কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–বলুন হালদারমশাই।
–মধুরবাবু মিথ্যা একখান গল্প কইয়া আপনার কাছে গিসল ক্যান? সে তত ওই রত্নগুলি হাতাইয়া বাকি সব জিনিস নষ্ট কইরা ফেলতে পারত। কিন্তু তা না কইরা সে আপনার কাছে গেল ক্যান?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জগদীশপ্রসাদের ভয়ে।
–এবার কন যখন সে বারিনবাবুর কাছে গিয়াসিল তখনই কি জগদীশবাবু বারিনবাবুকে খুন করেন?
–হ্যাঁ।
–তা হলে বারিনবাবু জগদীশবাবুর চুল না ধইরা মধুরবাবুর চুল ধরলেন ক্যান?
–দৃশ্যটা আমি মনে-মনে সাজিয়েছি। শুক্রবার রাত্রে তিন স্যাঙাতে মিলে মধুরবাবুর চুরি করা রত্ন নিয়ে আলোচনা করছিল। ধরা যাক, তিনজনেই ঠিক করে রত্নগুলো যদুগড়ে গিয়ে রামদয়ালের কাছে বিক্রির প্রস্তাব করা হবে। কারণ, তিনজনই রামদয়ালকে চেনে। জগদীশবাবুও যে চিনত, তা তো আমরা এখন জানি। এখানে এসে তার বাড়িতেই জগদীশবাবু ঢুকেছিল।
যাইহোক, এবার সেই দৃশ্যের কথায় আসি, কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর মধুরবাবু উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময়েই জগদীশবাবু মধুরবাবুর চক্রান্ত অনুসারে আচমকা এগিয়ে এসে বারিন সিনহার কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি করেন। আচমকা আক্রান্ত হওয়ার মুখে মানুষ সহজাত বোধে যা করে, বারিনবাবু ঠিক তাই করেছিল। হাত বাড়িয়ে জগদীশবাবুর চুল ধরতে গিয়ে মধুরবাবুর মাথাটা হাতের কাছে পেয়েছিল। তাই সে মধুরবাবুরই একগোছা চুল ছিঁড়ে নেয়।
আমি জিগ্যেস করলুম,–আপনি তা হলে একেবারে প্রথম থেকেই মধুরবাবুকে সন্দেহ করেছিলেন।
–সে তো আগেই বলেছি। মধুরবাবুর মাথার চুলছাঁটা দেখে আমার অবাক লেগেছিল। যখন অবাক লেগেছিল। তখন অবশ্য তার প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মধুরবাবু যখন বলল,–বারিন নামে তার এক বন্ধু খুন হয়েছে, সে নাকি ব্রিফকেস দিয়েছিল–তার হাতের মুঠোয় একগোছ কাঁচাপাকা চুল আছে। জয়ন্ত, খুনি যত ধূর্তই হোক এইভাবেই একটা বেঁফাস কথা বলে ফেলে কিংবা তার ধরা পড়ার কোনও সূত্র নিজের অজান্তে রেখে যায়। একটু চিন্তা করো জয়ন্ত, ভিকটিমের হাতের মুঠোয় কাঁচাপাকা চুল থাকার কথাটা বলে মধুকৃষ্ণ কি বোকামি করেনি? আসলে সে বারিনবাবুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলেছিল।
হালদারমশাই ততক্ষণে কফি শেষ করেছেন। একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন,–আমরা কি আইজ যদুগড়ে থাকব? কর্নেল সহাস্যে বললেন,–নিশ্চয়ই থাকব। আর এই সুযোগে আপনাকে আর জয়ন্তকে রাজবাড়ির বিস্ময়কর পাতাল-জাদুঘর দেখাব।
৩.০৯ প্রেতাত্মা ও ভালুক রহস্য
এক
সেবার ডিসেম্বরের মাঝামাঝিও কলকাতায় শীতের তত সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ এক বিকেলে আকাশ ধূসর করে এসে গেল ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর সেই সঙ্গে এলোমেলো বাতাস। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিস থেকে বেরিয়ে কনকনে ঠান্ডা হিমশীতের পাল্লায় পড়ে গেলুম। পাঁচটায় সন্ধ্যা নেমে গেছে। চৌরঙ্গি রোড ধরে এগিয়ে গিয়ে দেখি, সামনে যানজট। অগত্যা বাঁ-দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে লিন্ডসে স্ট্রিট হয়ে ফিস্কুল স্ট্রিটে পৌঁছে দেখি, সেখানেও সামনে জ্যাম। তখন আবার বাঁ-দিকের গলি হয়ে ইলিয়ট রোডের মুখে চলে গেলুম। তারপরই কথাটা মাথায় এসে গেল।
এই বৃষ্টিঝরা শীতের সন্ধ্যায় ইলিয়ট রোডে আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ডেরায় কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে গেলে মন্দ হয় না! ষষ্ঠীচরণের তৈরি গরম কফি খেতে-খেতে এবং কর্নেলের সঙ্গে গল্প করতে-করতে ততক্ষণে যানজট ছেড়ে যাবে। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস হয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে ফিরতে বেশি সময় লাগবে না।
‘সানি ভিলা’-র গেটে গাড়ি ঢুকিয়ে পোর্টিকোর কাছাকাছি পার্ক করলুম। শুধু একটাই চিন্তা। বৃষ্টিটা বেড়ে গেলে ইলিয়ট রোডে জল জমবে।
কিন্তু এখন আর তা নিয়ে চিন্তার মানে হয় না। তিনতলায় উঠে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ডোরবেলের সুইচ টিপলুম। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে গেল এবং কর্নেল সহাস্যে বললেন, এসো জয়ন্ত! তোমার জন্য একটু আগে ষষ্ঠীকে তেলেভাজা আনতে পাঠিয়েছি।
ওঁর জাদুঘরসদৃশ্য ড্রয়িংরুমে ঢুকে বললুম,আমি আসব তা কি আপনি ধ্যানবলে জানতে পেরেছিলেন?
কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে বললেন,–অঙ্ক কষে জয়ন্ত! স্রেফ অঙ্ক!
–জ্যোতিষীদের অঙ্ক?
প্রকৃতিবিজ্ঞানী মিটিমিটি হেসে বললেন,–উঁহু। স্রেফ পাটিগণিত।
একটু অবাক হয়ে বললুম,–পাটিগণিতের অঙ্ক কষে আপনি আজকাল জানতে পারেন কে আসবে?
অন্য কারও কথা নয় জয়ন্ত, তোমার আমার কথা। কর্নেল তার টাক এবং সাদা দাড়িতে অভ্যাসমতো হাত বুলিয়ে বললেন, অঙ্কটা সোজা। আজ সোমবার, তোমার দশটা-পাঁচটা ডিউটি। তুমি অফিস থেকে বেরিয়ে চৌরঙ্গি হয়ে পার্ক স্ট্রিট দিয়ে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে সল্টলেকে যাবে। একদিকে আজ সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট দিল্লি থেকে কলকাতা এসে রাজভবনে রাত কাটাবেন। তাই এয়ারপোর্ট থেকে বাইপাস ধরে পার্ক স্ট্রিট এবং রাজভবন পর্যন্ত তাঁর গমনপথ। ট্রাফিকপুলিশ পরিষ্কার রেখেছে। নিরাপত্তারক্ষীরা প্রত্যেকটি মোড়ে টহল দিচ্ছে। যাই হোক, এই অবস্থায় তোমার অলি-গলি শর্টকাট করে এই রাস্তায় এসে পড়াটা অনিবার্য এবং এসে পড়লে এই বৃদ্ধের কথা, বিশেষ করে বৃষ্টিঝরা শীতের সন্ধ্যায় ষষ্ঠীচরণের তৈরি দুর্লভ স্বাদের কফির কথা তোমার মনে আসাটা অনিবার্য।
