দেখলুম কর্নেলের একদফা কফি খাওয়া হয়ে গেছে। তাই বললুম,–এমন জমজমাট রহস্যের গোলকধাঁধায় পড়ে আমার নার্ভ অসাড় হয়ে গেছে। রাত্রে ভালো ঘুমও হয়নি।
কর্নেল এবার তার বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন এবং যথারীতি ষষ্ঠীকে দেখলুম পরদার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছে। কর্নেল হাঁক দিয়ে বললেন,–ষষ্ঠী, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফি না আনলে তোর গর্দান যাবে।
ষষ্ঠীর মুখ পরদার আড়ালে হারিয়ে গেল। বললুম,–কর্নেল, গত রাতে আমি লক্ষ করেছি আপনি আপনার বেডরুমে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কী যেন করছিলেন।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–হা, তুমি ঠিকই ধরেছ। আমি বৌদ্ধযুগের ওই ব্রোঞ্জের সিলটা একটা সিল সংক্রান্ত পুরোনো বইয়ের পাতায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলুম।
–খুঁজে পেয়েছেন তো?
–হ্যাঁ, রাত একটা নাগাদ ওই সিলটার ছবি খুঁজে পেয়েছি। ওটা থেরবাদী, অর্থাৎ বৌদ্ধ স্থবির সম্প্রদায়ের একটা সিল। ঐতিহাসিক ডক্টর ফাগুসন লিখেছেন এই সিল-এ পালি ভাষায় এবং ব্রাহ্মি লিপিতে যা লেখা আছে, তাতে প্রাচীন মগধ অর্থাৎ আধুনিক বিহারের একটা মঠে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের আভাস পাওয়া যায়।
চমকে উঠে বললুম,–তা হলে ঘুরে-ফিরে গুপ্তধনের কথাই ফিরে আসছে।
-হ্যাঁ। আসছে বটে। এবার শুনলে তুমি আরও অবাক হবে সিল-এর যে পিঠে অপদেবতা মার-এর মূর্তি খোদাই করা আছে, তার নিচের দিকে কয়েকটা আঁকাবাঁকা রেখা আতস কাঁচে লক্ষ করে আমি একটা কাগজে তা নকল করেছি। তারপর তোয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখা পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া কাগজটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে অবাক হয়েছি। সিল-এর আঁকাবাঁকা রেখাগুলো আসলে একটা ম্যাপ। যে ম্যাপ বড় আকারে পুরোনো কাগজে আমরা দেখেছি।
এই সময়েই ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি এবং স্ন্যাকস রেখে গেল। কফি খেতে-খেতে বলুলম, –আমার নার্ভ চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। আমার চোখে এখন কী ভাসছে জানেন?
কর্নেল বললেন,–প্রাচীন মগধ। অর্থাৎ আধুনিক বিহার।
আমি উত্তেজিত ভাবে বললুন,কর্নেল, এমনকী হতে পারে না, বিহারের কোথাও সেই মঠের ধ্বংসাবশেষ বারিনবাবু আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু গুপ্তধন নিশ্চয়ই খুঁজে পাননি। আপনি কী বলেন?
–ঠিক বলেছ ডার্লিং।
হাসতে-হাসতে বললুম,যাক, অনেকদিন পরে আবার আপনার মুখ থেকে ডার্লিং শব্দটা বেরোল। তার মানে আপনার অঙ্ক ঠিক পথেই এগোচ্ছে।
–নিছক অঙ্ক নয়, মনে হচ্ছে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক। অর্থাৎ ভগ্নাংশের অঙ্ক। তাই বড় জটিল।
একটু পরে বললুম,–আপনি যদুগড়ে হয়তো অনেকবার গেছেন। কারণ, সেখানকার রাজবংশের কুমারবাহাদুর আপনার বন্ধু। যদুগড় অঞ্চলে নিশ্চয়ই অনেক ঘোরাঘুরি করেছেন। ওখানে কি কোথাও বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ লক্ষ করেননি?
কর্নেল হাসলেন,–ভগ্নাংশটা তুমি নিমেষে সমাধান করে ফেললে?
–এমনকী হতে পারে না? বিহারে তো বহু জায়গায় বৌদ্ধদের কীর্তিকলাপের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে।
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমনসময় ডোরবেল বাজল। তিনি অভ্যাসমতো হাঁকলেন,–ষষ্ঠী–
একটু পরে সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তিনি সোফায় বসে বললেন,–মর্নিং কর্নেলস্যার। মর্নিং জয়ন্তবাবু।
কর্নেল বললেন,–কোনও সুখবর এনেছেন মনে হচ্ছে হালদারমশাই!
হালদারমশাই মুচকি হেসে বললেন,–খবর একখান আনসি, তা সু কিংবা কু এখনও জানি না। তবে আগে ষষ্ঠীর হাতের কফি খামু, নার্ভ চাঙ্গা করুম, তারপর সব কমু।
ষষ্ঠী হালদারমশাইকে দরজা খুলে দিয়েই তার জন্য স্পেশাল কফি তৈরি করতে গিয়েছিল। শিগগির সে সেই কফি নিয়ে এল।
হালদারমশাই কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–আঃ!
ষষ্ঠী দাঁড়িয়ে আছে দেখে কর্নেল বললেন,–ওঃ, বুঝেছি। তুই বাজার যাবি।
ষষ্ঠী বলল,–আধঘণ্টা লেট হয়ে গেল। টাটকা মাছ আর পাব কিনা কে জানে?
কর্নেল উঠে গেলেন। বুঝলুম ষষ্ঠীকে বাজারের টাকা দিতে যাচ্ছেন। সেই সুযোগে আমি চুপি-চুপি জিগ্যেস করলুম,–কী খবর এনেছেন, তার একটু আভাস দিন না হালদারমশাই।
হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর কাজ কামের হদিশ পাইসি।
কী হদিশ শোনার সুযোগ পেলাম না। কর্নেল এসে গেলেন। ইজিচেয়ারে বসে তিনি চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন,–এবার আপনার খবরটা বলে ফেলুন হালদারমশাই।
হালদারমশাই তেমনই চাপাস্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর ব্র্যাবোর্ন রোডে ব্যবসার অফিস আছে।
-কীসের ব্যবসা?
কর্নেলের প্রশ্নের উত্তরে হালদারমশাই আরও চাপা গলায় বললেন,–নীলামের ব্যবসা। আইজ সকাল সাতটায় ওনার বাড়িতে আবার গিসলাম। একটুখান মেক-আপ করসিলাম। মাথায় পরচুলা আর গোঁফ-দাড়ি ছিল। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। জগদীশবাবুর গাড়ি বার হইয়া গেল, তারপর দেখলাম জয়ন্তবাবুর বয়েসি একজন ইয়াং ম্যান ওনার বাড়ি ঢুকত্যাসে। অমনি তারে গিয়া কইলাম, জগদীশবাবুর লগে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। লোকটি কইল, তিনি তো কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। আপনি কে? কইলাম আমি ভবানীপুরের এক জমিদার বাড়ির থিক্যা আসত্যাসি। আমার নাম রাখালচন্দ্র বিশ্বাস। আমার কর্তামশাইয়ের টাকার অভাব। তাই উনি আমারে এখানে আইতে কইলেন। জগদীশবাবু নাকি পুরোনো মাল বেচাকেনার কারবার করেন। যুবকটি কইল, তাহলে আপনি দুপুর একটা নাগাদ স্যারের অফিসে দেখা করবেন। আমি কইলাম, ঠিকানা? সে তার পকেট থেইক্যা এই কার্ডখান বার কইরা আমাদের দিল।
