছে। তার একটা ঘরে ভাড়াটে থাকে। অন্য ঘরটায় আমি থাকি। তো সময় কাটাতে বরাবর বই পড়ার অভ্যাস আছে। কদিন আগে কলেজস্ট্রিটের ফুটপাত থেকে বইখানা কিনেছিলুম। রাত্তিরে পড়ব বলে টেবিলে রেখেছিলুম। বিকেলে প্রতিদিন বেড়াতে বেরোই। বাড়ি ফিরে স্বপাক খাই। খাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে টেবিলল্যাম্প জ্বেলে বই পড়ব। কিন্তু কোথায় বই? খুঁজতে-খুঁজতে অবশেষে দেখি, বইটা আলমারির তলায় পড়ে আছে। এতো ভারি আশ্চর্য! যাই হোক বইটা ঝেড়েমুছে যেই পড়তে বসেছি, অমনি লোডশেডিং হয়ে গেল। বইটা টেবিলে রেখে মোমবাতি জ্বেলে দেখি, বইটা টেবিলে নেই!
কর্নেল মন দিয়ে শুনছিলেন। বললেন,–হুঁ। তারপর?
ভক্তিবাবু চাপা গলায় বললেন,–বইটা টর্চ জ্বেলে খুঁজতে শুরু করলুম। তারপর দেখি, ওটা কুলুঙ্গিতে চড়ে বসে আছে। এবার খুবই ভয় পেলুম। ভয়ে-ভয়ে বইটা মোমের আলোয় যেই খুলেছি, জানলা দিয়ে একটা ইয়া মোটা গুবরে পোকা এসে মোমবাতিটা উল্টে ফেলে দিল।
কর্নেল বললেন,–দেখি আপনার বইটা।
ভক্তিবাবু বইটা বের করে তার হাতে দিলেন। দেখলুম, আসল মলাটটা কবে ছিঁড়ে গেছে। লেখকের নাম বা টাইটেল পেজও নেই। বইবিক্রেতা হলদে রঙের মোটা কাগজে মলাট করে বইটাকে লাল সুতো দিয়ে সেলাই করেছে। সেই মলাটে লাল কালিতে লেখা আছে ‘প্রেতাত্মার অভিশাপ।
কর্নেল বইটা খুলে দেখে বললেন,–বইটার নাম দেখছি ভেতরে কোথাও ছাপা নেই।
ভক্তিবাবু বললেন,–আজ্ঞে হ্যাঁ। যে লোকটা পুরনো বই বেচছিল, তাকে জিগ্যেস করেছিলুম। সে বলেছিল, বইটার যা নাম ছিল, তাই-ই সে লিখেছে। তবে লেখকের নামের পাতা ছিল না বলে লেখকের নাম সে লিখতে পারেনি।
কর্নেল বললেন,–খুব পুরোনো বই দেখছি। পোকায় ইচ্ছে মতো কেটেছে। কোনও এক রাজা মহেন্দ্রনারায়ণ রায়ের জীবনকাহিনি। যাই হোক, আর কী ঘটেছে বলুন!
ভক্তিবাবু বললেন,–সেইদিন থেকে বইটা লুকোচুরি খেলেছে। ধরুন, বিছানায় রেখে বাথরুমে গেছি। ফিরে এসে দেখি, বইটা টেবিলের তলায় পড়ে আছে। সব চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, যখনই পড়ব বলে খুলেছি, অমনি বাধা পড়েছে। কেউ এসে ডেকেছে। নয়তো আরশোলা উড়ে এসে চোখে বসেছে। কিংবা আচমকা ঝরঝর চুনবালি খসে পড়েছে।
–আর কিছু?
হ্যাঁ। সেটাই সবচেয়ে সাংঘাতিক।–ভক্তিবাবুর মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল, রাত্তিরে অদ্ভুত শব্দ হয় ঘরের ভেতর। কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। ছাদের ওপর ধুপধুপ শব্দ শুনি। কখনও জানালার কাছে ছায়ামূর্তি এক সেকেন্ডের জন্য দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়।
আমি বললুম,–কিন্তু এখন তো কর্নেল বইটা খুলে পড়ছেন। কিছু হচ্ছে না!
আমি কথাটা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই কর্নেলের টাকে একটা মোটা কালো পোকা চটাস শব্দে পড়ল। কর্নেল খপ করে পোকাটাকে ধরে ফেলে বললেন,–গুবরে পোকা মনে হচ্ছে!
ভক্তিবাবু উঠে দাঁড়ালেন। পাংশু মুখে বললেন, স্যার! এর একটা বিহিত করুন। বাড়ি ফিরতে আমার ভয় করছে। আমার নাম-ঠিকানা এই কাগজে লিখেই এনেছি। দয়া করে রেখে দিন।
বলে তিনি একটুকরো কাগজ কর্নেলের হাতে খুঁজে দিয়ে চলে গেলেন।
