বললুম,–গিয়ে জিগ্যেস করলেই হয়, তিনি যদুগড় যাচ্ছেন কি না।
কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন,–এই থামের আড়ালে আমরা দাঁড়াই। দেখা যাক উনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না।
প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। আমি জিগ্যেস করলুম,–এই ট্রেনেই কি আমরা যাব?
–হ্যাঁ। তা ছাড়া তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না, আমরা ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। এই কামরাতেই আমরা যাব।
–তা হলে উঠেপড়া যাক।
–এক কাজ করো। তুমি উঠে গিয়ে বারো নম্বর কুপের একটা লোয়ার সিটে বসে পড়ো, আমি একটু পরে যাচ্ছি।
–তার মানে জগদীশবাবু এই ট্রেনেই চাপছেন কি না তা দেখতে চান। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–যা বললুম করো। তুমি ডান দিকে কাত হয়ে সবেগে পা ফেলে দরজায় উঠবে।
তাঁর কথামতো আমি কামরায় উঠে গেলুম। তারপর বারো নম্বর কুপ খুঁজে নিয়ে বাঁ-দিকে নিচের বার্থে জানালার কাছে বসলুম। আমার একটা সুটকেস আর ব্যাগ সিটের তলায় ঢুকিয়ে রাখলুম। তারপর জানলা দিয়ে কর্নেলকে খুঁজলুম। তার পিঠের কিটব্যাগটি যথারীতি আঁটা আছে এবং চেনের ফাঁক দিয়ে প্রজাপতি ধরার জালের লাঠির কিছু অংশ মাথা উঁচিয়ে আছে। ডান হাতে একটা গাবদাগোবদা ব্যাগ। তিনি হুইলার স্টলের দিকেই তাকিয়ে আছেন। মিনিট পাঁচেক পরে তিনি ট্রেনে উঠলেন। তারপর বারো নম্বর কুপে ঢুকে ডান দিকে লোয়ার বার্থে বসলেন। জিগ্যেস করলুম,জগদীশবাবুকে কি এই ট্রেনে উঠতে দেখলেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ভদ্রলোক কোটিপতি। বাড়িতে এবং অফিসে এয়ারকন্ডিশনড ঘরে থাকেন। কাজেই এই ট্রেনেও তিনি এ.সি. কম্পার্টমেন্টে চেপে যাবেন তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
–আচ্ছা কর্নেল, এমন তো হতে পারে উনি এই ট্রেনে দিল্লি যাচ্ছেন।
-হ্যাঁ, তাও যেতে পারেন। তবে যদুগড় স্টেশনে নেমে তুমিও একটু সতর্ক থেকো এবং চোখ খোলা রেখো।
তার মানে আমাদের যেন তিনি দেখতে না পান–এই তো?
কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল ট্রেন ছাড়ার খবর। তারপরই হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা চলতে শুরু করল। সেই সময়েই কি একটা অস্বস্তি এবং আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসল। জগদীশবাবু এই ট্রেনে যাচ্ছেন!
.
সাত
যদুগড় স্টেশনে ট্রেনটা যখন থেমেছিল, তখন ভোর পৌনে ছ’টা বাজে। কর্নেলের পিছনে সাবধানে নেমে বললুম,–জগদীশবাবুকে কি দেখতে পাচ্ছেন?
কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে আমাকে চুপচাপ থাকতে বললেন। মাঝারি স্টেশন কিন্তু ট্রেনটা দিল্লি যাবে বলেই বড্ড ভিড়। প্রায় আধঘণ্টা সামনে টি-স্টলের কাছে দাঁড়িয়ে দুজনে চা খেলুম। চা খেয়ে কর্নেল চুরুট ধরালেন। সেই চুরুট শেষ হওয়ার পর তবে তিনি পা বাড়ালেন। জগদীশবাবুর কথা আর তাকে জিগ্যেস করলুম না।
গেটে গিয়ে দেখলুম কয়েকটা বাস আর অজস্র রিকশা নিচের চত্বর থেকে সামনের রাস্তায় পৌঁছুনোর জন্য যেন যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার অবাক লাগল ঘন কুয়াশা দেখে। কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে আছে। আর শীতের কথা বলার নয়।
জিগ্যেস করলুম,–আমরা কোন বাহনে চেপে যাব? একে-একে সবগুলোই তো চলে গেল।
কর্নেল হাসলেন,–ওই দ্যাখো, একটা জিপ এগিয়ে আসছে।
অবাক হয়ে বললুম,–ওটা তো পুলিশের জিপ মনে হচ্ছে।
কর্নেল কিছু বলার আগেই জিপটা এসে আমাদের কাছাকাছি থেমে গেল। তারপর একজন পুলিশ অফিসার জিপ থেকে নেমে কর্নেলকে সেলাম ঠুকে বললেন,–একটু দেরি হয়ে গেল স্যার।
কর্নেল সহাস্যে বললেন,–মোটেও দেরি হয়নি।
কর্নেল জিপের সামনে উঠলেন এবং পিছনের সিটে ওঠার জন্য আমাকে অনেক কসরত করতে হল। পুলিশ অফিসার জিপে স্টার্ট দিয়ে বললেন, আমি কখনও আপনাকে স্বচক্ষে দেখিনি। আমার সৌভাগ্য যে আপনার সেবা করতে পারছি।
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, আপনার পরিচয়ই তো এখনও দিলেন না।
-স্যার আমার নাম শাহেদ খান। আমার বাংলা বলা শুনে আপনি অবাক হতে পারেন। আসলে আমার বাবা ইউ.পি.-র লোক। আর মা কলকাতার বাঙালি মেয়ে, আমি কলকাতাতেই মানুষ হয়েছিলুম।
কুয়াশায় চারদিক ঢাকা থাকলেও আবছা দেখা যাচ্ছিল উঁচু-নিচু নানা আকারের টিলা-পাহাড়। চড়াই-উতরাই হয়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা একটা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গেলুম। নদীতে তত জল নেই। বালির চড়া আর কালো-কালো পাথর দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে জিপ বাঁয়ে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগিয়ে গেল।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা একটা বাংলোর সামনে পৌঁছুলাম। মিস্টার খান বললেন,–এটা যদুগড়ের এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের গেস্টহাউস বলতে পারেন। এস.পি. সাহেবের মেসেজ। পেয়েই ও.সি. মিস্টার জয়রাম পাণ্ডে এই বাংলোটাই আপনার জন্য ঠিক করেছেন। শুনেছি আপনি প্রকৃতির মধ্যে ঘুরতে ভালোবাসেন। তাই আমার ধারণা আপনার এখানে থাকতে ভালোই লাগবে।
একটা টিলার গায়ে এই একতলা বাংলোতে ঢুকে আমার ভালোই লাগল। বাংলোর চৌকিদার আমাদের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে একটা ঘরে ঢোকাল। কর্নেল তখনও লনে দাঁড়িয়ে মিস্টার খানের সঙ্গে কথাবর্তা বলছিলেন।
তারপর মিস্টার খান জিপ নিয়ে চলে গেলেন এবং কর্নেল এসে বাংলোয় ঢুকলেন। বললুম-কখনও দেখিনি আপনি রহস্যের সমাধানে পুলিশের অতিথি হয়েছেন, আমার মাথায় একটা ধাঁধা ঢুকে গেছে।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, তুমি কি দ্যাখোনি, বরাবরই রহস্যের শেষ দৃশ্যে আমাকে পুলিশের সাহায্য নিতে হয়।
