এইসময়েই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়িবারান্দার তলা থেকে বেরিয়ে আমাদের দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। নমস্কার করে বললেন,রাজবাহাদুর আপনার আসার কথা আমাকে বলেছেন।
এতক্ষণে সত্যি চমকে উঠলুম। কারণ এই ভদ্রলোকের নাম অচিন্ত্যবাবু। ইনি কর্নেলের বাড়ি কয়েকবার গিয়েছিলেন। তারপরই মনে পড়ল ভানুগড় রাজবাড়ি থেকে চুরি যাওয়া অমূল্য কিছু জুয়েলস কর্নেল উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। সেই রহস্যময় কেসের সময় আমাকে আমার কাগজের কর্তৃপক্ষ ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়েছিলেন।
অচিন্ত্যবাবুও আমাকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি বললেন,–নমস্কার, নমস্কার, জয়ন্তবাবু। তা আপনারা কি ট্যাক্সিতে এসেছেন?
কর্নেল বললেন,–না, আপনি তো জানেন আমার ছ্যাকড়া লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়িটা বেচে দেওয়ার পর জয়ন্তর উৎকৃষ্ট ফিয়াটেই আমি চাপতে অভ্যস্ত। জয়ন্তর ঘাড়ে চেপেই ঘুরি।
অচিন্ত্যবাবু বললেন,–কী আশ্চর্য! গাড়ি কি বাইরে কোথাও রেখে আসছেন?
কর্নেল বললেন,–হা, কারণ রাজাসাহেবের সঙ্গে মাত্র কয়েকটা কথা বলেই আমরা অন্য জায়গায় যাব। গাড়ি ওখানেই থাক।
অচিন্ত্যবাবু আমাদের গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে একটা প্রশস্ত হলঘরে নিয়ে গেলেন। বনেদী রাজা-জমিদারের বাড়ির এইসব হলঘর কর্নেলের সাহচর্যে অনেক দেখেছি। এটা তার ব্যতিক্রম নয়। দেয়ালে বড়-বড় তৈলচিত্র। গোলাকার বিশাল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে সারবদ্ধ গদিআঁটা চেয়ার, ইতস্তত প্রকাণ্ড চীনা ফ্লাওয়ার ভাস এবং বিবিধ ভাস্কর্য সাজানো। একপাশে আরামদায়ক সোফায় আমাদের বসতে বলে অচিন্ত্যবাবু কারপেট বিছানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন, সেই সময়ই কুকুরের হাঁকডাক কানে এল। আতঙ্কে দেখলুম দুটো প্রকান্ড বিদেশি কুকুরের গলায় চেন হাতে নিয়ে সিঁড়ির মাথায় ধপধপে সাদা ফতুয়া আর ধুতি পরে এক ভদ্রলোক আবির্ভূত হলেন। তার চেহারায় আভিজাত্য স্পষ্ট। গলার কাছে পৈতে দেখা যাচ্ছিল। বুঝলুম তিনি ব্রাহ্মণ এবং এও বুঝলুম তিনিই রাজাসাহেব। তার কণ্ঠস্বরও বেশ গম্ভীর। তিনি বললেন,–অচিন্ত্য এই বেয়াদপ দুটোকে বেঁধে রেখে এসো। নইলে ওরা আমাদের কথাবার্তায় বলেন বাধাবে।
অচিন্ত্যবাবু কুকুর দুটোকে নিয়ে চলে গেলেন। তারপর রাজাসাহেব রেলিং ধরে নামতে-নামতে সহাস্যে বললেন,–ডনি আর জনিকে সঙ্গে নিয়ে আসছিলুম কেন জানেন, কর্নেলসাহেব? আপনাকে যেন ওরা একটু বকে দেয়। কথাটা বলেই তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন।
কর্নেল বললেন,–গতরাত্রে আপনি তো আমাকে নিজেই বকে দিয়েছেন। কারণ, আমি নাকি আপনাকে মন থেকে মুছে ফেলেছি।
রাজাসাহেব সোফায় আমাদের মুখোমুখি বসে বললেন,–তা বকেছি, কারণ আমার প্রিয় বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে যে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির ক্যাকটাসটা পাঠিয়েছিলুম, তার প্রাপ্তিস্বীকার করেননি।
কর্নেল কপালে একটা মৃদু থাপ্পড় মেরে বললেন,–মাই গুডনেস! তাইতো! কিন্তু দোষটা আপনারই। সঙ্গে কোনও চিরকুট ছিল না। তাছাড়া আমিও তখন বাড়িতে ছিলুম না তাই পরে ওটার কথা ভুলে গিয়েছিলুম। কিন্তু রাজাসাহেব, আপনার তো উচিত ছিল একটা ফোন করে আমাকে জানানো।
রাজাসাহেব বললেন,–আলবত ফোন করেছিলুম।
–আমি নিশ্চয়ই ফোন ধরিনি, কারণ আমি তখন বাড়িতে ছিলুম না। নিশ্চয়ই আমার পরিচারক ষষ্ঠীচরণ ফোন ধরেছিল। যাগ্যে, আপনার পাঠানো ক্যাকটাস বাড়ছে। চমৎকার ফুল ফুটিয়েছে। এবার কাজের কথায় আসা যাক। কারণ হাতে সময় কম।
রাজাসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। এই ভদ্রলোক আপনার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি।
সায় দিয়ে আমি নমস্কার করতেই তিনি আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন,–আপনার আমি ভক্ত। সত্যি বলতে কী, কর্নেলসাহেবকে আমি আপনার চোখেই দেখি।
কর্নেল বললেন,–রাজাসাহেব, আর নয়, এখনই উঠব। কাজের কথাটা—
বাধা দিয়ে রাজাসাহেব বললেন,–কফি আসছে, আপনিই তো বলেন, কফি নার্ভ চাঙ্গা করে। তা ছাড়া কতদিন পর আপনার সঙ্গে বসে আমি কফি খাব–এও আমার জীবনের একটা আনন্দ।
একটু পরেই অচিন্ত্যবাবুর সঙ্গে একজন পরিচারিকা কফির ট্রে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তারপর সে কর্নেল ও আমাকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে আবার দোতলায় উঠে গেল। রাজাবাহাদুর বললেন, অচিন্ত্য তুমি নিজের কাজে যাও।
অচিন্ত্যবাবু দোতলায় উঠে গেলেন। তারপর কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–কাল রাত্রে আপনাকে ফোনে যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণ মুখার্জির কথা বলেছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর তো আপনার বেয়াই। মধুরবাবুকে আপনি অনেক বছর ধরেই চিনতেন। বিশেষ করে আপনি যখন ভানুগড়ে থাকতেন তখন শুনেছি আপনি প্রায়ই বেয়াই বাড়ি যেতেন। আমার প্রশ্ন, মধুরবাবু সম্পর্কে আপনার নিশ্চয়ই একটা ধারণা হয়েছিল। অর্থাৎ সে কী প্রকৃতির লোক, আপনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন।
রাজাসাহেব বললেন,–আরে সে তো এক বাবুর বাবু। সবসময়ই খুব সেজে-গুঁজে থাকত, সেন্ট মাখত। কিন্তু তাকে তো আমার খারাপ বলে মনে হয়নি।
–আপনার বেয়াইমশাই কেন ওকে বছর তিনেক আগে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আপনি কি তা জানেন?
রাজাসাহেব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,–রুদ্রনারায়ণ, অর্থাৎ আমার বেয়াইমশাই গতবার কলকাতায় এসে আমার বাড়িতেই উঠেছিলেন। তার কাছে তত বেশি কিছু শুনিনি। তবে উনি বলেছিলেন, মধুর রাজবাড়ি থেকে একটা অমূল্য প্রাচীন জিনিস হাতিয়েছে বলে তার সন্দেহ।
