বলে সে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনসপেক্টর নরেশ ভদ্র এসে কর্নেলকে তুলে নিয়ে গেছে। তাহলে দেখছি রহস্যটা আবার অন্যদিকে মোড় নিল।
কিছুক্ষণ পরে টেলিফোন বেজে উঠল। উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলুম। হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। দুষ্টুমি না করে বললুম-আপনি কোথা থেকে বলছেন।
–জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেল স্যার নেই?
–না বেরিয়েছেন।
–আমি যদুগড় থিক্যা কইত্যাসি। আমি উঠসি সরকারি ডাকবাংলোতে। আর মধুরবাবু আছেন রাজবাড়িতে। একটু আগে মধুরবাবু টেলিফোনে আমারে কইলেন, কুমারবাহাদুর তার ফিরে যাওয়াতে খুশি হয়েছেন। কিন্তু কুমারবাহাদুরের জামাই তাকে যেন থাকতে দিতে চান না। তাই তিনি এক বাল্যবন্ধুর বাড়িতে গিয়া থাকবেন ভাবসেন। আমি তারে কইলাম, অপমান সহ্য কইরা অন্তত আরও একটা দিন থাকেন। আমি কর্নেলস্যারেরে ফোন করত্যাসি, যাতে তিনি শিগগির আইসা পড়েন।
বললুম,–কর্নেল এলেই কথাটা বলছি। আর কোনও জরুরি কথা আছে? যদুগড়ের পশ্চিমে নদীর ধারে আদিবাসিরা বুনো আলুর খোঁজে মাটি খুঁড়ত্যাছিল। সেখানে তারা একটা পাথরের মূর্তি দেখসে। সেই মূর্তি দেখার জন্য সেখানে সারাদিন খুব ভিড়।
–আপনি যাননি দেখতে?
–না। কর্নেল স্যার আইলে ওনারে শিগগির আইতে কইবেন। হালদারমশাই লাইন কেটে দিলেন। আর প্রায় মিনিট পনেরো পরে কর্নেল ফিরে এলেন। তখন তাকে হালদারমশাইয়ের টেলিফোনের কথাটা বললুম। তিনি বললেন,–আজ রাতের ট্রেনেই আমরা যদুগড় যাচ্ছি।
একটু পরে ষষ্ঠী কফি আর স্ন্যাকস দিয়ে গেল ঘরের আলো জ্বেলে দিল। কফি খেতে-খেতে বললুম,–লালবাজারে নরেশবাবু আপনাকে নাকি উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–শ্রীমান ষষ্ঠীচরণের শ্রীমুখের খবর তা বুঝতে পারছি। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ, জয়ন্ত, ষষ্ঠীও ক্রমশ গোয়েন্দা হয়ে উঠছে।
বললুম,–তা হতেই পারে। আপনি বলুন না ব্যাপারটা কী।
কর্নেল বললেন,–ধূর্ত জগদীশ রাও লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে আমার চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল। এবং সবকথা জানিয়েছিল। ভাগ্যিস ফোনটা ধরেছিলেন নরেশবাবু! তিনি ওকে আরও ভয় দেখিয়ে বলেছেন, আমি সত্যিই সি.বি.আই. অফিসার। নিহত বারিনবাবু। সম্পর্কে এখনও কোনও গোপন তথ্য থাকলে যেন পুলিশকে জানিয়ে দেয়।
–কিন্তু আপনাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন নরেশবাবু?
–জগদীশবাবুর কথায় নরেশবাবু জেনে গিয়েছিলেন বারিনের হত্যাকাণ্ডের রহস্যে আমি নাক গলিয়েছি। তাই নরেশবাবু আমার কাছে জানতে এসেছিলেন কথাটা সত্যি কি না। যাইহোক সেই সুযোগে আমি ওঁর কাছে বারিনবাবুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তদন্তের ফলাফল জানতে চেয়েছিলুম। নরেশবাবু সঙ্গে কেস ফাইল আনেননি। তাই ওঁর সঙ্গে লালবাজারে গিয়ে সেই রিপোর্ট দেখে এলুম।
–রিপোর্টে কী দেখলেন, বলতে আপত্তি আছে?
–না। গুলি করা হয়েছিল বারিনবাবুর কপালে আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঠেকিয়ে। গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার থেকে ছোঁড়া। ফরেনসিক রিপোর্টে বারিনবাবুর হাতের মুঠোর কাঁচাপাকা চুলের গোছা পরচুলা নয়। তিনি আততায়ীর মাথার চুল খামচে ধরেছিলেন। খুনির মাথার চুলগুলো ছিল লম্বা। আর একটা ব্যাপার, নরেশবাবুর নিজের মনে হয়েছে খুনির রিভলভারে সাইলেন্সর লাগানো ছিল, তাই কেউ গুলির শব্দ শুনতে পায়নি। যাই হোক, লালবাজারে বসেই তোমার জন্য ট্রেনের ফার্স্টক্লাসের একটা স্লিপার বুক করতে বলেছি। তুমি তো জানো, ইস্টার্ন রেলের সব অফিসারই আমাকে খানিকটা পাত্তা দেন।
এবার কর্নেল কফিতে মন দিলেন। আমি জানি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার হিসেবে কোথাও ট্রেনে বা প্লেনে যেতে কর্নেলের পয়সা খরচ হয় না। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের চোখেও উনি একজন ভি.ভি.আই.পি.।
রাত দশটায় ডিনার সেরে নিয়ে কর্নেলের নির্দেশে তৈরি হয়ে নিলুম। মাঝে-মাঝে কর্নেলের ডেরায় আমাকে কাটাতে হয় বলে আমার কয়েক প্রস্থ পোশাক-আশাক এখানেই থাকে। আর যেহেতু আমি কর্নেলের কনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার রহস্যভেদের কাহিনি ফলাও করে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লিখি, সেইহেতু কর্নেলের কথামতো বাইরে বেরুলেই আমাকে পকেটে লাইসেন্সড রিভলভার এবং কিছু বুলেট রাখতে হয়।
কর্নেল বলেছিলেন, হাওড়া স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন ছাড়বে রাত সাড়ে এগারোটায়। তাই সাড়ে দশটাতেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলুম। ছ’নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাছে যেতেই একজন রেলওয়ে অফিসার কর্নেলকে নমস্কার করে তার হাতে যেটা গুঁজে দিলেন, সেটা আমারই টিকিট। কর্নেল পার্স বের করে টাকা মিটিয়ে দিলেন। তারপর বললেন,–থ্যাঙ্কস রজত। তুমি জয়ন্তকে দেখতে চেয়েছিলে তো, এই সেই জয়ন্ত।
ভদ্রলোক আমাকে নমস্কার করলেন। প্রতি নমস্কার করে আমি কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কারণ অবাক হয়ে দেখলুম কথাটা বলেই তিনি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
কাছে গিয়ে বললুম,–এখনও তো গাড়ি ছাড়ার সময় হয়নি। আপনি হঠাৎ ঘোড়দৌড় শুরু করলেন কেন?
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মহাবলী অকশন হাউসের মালিক সেই জগদীশবাবুকে দূর থেকে লক্ষ করেছি। তিনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না জানি না। হুইলার বুকস্টলের ওপাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটা ব্রিফকেস।
