কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার মতো ধূর্ত মানুষ আমি এ যাবৎ কাল দেখিনি। আমাকে একটা অদ্ভুত গল্প বলে আপনি যে নাটকের সূত্রপাত করেছিলেন, তা কোথায় পৌঁছুবে আমি জানতে পেরেছিলুম বারিনবাবুর হাতে মুঠোয় কঁচাপাকা একগোছা চুল থাকার কথা শুনে।
হালদারমশাই বলে উঠলেন,–অ্যাঁ, কী কইলেন? কঁচাপাকা চুল?
–হ্যাঁ, হালদারমশাই। মধুরবাবুর মাথা লক্ষ করে দেখুন। উনি যেদিন আমার কাছে যান, সেদিন আমার চোখ পড়েছিল, ওঁর মাথার সদ্য ছাঁটা ছোট-ছোট চুলে। আপনারা জানেন মধুরবাবু খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। তাঁকে কুমারবাহাদুর ঠাট্টা করে বাবুর বাবু’ বলতেন। তাছাড়া আমিও ওঁকে যখন প্রথম দেখেছিলুম, তখন ওঁর মাথায় ছিল, টেরিকাটা ঝাঁকড়া চুল।
মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–কলকাতার এই জগদীশবাবুর ব্রিফকেস থেকে আমরা একটা রিভলভার উদ্ধার করেছি। মনে হচ্ছে সেটাই মার্ডার উইপন। লালবাজার থেকে আমাকে বারিন সিনহা নামে এক ভদ্রলোকের শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের কেস হিস্ট্রি রেডিও মেসেজে পাঠানো হয়েছে।
কর্নেল বললেন,–লালবাজারের ডিটেকটিভরা সদলবলে দুপুরের মধ্যেই এসে পড়বেন। তাদের হাতে এই তিনজনকেই আপনারা হয়তো তুলে দেবেন।
–দেব। কিন্তু এই কয়েক লাখ টাকার তিনটে রত্নখচিত সোনার মুকুট কোথায় এবং কে দেখতে পেয়ে চুরি করেছিল?
–আপাতত সংক্ষেপে বলি। এই মধুর মুখুজ্যে ছিল এখানকার রাজবাড়ির কেয়ারটেকার। তার বাবাও ছিলেন রাজ এসটেটের ম্যানেজার। পুরুষানুক্রমে এ বাড়িতে থাকার দরুন মধুরবাবু জানতে পেরেছিল কুমারবাহাদুরের পূর্বপুরুষদের তিনটি বাঁধানো ছবির পিছন দিকে সাবধানে এই তিনটি রত্নখচিত মুকুট লুকোনো ছিল। মধুরকৃষ্ণ রাজবাড়ি থেকে সেগুলো হাতিয়ে এই জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলেছিল এবং ছবির পেছনে নতুন করে কাগজ এঁটে দিয়েছিল। তাই প্রথম দিনই ওর কাটা চুল এবং এই নতুন করে আঁটা কাগজ আমার মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। এরপর মধুরকৃষ্ণ প্রথমে বারিনের সঙ্গে তারপর জগদীশপ্রসাদের সঙ্গে এগুলো নিয়ে দরাদরি শুরু করে। এ অবশ্য আমার অনুমান।
তারপর জগদীশ আর মধুরকৃষ্ণ দুজনে কেন বারিন সিনহাকে খুন করল তাও আমার কাছে স্পষ্ট। এই মুকুটগুলোর দাম বাজার দরে এত বেশি টাকা, যে বারিনের পক্ষে তা কেনা সম্ভব ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা বারিন বেঁচে থাকলে তাকেও সমান বখরা দিতে হবে। অতএব তাকে শেষ করে ফেলাই উচিত।
এরপর মধুরকৃষ্ণ খুব ভয় পেয়েছিল। কারণ জগদীশপ্রসাদ এরপর তাকেও হয়তো মেরে ফেলবে। তাই নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে সে একটা ব্রিফকেসে শুধু ছবিগুলো আর দু-একটা জিনিস ভরে আমার কাছে নিয়ে গিয়ে একটা গপ্পো ফেঁদে আসলে আমার কাছে আশ্রয়ই চেয়েছিল। সে জানে আমি তার গল্পটা শোনার পর তাকে আশ্রয় দেব। যাইহোক, সে রত্নগুলো নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে আমার কথা মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার হালদারের সঙ্গে যদুগড়ে এসেছিল। এটা কিন্তু আমারই একটা চাল। শেষ পর্যন্ত সে এখানে এসে সাধু সেজে রাজবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে নিশ্চয়ই কোটিপতি স্মাগলার এই রামদয়ালের কাছে রত্ন বেচতে চাইবে। এটা আমি অনুমান করেছিলুম।
মিস্টার পাণ্ডে জগদীশ প্রসাদকে দেখিয়ে বললেন,–কিন্তু এই ভদ্রলোক কীভাবে জানলেন যে মধুরবাবু এখানে এসে রামদয়ালের দ্বারস্থ হবে?
কর্নেল বললেন, আমার অনুমান জগদীশ প্রসাদের হাত থেকে বাঁচতে মধুরকৃষ্ণ অনেক ভেবে তাকেও বখরা দিতে চেয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, এদের তিনজনের মধ্যেই একটা যোগাযোগ হয়ে যায়, এবং ঠিক সময়ে জগদীশ তার বখরা নিতে এখানে এসে পড়ে। আজকাল টেলিফোনের উন্নতির যুগে পরস্পর যে যেখানেই থাকুক যোগাযোগ করা কঠিন কিছু নয়।
মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–সবকথা আমি এই তিন বেটাচ্ছেলের মুখ থেকে বের করে নেব। আমার নাম জয়রাম পাণ্ডে! আমি যে কী, তা অন্তত এই রামদয়াল অগ্রবাল ইতিমধ্যেই ভালোই জেনে গেছে।
কর্নেল বললেন,–তা হলে আপনার বমাল আসামিদের নিয়ে থানায় চলে যান। লালবাজারের লোকেরা এসে পড়লেই আইনত যে ব্যবস্থা করা উচিত তা করবেন।
এই বলে কর্নেল সবে ঘুরেছেন, হালদারমশাই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কয়েক পা বাড়িয়ে মধুরবাবুর মাথায় একটা জায়গায় চুল সরিয়ে দেখালেন। তারপর বললেন,–দ্যাখসেন! বাঁ-কানের পাশে একটুখানি জায়গা লাল হইয়া আসে। এই জায়গাটা কাইল দুপুরে হঠাৎ আমার চোখে পড়সিল। জিগাইলাম ফেঁড়া হইসে নাকি মধুরবাবু? মধুরবাবু সেইখানে হাত বুলাইয়া কইলেন, কী একটা হইসিল। আমি চুলকাইয়া দিসিলাম। কে জানে সেপটিক না হয়!
বলে হালদারমশাই খি-খি করে হাসতে-হাসতে কর্নেলকে অনুসরণ করলেন।
* * * *
আমরা তিনজনে ‘মাতাজি ধাম’ থেকে বেরিয়ে যে বাংলোয় কর্নেল এবং আমি উঠেছি, সেখানে গেলুন। কর্নেল চৌকিদারকে বললেন,–একজন গেস্ট আছে। কোনও অসুবিধে হবে না তো?
চৌকিদার বলল,–কোনও অসুবিধে হবে না স্যার, শুধু হুকুম করুন, কখন আপনারা লাঞ্চ খাবেন।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–ঠিক একটায় আমরা খেয়ে নেব। তবে আপাতত তুমি আমাদের তিন পেয়ালা কফি এনে দাও।
কিছুক্ষণ পরে চৌকিদার কফি দিয়ে গেল। কফি খেতে-খেতে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একটা কথা বুঝতে পারতাসি না কর্নেলস্যার।… হঃ, আপনি কথাটা তখন মিস্টার পাণ্ডেরে কইসিলেন বটে, কিন্তু আমি বুঝি নাই।
