জিগ্যেস করলুম,–এখনই কি বেরুচ্ছেন?
-হ্যাঁ, রেডি হয়ে নাও। আমরা পায়ে হেঁটেই যাব। রাজবাড়ি শর্টকাটে যাওয়া যায়। বলে তিনি তার সেই পেটমোটা ব্যাগ খুলে যা বের করলেন তা দেখে আমার অবাক হওয়ার কারণ ছিল না। বারিনবাবুর ব্রিফকেসে পাওয়া সেই তিনটে ছবি তিনি সেই তোয়ালেতেই জড়িয়ে বাঁধলেন। তারপর সেটা বগলদাবা করে বললেন,–চলো, বেরুনো যাক, হালদারমশাইয়ের ফোন যখন পেলুম না, তখন বোঝা যাচ্ছে তিনি মাতাজি ধামের কাছে মধুরবাবুকে দেখতে পাননি। এমনও হতে পারে রাজবাড়িতে গিয়েই আমরা হালদারমশাইয়ের দর্শন পাব।
বাংলোর পাশ কাটিয়ে একটা সংকীর্ণ পায়ে চলা পথে কর্নেল হাঁটছিলেন। পথের দু-ধারে ঘন ঝোঁপ। আমরা যাচ্ছি উত্তর দিকে। বাঁ-দিকে একটু দূরে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ো। তারপর পথের দু-ধারের ঘন গাছপালা আর কিছু দেখতে দিল না।
মিনিট দশেক হাঁটার পর কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। আস্তে বললেন, আমরা রাজবাড়ির কাছে এসে পড়েছি। এবার তোমাকে কষ্ট করে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে আমার সঙ্গে আসতে হবে।
একটু পরে চোখে পড়ল উঁচু একটা বাউন্ডারি ওয়াল। জায়গায়-জায়গায় ফাটল ধরেছে, ইটও বেরিয়ে আছে। সেই পাঁচিলের সমান্তরালে পশ্চিম দিকে কিছুটা চলার পর খোলামেলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কুমারবাহাদুরকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। তাছাড়া সদর রাস্তায় বগলে এই বোঁচকাটা রাখা নিরাপদ মনে করিনি। চমকে উঠে জিগ্যেস করলুম,–নিরাপদ মনে করেননি? কেন?
–ভুলে যেও না, জয়ন্ত, এই ভোয়ালেটা এবং তার ভেতরের জিনিস এখানে কারও চেনা হতেই পারে।
আরও অবাক হয়ে বললুম,–এটা মধুরবাবু ছাড়া আর কে চিনবেন?
কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। আবার উত্তরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাউন্ডারি ওয়ালের শেষে একটা গেটের সামনে পৌঁছুলাম। গেটের কাছে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরা একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। কর্নেলকে দেখা মাত্র সে সেলাম ঠুকে বলে উঠল,–কর্নেলসাব! আপনি যে আসবেন তার খবর তো দেননি? খবর দিলে আপনাকে কষ্ট করে পায়ে হেঁটে আসতে হতো না।
কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর আছেন?
–হ্যাঁ, কর্নেলসাব। আপনারা আসুন, আমি ওনাকে খবর দিচ্ছি।’ বিহার অঞ্চলে রাজা-জমিদারদের রাজবাড়ি কর্নেলের সঙ্গগুণে অনেক দেখেছি। তবে এই রাজবাড়ি বেশ পরিচ্ছন্ন এবং দেশি-বিদেশি ফুল এবং গুল্মে সাজানো। আমরা এগিয়ে কিছুটা গেছি, এমনসময় কর্নেলের মতোই বৃদ্ধ এবং প্রকাণ্ড চেহারার পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়ি বারান্দার ছাদে আবির্ভূত হলেন। তিনি বললেন,–কী আশ্চর্য, আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
কর্নেল বললেন,–না, হঠাৎ-ই আমাকে চলে আসতে হল। হাতে সময় কম, আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেই বেরুতে হবে।
গেটে দেখা সেই লোকটি আমাদের হলঘরের ভেতর দিয়ে দোতলায় নিয়ে গেল। চওড়া বারান্দায় কয়েকটা বেতের চেয়ার এবং টেবিল ছিল। সেখানে আমরা বসলুম। কুমারবাহাদুর বললেন, আপনার সঙ্গী এই যুবকটিকে দেখে আমার ধারণা ইনিই সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি।
এরপর কর্নেল বগলদাবার তোয়ালে জড়ানো ছবিগুলো টেবিলে রেখে বললেন, দেখুন তো, এগুলো চিনতে পারেন কিনা?
তোয়ালে খুলে ছবিগুলো দেখামাত্র কুমারবাহাদুর কর্নেলের হাত চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। আমি তো হতবাক।
কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর, আমার হাতে সময় কম। এই ছবিগুলো আমি কীভাবে উদ্ধার করেছি যথাসময়ে জানতে পারবেন। এবার আর দুটো হারানো জিনিস আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
বলে উনি জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে সেই প্রাচীন বৌদ্ধ সিলটা এবং ভাজকরা ম্যাপটা তার হাতে তুলে দিলেন। কুমারবাহাদুর সিল এবং ম্যাপটা দু-হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বললেন,–সত্যিই আমি স্বপ্ন দেখছি।
–স্বপ্ন নয়। আপনাদের জাদুঘর থেকে এই ছবি এবং সিল হারানোর কথা আপনার কলকাতার বেয়াইমশাইয়ের কাছে শুনেছি। কিন্তু তার আগেই দৈবাৎ এগুলো আমার হস্তগত হয়েছিল। তাই দেরি না করে আপনার হারানো জিনিস আমি ফেরত দিতে এসেছি।
কুমারবাহাদুর চোখ মুছে বললেন, আমার মেয়ে-জামাই আজ পাটনা গেছে। ওরা ফিরবে কয়েকদিন পরে। ওরা থাকলে খুবই আনন্দ পেত।
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মধুরবাবু ফিরে এসেছেন শুনলুম, কোথায় তিনি?
–কাল পাটনা যাওয়ার আগে জামাই মধুরকে দেখে খুব চটে গিয়েছিল। সে বলে গেছে ওই লোকটাকে যেন আমি আর আশ্রয় না দিই। কিন্তু কী করব বলুন। মধুর এসে আমার হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। তারপর বলল,–জাদুঘরের হারানো জিনিস আমি নাকি শিগগির ফিরে পাব। তাই তো পেলাম দেখছি। আমার অবাক লাগছে।
.
আট
কর্নেল বললেন,–এবার একটা গুরুত্বপুর্ণ গোপন কথা আছে। কিন্তু এখানে নয়, সেটা আপনার ঘরে বলতে চাই।
কুমারবাহাদুর তখনই বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলেন, আমরা তাকে অনুসরণ করলুম। লক্ষ করলুম তার হাতে একটা চাবির গোছা আছে। একটা ঘরের পরদা সরিয়ে তালা খুললেন। তারপর বললেন,–আসুন।
ঘরে ঢুকে কর্নেল বললেন,–দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছি।
তারপর কুমারবাহাদুর এবং আমরা একটা টেবিল ঘিরে বসলুম। কুমারবাহাদুর ছবিগুলো, ব্রোঞ্জের সিল এবং ম্যাপটা টেবিলে রাখলেন। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, আপনি কি ছবিগুলোর ফ্রেম এবং পিছন দিকটা লক্ষ করেছেন?
