বলে গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেলকে একটা কার্ড দিলেন।
কর্নেল সেটা পড়তে-পড়তে বললেন, হ্যাঁ, ভদ্রলোক দেখছি পুরোনো আসবাব পত্রের বেচাকেনা করেন। মহাবলী অকসন হাউস। অবশ্য এই নিলামের কারবারিরা সুযোগ পেলে গোপনে প্রত্নদ্রব্যের ব্যবসা করেন। যাইহোক, আপনি একটা কাজের মতো কাজ করেছেন। যুবকটিকে তার নাম জিগ্যেস করেননি?
–করসিলাম। কইল, স্যারেরে কইবেন চঞ্চল সাহা আপনারে এই কার্ড দিছেন। সে আরও কইল, আমি ওনার একজন এজেন্ট।
আমি বললুম,–কর্নেল, ভগ্নাংশটা আর তো তবে জটিল মনে হচ্ছে না।
কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। হালদারমশাই বললেন, আমার সন্দেহ বারিনবাবু এই ব্যবসার লগে যুক্ত ছিল। আমি এখনও কইতাসি জগদীশবাবুই বারিনবাবুরে খুন করসেন।
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–হালদারমশাই, আপনি এক কাজ করুন। এখনই মধুরবাবুর বাড়ি চলে যান। গিয়ে তাকে বলুন তার সঙ্গে আপনিও যদুগড়ে যাবেন। আপনার পরিচয় তো মধুরবাবু পেয়েছেন। আপনি এবার ওঁর দিদি নিরুপমার সঙ্গে দেখা করে আপনার আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে বলবেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আপনাকে মধুরবাবুর বিপদে সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন। নিরুপমাদেবী যেন আমাকে ফোন করে কথাটা যাচাই করে নেন। আর একটা কথা। সামান্য কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে আপনার এজেন্সির কনট্র্যাক্ট পেপারে ওঁদের সই করিয়ে নিন। বলবেন আইনের স্বার্থে এটা করা দরকার।
–হ বুসসি। কনট্র্যাক্ট পেপারে সই করলে মধুরবাবু আমার ক্লায়েন্ট হইয়া যাবেন। কোনও ঝামেলা বাধলে ওই কনট্র্যাক্ট পেপার আমার কাজে লাগবো।
কথাটা বলেই তিনি যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। আমি বললুম,–তা হলে হালদারমশাই আর মধুরবাবু যদুগড়ে চলে যাচ্ছেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–অপেক্ষা করো, আমরাও যদুগড়ে যাব। তার আগে শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডটা স্পষ্টভাবে গড়ে নিতে হবে।
আমি জিগ্যেস করলুম,–আচ্ছা কর্নেল, ওই তিনটে ছবি সম্পর্কে কি কোনও চিন্তা-ভাবনা করেছেন?
–ও নিয়ে এখন চিন্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। ছবি তিনটে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনও রাজপরিবারের ছবি।
বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,–প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। আমরা ব্রেকফাস্ট করে নিয়েই বেরিয়ে পড়ব।
–কোথায় যাবেন?
–এখন কোনও প্রশ্ন নয়। যথাসময়ে তুমি নিজেই তা জানতে পারবে।
.
পাঁচ
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বললুম,–কাল বিকেলে আপনি একা এই গাড়ি নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন জিগ্যেস করতে ভুলে গিয়েছি।
কর্নেল বললেন,–পুরাতত্ত্ববিদ ডক্টর সুবিমল চক্রবর্তীর কাছে। তোমাকে সঙ্গে না নেওয়ার কারণ ছিল। ডক্টর চক্রবর্তীকে তুমি নিশ্চয়ই চেনো। সেবার একটা দুপাঠ্য প্রাচীন লিপির অর্থোদ্ধারে–
কথাটা মনে পড়ায় বললুম,–ও সেই রাগি ভদ্রলোক? যিনি চেঁচিয়ে কথা বললে ভাবেন তাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে, আবার আস্তে কথা বললেও ভাবেন তাকে ব্যঙ্গ করে করা হচ্ছে?
কর্নেল হেসে উঠলেন,–কাজেই বুঝতেই পারছ, তোমাকে আবার দেখলে উনি খাপ্পা হয়ে আমাকেও ভাগিয়ে দিতেন। তোমাকে বলেছিলুম মনে পড়ছে, যারা কানে কম শোনেন, তারা খুব সহজেই রেগে যান।
-ওঃ সে এক সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা। আপনি না থাকলে ভদ্রলোক আমাকে বিনা দোষে লাঠিপেটা করে ঘর থেকে বের করে দিতেন। তো কালকে আপনি ওই বৌদ্ধ সিলটা ওঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন?
-ঠিক ধরেছ, ডক্টর চক্রবর্তীর মতে ওই সিলটা তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় তৈরি হয়েছিল। তা ছাড়া ওঁকে ম্যাপটাও দেখিয়েছিলুম। ওঁর মতে ম্যাপে যে ইংরেজি অক্ষরগুলো লেখা হয়েছে, তা কোনও শব্দের প্রথম অক্ষর। যাই হোক, গাড়ি চালাতে-চালাতে কথা বললে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলবে। দেখছ না এখন পিক আওয়ার শেষ হয়নি।
কর্নেলের নির্দেশে আমি পার্ক স্ট্রিট দিয়ে ধর্মতলার মোড়ে যখন পৌঁছুলাম, তখন প্রচণ্ড জ্যাম। একটু বিরক্ত হয়ে বললুম,–আমরা যাচ্ছিটা কোথায় বললে কি আপনার মহাভারত অশুদ্ধ হবে!
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সহস্যে বললেন, না। তবে তোমাকে একটা চমক দেওয়ার ইচ্ছে আছে। কাজেই তুমি চুপ করে থাকো।
এরপর সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে সোজা বিডন স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছুলাম। কর্নেল ডাইনে বিডন স্ট্রিটে গাড়ি ঢোকাতে ইঙ্গিত দিলেন। কয়েকটা বাড়ির পর বাঁদিকের একটা গলির মুখে উনি গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বললেন, এখানে পার্ক করে রাখো, কোনও
দাউ গাড়ি ঢোকাতে ইভিনিউ দিয়ে করে থাকে অসুবিধৌত বললেন। তা দিলেন। কয়েবিডন স্ট্রিটের সে
গাড়ি লক করে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। গলির ভেতর কিছুটা এগিয়েই দেখি ডানদিকে প্রাচীন আমলের একটা বিরাট দেউড়ি। তার ভেতরে তেমনি প্রাচীন একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির গড়নে ইতালীয় ভাস্কর্যের ছাপ স্পষ্ট। একতলা এবং দোতলায় মোটা-মোটা থাম। লনের দুপাশে ফুলের সমারোহ। গেটে কর্নেলকে দেখামাত্র একজন পেল্লাই চেহারার গুফো লোক সেলাম দিয়ে বলল,–আসেন, আসেন, কর্নেলসাহাব। হামার মালিক থোড়া আগে আমাকে খবর ভেজেছেন, কী কর্নেলসাহাব আসবেন। তা আপনার গাড়ি কুথায়?
কর্নেল বললেন,–বেশিক্ষণ থাকব না বলে গাড়ি গলির মোড়ে রেখে এসেছি। তা তুমি কেমন আছ রামলাল?
রামলাল গেট খুলে দিয়ে বলল,–আপকা কৃপা, হামি খুব ভালো আছি।
