কুমারবাহাদুর একটা ছবি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন,–ফ্রেম তো তেমনি আছে।
–কিন্তু পিছনের দিকটা দেখে কি আপনার খটকা লাগছে না?
এবার কুমারবাহাদুর বলে উঠলেন,–কী আশ্চর্য! পিছনের দিকটাই নতুন করে কাগজ সাঁটা হয়েছে। ছবিগুলো কি কেউ খুলেছিল?
কর্নেল বললেন,–আমিই খুলেছিলাম। কারণ বহু বছর আগের বাঁধানো ছবির পিছন দিকটা দেখে সন্দেহ হয়েছিল, পিছনগুলো কেউ খুলেছে।
এবার কুমারবাহাদুর উত্তেজিতভাবে বললেন,–ছবি ভোলার কারণ কী?
–কারণ ছবিচোর জানত এই তিনটে ছবির ভেতরই বহুমূল্য রত্ন লুকনো আছে। আমি দেখাচ্ছি। ভেতরে এই দেখুন দুটো করে পুরোনো পিসবোর্ড আছে। আতস কাঁচে দেখেছি দুটো পিসবোর্ডের মধ্যে আবছা নকশা কাটা কোনও জিনিসের ছাপ পড়েছে।
কুমারবাহাদুর চমকে উঠে বললেন,–তা হলে এর ভেতর মূল্যবান রত্ন লুকোনো ছিল।
–ছিল। সেগুলো ছবিচোর হাতিয়ে নিয়ে নতুন করে পিছনে কাগজ এঁটে রেখেছিল। ব্রোঞ্জ, সিল আর নকশা নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তিনখানা বহুমূল্য নকশাদার হালকা পাতের অলঙ্কার পেয়েই সে খুশি হয়েছিল। যাইহোক, আর কোনও কথা নয়, আমি একবার টেলিফোন করব।
কুমারবাহাদুর টেলিফোন দেখিয়ে দিতেই কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–হালদারমশাই কী খবর বলুন।… কতক্ষণ আগে?…এইমাত্র? ঠিক আছে। আপনি এসে বাড়িটার কাছাকাছি কোনও জায়গায় দাঁড়ান। যেখান থেকে ও বাড়ির কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না।
কর্নেল আবার ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–মিস্টার পাণ্ডে, আপনারা তৈরি আছেন তো?…তা হলে এখনই বেরিয়ে পড়ুন এবং রামদয়াল অগ্রবালের বাড়ি ‘মাতাজি ধাম’ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলুন। আমি এখনই বেরুচ্ছি।
কুমারবাহাদুর কান ভরে শুনছিলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন, কর্নেলসাহেব, কী ব্যাপার বলতে আপত্তি আছে?
কর্নেল হেসে বললেন, আপাতত আছে। কারণ আমার এই অভিযান সার্থক হবে কি না নিশ্চিত নই। আপনি অপেক্ষা করুন, যথাসময়ে এসে আপনাকে সব বলব।
কর্নেল ঘরের দরজা খুলে বেরুলেন, আমি তাকে অনুসরণ করলুম। সিঁড়ির মাথায় গিয়ে একবার ঘুরে দেখলুম কুমারবাহাদুর দরজার বাইরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমরা গেটের কাছাকাছি পৌঁছেছি এমনসময় পাশের একতলা ঘর থেকে সেই হাফপ্যান্ট পরা লোকটি সেলাম ঠুকে বলল,–এখনই চলে যাচ্ছেন কর্নেলসাব?
কর্নেল বললেন,–মগনলাল, আবার আমরা আসব।
সেই সময়ই নিচের রাস্তায় দুটো পুলিশের জিপ এবং একটা কালো রঙের প্রিজন ভ্যান ঝড়ের বেগে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেল। কর্নেল বললেন,–চলো জয়ন্ত, আমরা এবার শর্টকাটে না গিয়ে সদর রাস্তা দিয়েই হেঁটে যাই।
রাস্তাটা চড়াইয়ের দিকে উঠেছে। মিনিট দশেক হাঁটার পর সমতল রাস্তায় পৌঁছে দেখলুম বাঁ-দিকে মাতাজি ধাম-এর সামনে পুলিশের তিনটে গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে। এবং রাইফেল হাতে নিয়ে পুলিশবাহিনী বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। একটু তফাতে হালদার মশাই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখেই হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। তারপর চাপাস্বরে কর্নেলকে বললেন, এখনই জাল ফ্যালাইয়া তো দিলেন। কোন মাছটারে ধরবেন বুঝতে পারতাসি না।
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, আপনার কথা শুনেই জাল ফেলেছি। আসুন দেখি কী অবস্থা।
হালদারমশাই কী বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন। একদিকে আমি তো একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। কিছু বোঝার শক্তি যেন হারিয়ে গেছে। আমাদের দেখে সেই এস. আই. মিস্টার শাহেদ খান চাপা হেসে বললেন,–কর্নেলসাহেবের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।
কর্নেল বারান্দায় উঠে শুধু বললেন,–অর্থাৎ আমার টাইমিং সেন্স কাজে লেগে গেছে।
প্রথম ঘরটা বসবার ঘর। সেই ঘরে দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল ছাড়া আর কেউ নেই। শাহেদ খান ভেতরের ঘরের দরজায় পরদা তুলে বললেন, স্যার কর্নেলসাহেবরা এসে গেছেন।
ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর কেউ ডাকলেন,–আসুন কর্নেল সাহেব। কর্নেল তার পিছনে আমি এবং হালদারমশাই ঢুকে দেখি এটা যেন একটা গোডাউন। ঘরের এখানে-ওখানে স্তূপাকৃতি প্রকাণ্ড সব প্যাকেট সাজানো এবং এককোণে জানালার ধারে ছোট্ট সোফাসেটে বসে আছেন জগদীশ প্রসাদ। একজন ভুড়িওয়ালা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এবং আমাদের সুপরিচিত সেই মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেমশাই। সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজ ছড়িয়ে রেখে তার ওপর সূক্ষ্ম নকশাকাটা অর্ধবৃত্তাকার মুকুটের মতো গড়নের তিনটে জিনিস। প্রত্যেকটিতে নানারঙের রত্নখচিত আছে। তার ওপর আলো পড়ে আমার চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছিল। আরও একটা জিনিস দেখতে পেলুম। টেবিলের একপাশে একটা ব্রিফকেস খুলে রাখা হয়েছে। সেটা নোটে ভর্তি। হালদারমশাই আমার কানে-কানে বললেন,–কী কারবার দ্যাখসেন?
কর্নেল সোফার কাছে গিয়ে বললেন, মিস্টার পাণ্ডে, একেবারে ঠিক সময়েই এসে পড়েছিলেন দেখছি।
দৈত্যাকৃতি মিস্টার পাণ্ডের ডান হাতে রিভলভার ছিল। উনি সেটা বাঁ-হাতে নিয়ে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর বললেন,–দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়নি। কারণ এই তিন ঘুঘু বেটাচ্ছেলে ভেবেছিল বাইরের ঘরের দরজা খোলা রাখলে সন্দেহ হবে না যে ভেতরে ঘরে কিছু হচ্ছে।
মিস্টার পাণ্ডে ছাড়া ঘরে সশস্ত্র দুজন পুলিশ অফিসার হাতে রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশও দেখতে পেলুম। বুঝলুম তারা স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক। তারপরই দেখলুম মধুরবাবু হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠেছেন। তিনি কাঁদতে-কাঁদতে বললেন,–আমি কিছু জানি না কর্নেলসাহেব। রাজবাড়িতে আমার জায়গা হবে না দেখে আমি রামদয়ালজির কাছে একটা চাকরির আশায় এসেছিলুম।
