আতস কাঁচের সাহায্যে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় সিলটা পরীক্ষা করে দেখার পর কর্নেল বলেছিলেন,–প্রাচীন লিপি বিষয়ে আমার যতটুকু জ্ঞান, তাতে মনে হচ্ছে, এই লিপিগুলি ব্রাহ্মি। আর উলটো পিঠে যে মূর্তিটা দেখছ, সেটা বৌদ্ধ ধর্মের এক অপদেবতার। তার নাম ‘মার।
রহস্যটা ক্রমেই এত জটিল হয়ে উঠল দেখে সে রাতে আমার ভালো ঘুমই হয়নি। সকালে বেড-টি খাওয়ার পর বাথরুমে গিয়েছিলুম, তারপর প্যান্টশার্ট পরে সাধের বাগানে যাব। ভাবছিলুম। কারণ কর্নেলের এখন ছাদেই থাকার কথা। কিন্তু চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ড্রইং রুমের ভেতর থেকে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুন। ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যে বিরক্ত মুখে সোফায় বসে আছেন। মনে হল ভদ্রলোক আমার মতোই বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। সবে আটটা বাজে, তাই বোঝা যায় উনি ঘুম থেকে উঠেই এখানে চলে এসেছেন।
আমাকে দেখে তিনি নমস্কার করলেন। আমি একটু তফাতে বসে জিগ্যেস করলুম,–হাতের লেখা দেখে মধুরবাবু কি কাউকে চিনতে পেরেছেন?
কর্নেল হেসে উঠলেন,–জয়ন্ত, মাঝে-মাঝে এমন ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করো আমার অবাক লাগে।
বললুম,–বাঃ, অবাক লাগার কী আছে? মধুরবাবু এতবছর দিদির বাড়িতে বাস করেছেন, কতরকম লোকের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা থাকা তো স্বাভাবিক। তাদের হাতের লেখা দেখতে পাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
মধুরবাবু বিষণ্ণমুখে বললেন,–হাতের লেখা দেখে আমার মনে হয়েছে কেউ কোনও কমবয়সি ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে চিঠিটা লিখিয়েছে। কর্নেল সাহেবও আমার কথা স্বীকার করেছেন।
কর্নেল বললেন,–হাঁ, এটা যে-কোনও কমবয়েসি এবং বানান ভালো না জানা ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে লেখানো হয়েছে, এতে আমি নিঃসন্দেহ। তুমি নিজেই পুরো চিঠিটা পড়ে দ্যাখো।
চিঠিটা নিয়ে দেখলুম, একটা একসারসাইজ খাতার পাতা ছিঁড়ে আঁকাবাঁকা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা আছে, মধুরকেষ্ট মালটা তুমি যে হাতিয়েছ তা জানি। আজ থেকে তিন দিনের মধ্যে ওটা তুমি আউটরাম ঘাটে গঙ্গার ধারে সেই বেঞ্চিতে যদি রেখে না আসো, তা তোমার মুণ্ডতেও একটা গুলি ঢুকে যাবে। ইতি–
চিঠিটা পড়ার পর বললুম,–একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বারিনবাবুকে যে শুক্রবার গঙ্গার ধারে ফলো করে গিয়েছিল, সে সম্ভবত দূর থেকে মধুরবাবুর হাতে ব্রিফকেসটা দেখেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হল মধুরবাবুর মতো নিরীহ মানুষের কাছ থেকে সে তত শুক্রবার রাত্রেই সোজা ওঁর দিদির বাড়িতে ঢুকে ওটা কেড়ে নিয়ে আসতে পারত। বিশেষ করে তার কাছে যখন পিস্তল বা রিভলভার আছে।
মধুরবাবু বললেন, আমার দিদিকে আপনি দেখেননি। সে পাড়ায় খুব জনপ্রিয়। তার ডাকে পড়াশুদ্ধ এসে হাজির হবে। এই চিঠি যে লিখেছে সে নিশ্চয়ই একথাটা জানে।
কর্নেল বললেন,–লোকটা যে আপনার অলক্ষ্যে আপনাকে কাল সকালে বা আজ সকালে ফলো করে আসেনি, কে বলতে পারে? আমার ধারণা ব্রিফকেসটা ফেরত নেওয়ার জন্য সে তিন দিনের সময় দিয়েছে, তার কারণ সে জানে ওটা আপনার কাছে নেই।
আমি বললুম,–তা হলে খালি ব্রিফকেসটা মধুরবাবুর হাতে দিয়ে পুলিশের সাহায্যে একটা ফঁদ পাতলেই তো হয়। যেই লোকটা মধুরবাবুর হাত থেকে ব্রিফকেস নেবে অমনি তাকে পুলিশ এবং আমরা পাকড়াও করে ফেলব।
কর্নেল হাসলেন,জয়ন্ত, লোকটা যেই হোক, সে অত বোকা নয়।
মধুরবাবু কাতর মুখে বললেন, আমার কলকাতায় থাকতে এখন খুবই আতঙ্ক হচ্ছে। তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি সে কথামতো, ব্রিফকেসটা না পায়, তাহলে প্রচণ্ড ক্রোধে আমাকে হয়তো মেরে ফেলবে। দিদিও বলছিল কর্নেলসাহেবরা যা করার করবেন, আমি যেন চুপি-চুপি যদুগড়েই ফিরে যাই। কুমারবাহাদুরের রাগ এতদিনে পড়ে গেছে, তাছাড়া ওঁর মেয়ে আমাকে অনুরোধ করে চিঠি লিখেছে, কাজেই যদুগড়ে ওঁদের আশ্রয়ে থাকলে আমি নিরাপদে থাকতে পারব।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কিছু ভাবছিলেন। তিনি চোখ না খুলেই বললেন, –এই প্ল্যানটা মন্দ নয়। আপনি বরং আজই যদুগড়ে চলে যান। যাতে সেই লোকটা আপনাকে ফলো করার সুযোগ না পায় সেইজন্য আপনি একটা ট্যাক্সি করে অলিগলি ঘুরতে-ঘুরতে হাওড়া স্টেশনে চলে যাবেন। ট্যাক্সিওলা জিগ্যেস করলে বলবেন, আমার ইচ্ছে মতো আমি যাব। তোমার তো মিটারের অঙ্ক বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
মধুরবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–এই অবস্থায় তাই করতে হবে।
টাকাকড়ি আমার হাতে তত নেই। দিদির কাছে ধার চাইলে অবশ্য পেয়ে যাব। দিদি জামাইবাবুর প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকা ছাড়াও মাসে-মাসে পেনসেন পাচ্ছে। তাছাড়া নিজের বাড়ি। একতলায় ভাড়াতে আছে।
কর্নেল বললেন,–বাঃ, তাহলে তো কোনও অসুবিধেই নেই। আপনি আজই সুযোগমতো কলকাতা থেকে কেটে পড়ুন। প্রয়োজনে আমি কুমারবাহাদুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার খবর নেব।
মধুরবাবু করজোড়ে বললেন,–কিন্তু কর্নেলসাহেবকে একটু অনুরোধ, এইসব ঘটনার কথা যেন কুমারবাহাদুরের কানে না যায়।
–না, না, সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় যদুগড়ের রাজবাড়িতে–তাই না! তাই আপনার খবর নিতে আমার কোনও অসুবিধে নেই।
মধুরবাবু আমাদের দুজনকে নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
