–জিনিসটা কী তা আপনাকে উনি বলেননি? রাজাসাহেব চাপাস্বরে বললেন,–আমার বেয়াইমশাই বাবার বাতিক ছিল পুরাদ্রব্য সংগ্রহ করে ব্যক্তিগত জাদুঘর বানানোর।
-জানি। পাতালের সেই গোপন জাদুঘর আমি দেখে এসেছি। কিন্তু জিনিসটা কী?
আমাকে অবাক করে রাজাসাহেব বললেন,–একটা খুব প্রাচীন বৌদ্ধ সিল। তবে মধুরবাবুকে উনি হাতেনাতে ধরেননি, শুধু সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া মধুরবাবু নাকি স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন বলে খবর পেয়েছিলেন।
কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–অসংখ্য ধন্যবাদ রাজাসাহেব। আমি শুধু এই গোপন খবরটুকুই আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলুম।
রাজাসাহেব ব্যগ্রভাবে বললেন,–বাই এনি চান্স আমার বেয়াইমশাই কি আপনাকে সেই হারানো সিল-এর সন্ধানে অনুরোধ করেছেন?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না। আমি অন্য কেস-এর সূত্রে সেই হারানো সিল-এর কথা জানতে পেরেছি। যাইহোক, আপনাকে একটা অনুরোধ, আপনি যেন এ বিষয়ে আপনার বেয়াইমশাইকে কোনও কথা জানাবেন না। যথা সময়ে আপনি এবং আপনার বেয়াইমশাই সবই জানতে পারবেন। কিন্তু এখন যদি আপনি তাকে কিছু জানান, তা হলে, আমার সব চেষ্টা একেবারে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমি এবার আসি।
রাজাবাহাদুর গম্ভীরমুখে দরজা অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন। তারপর আমরা গেটের দিকে চললুম।
কিছুক্ষণ পরে দুজনে গাড়িতে চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলুম। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, আমার সঙ্গে আজ বেরিয়ে যা জানতে পেরেছ, তা যেন ঘুণাক্ষরে অন্য কারও কানে না ওঠে।
বললুম–কখনও কি আমি তেমন কিছু করেছি?
–করোনি, কিন্তু তোমাকে সতর্ক করা দরকার আছে।
–এবার কোথায় যাবেন? কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ব্র্যাবোর্ন রোডে। চলো, আমি শর্টকাটে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি।
বললুম,–আমার ধারণা আপনি জগদীশপ্রসাদ রাওয়ের মহাবলী অকসন হাউসে যাচ্ছেন।
–তুমি বুদ্ধিমান।
তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। অলিগলি রাস্তা ঘুরে আমরা ব্র্যাবোর্ন রোডে পৌঁছুলাম। তারপর কর্নেলের নির্দেশে একটা পার্কিং-এর জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানেই গাড়ি দাঁড় করালুম।
কর্নেল বললেন,–গাড়ি লক করে চলে এসো।
রাস্তার ওপারে গিয়ে একটা গলির ভেতর কর্নেল ঢুকলেন। তারপর বললেন,–এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে।
বাড়িটা ছ’তলা। দোতলায় সাইনবোর্ড–মহাবলী অকসন হাউস।
দোতলায় গিয়ে বারান্দায় কয়েক’পা হেঁটে হলঘরের মতো একটা বিরাট ঘর চোখে পড়ল। ভেতরে অবশ্য মোটা-মোটা থাম দেখা যাচ্ছিল। আর দেখা যাচ্ছিল নানা ধরনের সেকেলে আসবাবপত্র। হলঘরটার প্রথম দরজায় কোলাবসিবল গেট এবং সেটা তালাবন্ধ। কয়েক-পা এগিয়ে আর একটা কোলাবসিবল গেট। কিন্তু সেটা খোলা। গেটের পাশে টুলে একজন বন্দুকধারী এবং উর্দি পরা লোক বসে আছে। বুঝলুম সে নিরাপত্তারক্ষী। ভেতরে কোনও লোক দেখলুম না। কর্নেলকে দেখে সম্ভবত বিদেশি ভেবেই রক্ষী উঠে দাঁড়িয়ে একটা সেলাম দিল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে বললেন,–জগদীশপ্রসাদ রাও-এর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
সাহেবকে হিন্দি বলতে দেখে রক্ষী একটু অবাক হয়েছে মনে হচ্ছে। সে ইশারায় পাশে একটা ঘর দেখিয়ে দিল।
সেই ঘরের দরজায় অবশ্য কোনও লোক নেই। ভেতরে ঢুকে দেখি একটা করিডোর। আর সার-সার কয়েকটা কেবিন। একটা কেবিন থেকে বেয়ারা গোছের একজন তোক বেরিয়ে এসে কর্নেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল। কর্নেল হিন্দিতে বললেন,–মিস্টার রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
বলে তিনি তার হাতে নিজের নেমকার্ড খুঁজে দিলেন।
লোকটা তখনই যে কেবিন থেকে বেরিয়েছিল, সেই কেবিনে ঢুকে গেল। তারপর প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে সেলাম দিয়ে বলল,–আপলোগ আইয়ে।
কর্নেলের সঙ্গে কেবিনে ঢুকে দেখলুম প্রকাণ্ড অর্ধবৃত্তাকার সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওধারে একজন তাগড়াই চেহারার টাই-স্যুট পরা প্রৌঢ় ভদ্রলোক বসে আছেন। কর্নেল বাংলায় বললেন,–আপনি কি মিস্টার জগদীশপ্রসাদ রাও?
মিস্টার রাও খাঁটি বাঙালির মতোই বললেন,–আগে বসুন, তারপর কী বলতে চান বলুন।
আমরা দুজনেই পাশাপাশি বসলুম। তারপর কর্নেল বললেন, আপনার এই অকশন হাউসের নামডাক শুনেছি। তবে আমি সেজন্য আসিনি। এসেছি অন্য একটা কারণে। আমার এক আত্নীয় বারিন দত্ত আপনার বাড়িতে ছিল।
মুহূর্তে মিস্টার রাওয়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। আস্তে বললেন, তাকে কেউ গত শুক্রবার রাতে মার্ডার করেছে। আপনি কি পুলিশের কাছে সেই খবর শুনে আমাকে কিছু জিগ্যেস করতে এসেছেন?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। বারিন আপনার বাড়িতে খুন হয়েছে তা জানি। আমি শুধু আপনার কাছে জানতে এসেছি, তাকে কেউ খুন করার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে আপনার ধারণা?
মিস্টার রাও সেইরকম জ্বলন্ত চোখ পাকিয়ে বললেন, আমি জানতুম না সে একজন চোর। সে আমাকে বলেছিল পুরোনো জিনিস কেনাবেচার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আছে। আমি যদি তাকে থাকবার জায়গা দিই তাহলে সে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু সে আমার অফিস থেকে তিনটে দামি পোর্ট্রেট চুরি করেছিল। সেটা তার মৃত্যুর পর জানতে পেরেছি। কাজেই ওর সম্পর্কে আমি কোনও কথা বলব না। আপনারা আসতে পারেন।
.
ছয়
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ জগদীশবাবুর দিকে ঘুরে বললেন,–একটা জরুরি কথা জিগ্যেস করতে ভুলে গেছি। আশা করি আপনি সঠিক জবাব দেবেন।
