চমকে উঠে বললুম,–বলেন কী? আপনি বারিনবাবুর হত্যা রহস্যের শেষ দৃশ্যে পৌঁছে গেছেন, অথচ আমি আপনার পাশে থেকেও কিছু টের পেলুম না?
কর্নেল পিঠের কিটব্যাগ এবং গলায় ঝোলানো ক্যামেরা ও বাইনোকুলার খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর মাথার টুপি খুলে রেখে বললেন,–তীক্ষ দৃষ্টিশক্তি এবং একটু বুদ্ধি থাকলেই চারপাশে কী হচ্ছে টের পাওয়া যায়। না ডার্লিং, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি নেই মোটেই বলছি না, দৃষ্টিশক্তি এবং বুদ্ধি তোমার যথেষ্টই আছে। তবে তুমি তা খরচ করতে বড্ড আলসেমি করো–এই যা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলোর চৌকিদার ট্রেতে কফি আর স্ন্যাকস নিয়ে এল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?
সে সেলাম দিয়ে বলল,–সাব, হামার নাম গয়ানাথ।
–তোমার বাড়ি যদুগড়ে?
–হাঁ সাব।
–তুমি যদুগড়ের রাজবাড়ি কেয়ারটেকার মধুরবাবুকে চেনো?
–জি সাব, ওই বাবুকে হামি চিনতুম। তিনবছর আগে রাজবাড়ি থেকে তাকে কুমারবাহাদুর তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
বলে সে একটু হেসে উঠল,–তাজ্জব বাত সাব, কাল বিকেলে সেই মধুরবাবুকে আবার দেখতে পেলুম। বাজারে এক ব্যবসায়ী আছে। তার টি.ভি., ক্যামেরা, এইসব জিনিসের কারবার। মধুরবাবু তার টেবিলের সামনে বসে চা খাচ্ছিলেন।
–তা হলে মধুরবাবু আবার যদুগড়ে ফিরেছেন?
–আপনি কি তাকে চেনেন সাব?
–হ্যাঁ, চিনি।
–মধুরবাবুর নামে এখানে বদনাম আছে। কেউ তাকে বিশ্বাস করে না।
কথাটা বলেই গয়ানাথ চলে গেল।
কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আমি বাথরুম থেকে আসছি ইতিমধ্যে যদি টেলিফোন বাজে তুমি ধরবে এবং একটু অপেক্ষা করতে বলবে।
বলে তিনি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন। মিনিট দশেক পরে পোশাক বদলে তিনি ফিরে এলেন। বললুম,–কেউ আপনাকে ফোন করেনি।
কর্নেল বললেন,–তা হলে আমি হালদারমশাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করব।
নোটবই খুলে নম্বর দেখে তিনি ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–আমি মিস্টার কে, কে. হালদারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।…কী হালদারমশাই, কেমন বুঝছেন?…হ্যাঁ আমরা এসে গেছি।…ধরমচাঁদ লাখোটিয়ার বাংলোতে উঠেছি। আপনি চলে আসুন।
ততক্ষণে কুয়াশা সরে রোদ ফুটছে। বাংলোর নিচে কিছুটা দূরে এই নদীটা দেখা যাচ্ছে। নদীর ওপারে আগাছার জঙ্গলের ভেতর বড়-বড় কালো পাথর হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ওধারে ঘন শালবন।
মিনিট কুড়ি পরে সাইকেল রিকশায় চেপে গোয়েন্দা প্রবর আবির্ভূত হলেন। কর্নেল বারান্দায় গিয়ে তাঁকে সম্ভাষণ করে ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–একখান আশ্চর্য খবর লইয়া আইসি। আমি বাংলোর বারান্দায় বইয়া চা খাইত্যাসি, সেই সময়ই দেখলাম, কলকাতার সেই জগদীশবাবু একটা গাড়ি থিক্যা নামলেন, তারপর তিনি একটা বাড়ির বারান্দায় উঠলেন। গাড়িখান বাড়িটার পাশের গ্যারেজ ঘরে ঢুকল। কিন্তু আমার চোখ ছিল জগদীশবাবুর দিকে একটু পরে দরজা খুইল্যা এক ভদ্রলোক বারাইলেন। তারপর জগদীশবাবুরে ঘরের ভেতর লইয়া গেলেন। সেই সময়ই বাংলোর চৌকিদার কইল আমার টেলিফোন আছে।
যাইহোক ফোনে আপনার কথা শুইন্যা এখানে আসবার সময়ই বাড়িটা লক্ষ করসি। গেটে ইংরিজিতে লেখা আছে মাতাজি ধাম’। তার নিচে লেখা আছে হরদয়াল অগ্রবাল।
আমি বলে উঠলুম,–সেই হরদয়ালবাবুর বাড়ি? যিনি স্মাগলিং করে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন? কিন্তু এখন তো তিনি বেঁচে নেই, কাজেই হালদারমশাই যাঁকে দেখেছেন, তিনি তার ছেলে রামদয়াল।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–আঃ জয়ন্ত, হালদারমশাইকে কথা বলতে দাও।
বকুনি খেয়ে চুপ করে গেলুম। হালদারমশাই বললেন,–এবার মধুরবাবুর কথা শোনেন, কাইল সন্ধ্যায় উনি আমার কাছে আইসিলেন। তিনি কইলেন, কুমারবাহাদুর জামাই রাজবাড়িতে তার থাকা পছন্দ করসে না। তাই তিনি তার এক বন্ধুর বাড়িতে থাকবেন। তারপর আপনারা এলে তিনি কলকাতায় ফিরে যাবেন। হ্যাঁ, আর একটা কথা। কাইল দুপুরে আদিবাসিরা বুনো আলুর লতা খুঁজতে গিয়ে কী একটা দেবতার মূর্তি উদ্ধার করসে। সেই মূর্তি এখন।
কর্নেল তার কথার ওপরে বললেন,–পুলিশের জিম্মায়।
হালদারমশাই হতভম্ব হয়ে বললেন, আপনি ক্যামনে জানলেন?
কর্নেল বললেন,–পুলিশ সূত্রে জেনেছি। যাইহোক, এবার আপনাকে একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি। আপনি আপনার বাংলো থেকে ‘মাতাজি ধাম’ বাড়িটার দিকে লক্ষ রাখবেন। দৈবাৎ যদি মধুরবাবুকে ওই বাড়িটার কাছে দেখতে পান, অমনি আমাকে টেলিফোনে খবর দেবেন। এক মিনিট, বরং আপনি এখনই রাজবাড়িতে গিয়ে আগে খবর নিন মধুরবাবু নামে কেউ ওখানে আছেন কি না। জিগ্যেস করলে বলবেন, মধুরবাবুর সঙ্গে আপনার চেনাজানা আছে।
হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–যাই গিয়া। তবে একটা কথা কর্নেলস্যার। রাজবাড়িতে যদি মধুরবাবু না থাকেন আমি কি মাতাজি ধামে এসে কারুকে জিগাইমু?
কর্নেল বললেন,–ওঃ না। আপনি শুধু লক্ষ রাখবেন বাড়িটার দিকে।
হালদারমশাই যথারীতি সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেল চৌকিদারকে সাড়ে আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে বলেছিলেন। ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–মর্নিং! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…নমস্কার মিস্টার পাণ্ডে…না-না, একেবারে রাজার হালে আছি। এবার শুনুন, আমি কিছুক্ষণ পরে রাজবাড়িতে কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে যাব। একটা জরুরি কাজের কথা তাই বলে নিই। আমি যেখানে থেকেই হোক আপনাকের রিং করলে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফোর্স নিয়ে পৌঁছোনোর জন্য যেন তৈরি থাকবেন।….হ্যাঁ, মিস্টার খানের কাছে শুনেছি, লালবাজার পার্টি দুপুরের ট্রেনে এসে যাবেন।….হা, ঠিকই বলেছেন। এই কেসটা কলকাতা এবং যদুগড় দুটো জায়গারই কেস। তবে ধড়টা এখানকার, লেজটা কলকাতার। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।
