ওঁর পাটিগণিতের হিসেব শুনতে-শুনতে হেসে ফেললুম,–এই যথেষ্ট! বুঝে গেছি।
কর্নেল আস্তে বললেন, তুমি তেলেভাজা খেতে ভালোবাসো, এটাও আমার জানা।
বললুম,–ওহ! আপনার হাড়ে-হাড়ে এইসব হিসেবি বুদ্ধি কর্নেল!
ডার্লিং! আমাদের অবচেতন মনই সচেতন মনকে চালনা করে। সম্ভবত অফিস থেকে বেরুনোর পর তোমার অবচেতন মন এই সুন্দর সন্ধ্যায় আমার ডেরার কথা ভেবেছিল। শীতের বৃষ্টি, কফি এবং প্রত্যাশা-যদি দৈবাৎ দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য একটা রোমাঞ্চকর স্টোরি পেয়ে যাও!-কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন, হ্যাঁ। স্টোরির একটুখানি লেজ তুমি আগাম দেখে নিতেও পারো সেটা রোমাঞ্চকরও বটে!
বলে কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ইনল্যান্ড লেটার বের করে আমাকে দিলেন। ভাঁজ খুলে চিঠিটা পড়তে শুরু করলুম।
শ্ৰীযুক্ত কর্নেল নীলাদ্রি সরকার মহোদয় সমীপেষু—
মহাশয়,
বড় বিপদে পড়িয়া আপনাকে গোপনে এই পত্র লিখিতেছি। আপনি অনুগ্রহপূর্বক সত্বর আসিয়া আমাকে রক্ষা করুন। সাক্ষাতে পূর্ণ বিবরণ পাইবেন। অত্র পত্রে সংক্ষেপে শুধু জানাইতেছি যে, তিনমাস পূর্বে বিশেষ কার্যোপলক্ষে কলিকাতায় গিয়া ফুটপাতে প্রেতাত্মার অভিশাপ’ নামে একটি ক্ষুদ্র পুস্তক দুই টাকা মূল্যে ক্রয় করিয়াছিলাম। বাড়ি ফিরিয়া পুস্তকখানি পড়িবার অবকাশ পাই নাই। সিঁড়ি হইতে পড়িয়া বাম হাঁটু ভাঙিয়া গিয়াছিল। প্রায় একমাস শয্যাশায়ী ছিলাম। তার মধ্যে প্রতি রাত্রে ভৌতিক উৎপাত। বহুপ্রকার অদ্ভুত শব্দ শুনিতে পাই। পাশের ঘরে কাহারা ফিসফিস করিয়া কাথাবার্তা বলে। ভূতের ওঝা, ব্রাহ্মণ দ্বারা শান্তি স্বস্ত্যয়ন, পাহারার ব্যবস্থা সকলই করিয়াছি। কিন্তু কোনও ফল হয় নাই। গতকল্য সন্ধ্যায় লাঠি ধরিয়া গঙ্গাতীরে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। হঠাৎ অদৃশ্য হস্তে কেহ আমাকে সজোরে চাটি মারিল এবং আবার আছাড় খাইয়া শয্যাশায়ী হইয়াছি। এদিকে সেই পুস্তকটিও অদ্ভুত আচরণ করিতেছে। সাক্ষাতে সকলই বলিব। শীঘ্র মদীয় ভবনে পদার্পণ করিতে আজ্ঞা হয়। নমস্কারান্তে ইতি–
শ্রী অক্ষয়কুমার সাঁতরা
সাকিন–হ্যাটছড়ি পোঃ অঃ বড়হাটছড়ি
জেলা-নদীয়া।
চিঠি পড়া শেষ হতে-হতে ষষ্ঠীচরণ এসে গিয়েছিল। ভেজা ছাতি সাবধানে মুড়ে সে একগাল হেসে বলল,–বাহ। এই দাদাবাবু এসে পড়েছেন। বাবামশাই বললেন, তোর দাদাবাবুর জন্যে গরম-গরম তেলেভাজা নিয়ে আয়।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–প্লেটে করে নিয়ে আয়। আর তার পেছন-পেছন পটভর্তি কফি যেন আসে।
ষষ্ঠী পর্দা তুলে ভেতরে চলে গেল। চিঠিটা কর্নেল আমার হাত থেকে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন। বললুম,–গ্রাম্য মানুষ। তবে মোটামুটি ভালোই লিখতে পারেন। বয়স্ক বলে মনে হচ্ছে। কুসংস্কার! বইটার নাম প্রেতাত্মার অভিশাপ। তাই হয়তো আপনি একটু আগে অবচেতন মনের কথা বলছিলেন, ভদ্রলোক অবচেতন মনে
আমাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন,–বইটার অদ্ভুত আচরণের কথা লিখেছেন অক্ষয়বাবু! সেটাই কিন্তু ওঁর চিঠির একটা বড় পয়েন্ট।
একটু হেসে বললুম,হাটছড়ি! গ্রামের নামটাও বেশ অদ্ভুত। তো আপনি সেখানে পদার্পণ করবেন নাকি?
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে আবার বললেন,–বইটার অদ্ভুত আচরণ!
–কিন্তু গ্রামটা কোথায় এবং কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়, তা তো লেখেননি ভদ্রলোক!
পোস্টঅফিস বড়হাটছড়ি। তার মানে পাশাপশি দুটো গ্রাম।-কর্নেল এইরকম অন্যমনস্কতায় বললেন, গঙ্গার তীরে এক জোড়া জনপদ। ছোট এবং বড়। হঁপোস্টঅফিসে খোঁজখবর নিলে হদিস মিলতে পারে। বিশেষ করে জি.পি.ও-তে। ওখানে আমার চেনাজানা এক অফিসার আছেন। বিনোদবিহারী ঘড়াই। এক মিনিট। দেখি, ওঁর বাড়ির ফোন নাম্বার খুঁজে পাই নাকি।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে একটা মোটা ডায়রি টেনে নিলেন টেবিল থেকে। এই সময় ষষ্ঠী একটা প্লেটে তেলেভাজা রেখে গেল। কর্নেলের দৃষ্টি ডায়রির পাতায়। কিন্তু দিব্যি হাত বাড়িয়ে একখানা বিশাল বেগুনি তুলে নিলেন। অবাক লাগল। উনি নিজে তেলেভাজা পছন্দ করেন না। আজকাল নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে বড় সতর্ক। এখন দেখি, সাদা গোঁফ দাড়ি বেগুনির পোড়া তেলে ভিজে যাচ্ছে। তবু ভ্রূক্ষেপ নেই।
কিছুক্ষণ পরে বললেন,–হা। পাওয়া গেছে। তবে একটু পরে ফোন করব। কাল অফিসে গিয়ে উনি আমাকে জানিয়ে দিতে পারবেন আশা করি।
বললুম, আপনি তেলেভাজা খাচ্ছেন দেখছি!
কর্নেল সে-কথায় কান দিলেন না। বললেন,–ঠিকানা খুঁজে বের করার একমাত্র নির্ভুল পদ্ধতি পোস্ট অফিসের শরণাপন্ন হওয়া। ধরো, কলকাতারই কোনও গলিরাস্তার একটা নম্বর খুঁজছ। কিন্তু পাচ্ছ না। বিশেষ করে কলকাতার মতো পুরনো শহরে কোনও ঠিকানা জানা সত্ত্বেও খুঁজে বের করা শক্ত। তখন পোস্টম্যানের সাহায্য নাও। পেয়ে যাবে।
তেলেভাজা শেষ হতে-হতে কফি এসে গেল। সেইসময় উঁকি মেরে বৃষ্টির অবস্থা দেখে এলুম জানালায়। সেইরকম ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর নেই। ছিটেফোঁটা ঝরছে। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,–হাটছড়ি গ্রামে তাহলে
কর্নেল ঝটপট বললেন,–অবশ্যই। বইটার অদ্ভুত আচরণ যা-ই হোক, গ্রামটা গঙ্গার তীরে। কাজেই আশা করছি ওই এলাকায় গঙ্গার অববাহিকায় জলা বা বিল থাকতে বাধ্য। বিল থাকলে এই শীতের মরশুমে নানা প্রজাতির বিদেশি পাখিরও দেখা পেয়ে যাব।
