জগদীশবাবু নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন,–জবাব দেওয়ার মতো হলে তবেই দেব।
কর্নেল বললেন, আপনি কখনও আপনার ব্যবসার কাজে কি যদুগড়ে গিয়েছিলেন?
–যদুগড়? কোন যদুগড়?
–বিহারের যদুগড়।
জগদীশবাবু একটু চমকে উঠলেন মনে হল। তিনি বললেন,–কেন?
–সেখানকার রাজবাড়িতে অনেক মূল্যবান জিনিস আছে।
–তা সব রাজবাড়িতেই থাকতে পারে।
এবার কর্নেল একটু গম্ভীর কণ্ঠস্বর বললেন, আপনি যদুগড় রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণবাবুকে কি চেনেন?
আবার লক্ষ করলুম জগদীশবাবু কেমন যেন বিব্রত বোধ করছেন। তিনি আস্তে বললেন, –তাকে আমি চিনি না।
কর্নেল তেমনই গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বললেন, আমার কাছে খবর আছে আপনি তাকে চিনতেন, এবং এখনও চেনেন। কারণ গত তিনবছর ধরে মধুরবাবু কলকাতাতেই আছেন এবং তিনি বারিনবাবুর ছেলেবেলার বন্ধু। তাই প্রায়ই আপনার বাড়িতে, অর্থাৎ বারিনবাবুর কাছে যাতায়াত করতেন।
জগদীশবাবু এবার যেন নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। তাঁর হাবভাব একেবারে বদলে গেল। তিনি বললেন, আপনি কে? আপনার প্রকৃত পরিচয় কী?
কর্নেল আগের মতো মেজাজে বললেন, আপনার কাছে একজন প্রাইভেট ডিকেটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার গিয়েছিলেন। তাই না?
–হ্যাঁ। কিন্তু কী ব্যাপার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
–মিস্টার হালদারের পিছনে আপনি কেন একজন খুনি দুবৃত্তকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন? না, আপনি কিছু গোপন করার চেষ্টা করবেন না। আমি সবই জানি।
–আপনি কি সি. বি. আই. অফিসার?
–আপনি আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। মধুরবাবু সম্পর্কে আমি যা বলেছি, তা ঠিক কি না?
জগদীশবাবু একটু ইতস্তত করার পর বললেন,–মধুরবাবু কি না জানি না, একজন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের প্রৌঢ় ভদ্রলোক বারিনবাবুর সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা করতে আসতেন। পোশাক-আশাকে তাকে সাধারণ লোক বলেই মনে হতো।
–গত শুক্রবার বিকেলে আপনি কি বাড়িতে ছিলেন?
–না! ব্যবসার কাজে বেরিয়েছিলুম।
–কখন বাড়ি ফিরেছিলেন?
–রাত দশটার পরে।
–বারিনবাবুর ঘরে তখন কি আলো জ্বলছিল?
–অত লক্ষ করিনি। তা ছাড়া রাতে বারিনবাবু মাতাল অবস্থায় থাকতেন। তাই তাকে এড়িয়ে থাকতুম।
কর্নেল তাকে বললেন, আপনি আমাকে যেসব কথা বললেন, পুলিশ আপনাকে জেরা করলে যেন ঠিক তাই বলবেন।
বলে কর্নেল শার্টের বুক পকেট থেকে একটা খুদে টেপ রেকর্ডার বের করে তাকে দেখালেন এবং বললেন, আপনি উলটো কথা বললে বিপদে পড়বেন, কারণ এই যন্ত্রে আপনার সবকথা রেকর্ড করা হয়ে গেছে। আরও শুনুন, আপনি যদি মিস্টার হালদারের মতো আমাদের পিছনেও গুন্ডা লেলিয়ে দেন, তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।
আমাকে অবাক করে কর্নেল তার প্যান্টের পকেট থেকে তার রিভলভারটি দেখিয়ে বেরিয়ে এলেন। আমি তাকে অনুসরণে দেরি করলুম না।
এরপর রাস্তা পেরিয়ে আমার গাড়িতে ওঠার পর কর্নেল হেসে উঠলেন। বললুম,–হাসছেন কেন? ব্যাপারটা তো খুব সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। আপনি কী করে জানলেন যে মধুরবাবুর ও বাড়িতে যাতায়াত ছিল?
কর্নেল বললেন,–আন্দাজে বহুবার ঢিল ছুঁড়ে লক্ষভেদ করতে পেরেছি। এবারও পারলুম। সেজন্যই হাসছি। তা ছাড়া সঠিক জায়গায় ঢিলটি লাগলে অন্যপক্ষের কী অবস্থা হয়, তা তো নিজের চোখেই দেখলে।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে যেতে-যেতে বললুম–এবার নিশ্চয়ই বাড়ি?
কর্নেল বললেন,–অবশ্যই।
যেতে-যেতে বলুলুম,–এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। মধুরবাবু বারিনবাবুর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন, আপনি এমনটা কী করে অনুমান করলেন? সব অনুমানের মোটামুটি এক অস্পষ্ট ভিত্তি তো থাকেই!
কর্নেল বললেন,–ওটা আমার নিছক একটা অঙ্ক।
–তা হলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে মধুরবাবু যে ঘটনার কথা বলে ব্রিফকেসটা নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ঘটনা একেবারে মধুরবাবুর বানানো।
কর্নেল বললেন, এখন এসব কথা নয়। বাড়ি ফিরে স্নানাহার করার পর বিশ্রাম দরকার।
-কেন? রহস্যের জটিল জট তো প্রায় আপনাআপনি খুলেই পড়েছে।
কর্নেল টুপি খুলে মাথার টাকে হাত বুলিয়ে বললেন,–জয়ন্ত, তোমাকে বহুবার যুক্তিশাস্ত্রে অবভাস তত্ত্বের কথা বলেছি। যা যেমনটি দেখছ তা সবময়ই সর্বক্ষেত্রে তেমন নাও হতে পারে। রেললাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুমি দেখবে দুটো লাইন যেন ক্রমশ কাছাকাছি হতে-হতে একত্রে মিশে গেছে। কিন্তু ওটা তোমার দেখার ভুল।
এরপর আর কথা বলা চলে না। বাড়ি পৌঁছুতে প্রায় পৌনে একটা বেজে গিয়েছিল। স্নানাহারের পর খেয়ে নিয়ে কর্নেল ড্রইংরুমে তার ইজিচেয়ারে বসেছিলেন এবং চুরুট টানছিলেন। আমি যথারীতি ডিভানে চিৎপাত হয়ে ভাতঘুমের চেষ্টা করছিলুম। একটু পরে লক্ষ করলুম, কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়েল করছেন। তাপপর তিনি মৃদু স্বরে কার সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন বোঝা যাচ্ছিল না।
এই অবস্থায় ভাতঘুমের হাত থেকে আমার রেহাই ছিল না। সেই ভাতঘুম ভেঙেছিল ষষ্ঠীর ডাকে,–সাহেব!
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাকে জিগ্যেস করেছিলুম,–আজ তোমার বাবামশাই আমার গাড়ি চুরি করেননি তো?
ষষ্ঠী সহাস্যে বলল,–আজ্ঞে দাদাবাবু, বাবামশাই আপনার গাড়ি চুরি করেননি। লালবাজারের সেই পুলিশবাবু, কী যেন নাম তার–
বললুম,–নরেশবাবু?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। লালবাজারের নরেশবাবুই বটে। ওই যাঃ, ছাদের বাগানে কাকের বড় উৎপাত।
