হালদারমশাই বললেন,–ও কিসু না। তারপর পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা ড্যাগার বের করে বললেন,–কর্নেলস্যার, আপনি তো জানেন আমার মাথা আফটার অল–।
কর্নেল সহাস্যে বললেন, পুলিশের মাথা–এই তো? যাই হোক, বসুন আমি পোশাক বদলে আসি। আর জয়ন্ত, তোমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেজন্য এই বৃদ্ধের প্রতি মনে-মনে খুব রেগে আছ। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, তোমার কেমন চমৎকার একটা ভাত-ঘুম হয়ে গেল। বলবে, তুমি সঙ্গে গেলে কি আমার কোনও অসুবিধে হতো? হ্যাঁ, হতো।
বলে তিনি ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে আমি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ভাঁজ করা ড্যাগারটা খুলে ফেললুম। ছ’ইঞ্চির বেশি লম্বা শান দিয়ে ধারাল করা অস্ত্র। হালদারমশাই ছোরাটা আমার হাত থেকে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন,–মনে হইত্যাসে ষষ্ঠীচরণ এখনই কফি লইয়া আইবে। সে ফায়ার আর্মর্স দেইখ্যা ভয় পায় না, কিন্তু ড্যাগার দেইখ্যা খুব ভয় পায়।
একটু পরে কর্নেল ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। তার পেছনে ষষ্ঠীচরণও কফি আর দু-প্লেট স্ন্যাকস নিয়ে এসে গেল। এবং সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে চুপচাপ চলে গেল।
এরপর কিছুক্ষণ আমরা কফি পানে মন দিলুম। কফি শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, –এবার হালদারমশাইয়ের রিপোর্ট শোনা যাক।
হালদারমশাই ইনিয়ে-বিনিয়ে যে ঘটনা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই :
কর্নেলের কথা অনুসারে হালদারমশাই বারিনবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাড়িটার মালিক একজন অবাঙালি ভদ্রলোক। তার নাম, জগদীশ প্রসাদ রাও। বাড়িটা দোতলা, এবং নতুন। ওই গলির মধ্যে বাড়িটা চোখে পড়ার মতো। সামনের একটা গেট আছে, ভেতরে ছোট্ট একটা লন। সামনের অংশটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এবং পাঁচিলে কাঁটাতারের বেড়া আছে। হালদারমশাই গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে ডাকেন। তারপর দারোয়ানের হাতে তার নেমকার্ড দিয়ে বলেন, বাড়ির মালিকের সঙ্গে তার দেখা করা জরুরি। দারোয়ান বলে তার সাহেব এখন বিশ্রাম করেছেন। দেখা করতে হলে চারটের পর আসতে হবে।
হালদারমশাই একটু গলা চড়িয়ে ইংরেজিতে বলেন, তিনি একজন ডিটেকটিভ। এবং এই বাড়িতে আজ যে ভদ্রলোক খুন হয়েছেন তার আত্মীয় তাকে এই খুনের তদন্তের ভার দিয়েছেন। এতে কাজ হয়। ডান দিকে দোতলার একটা ঘরের দরজা খুলে ব্যালকনিতে এক ফরসা রঙের ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন। তিনি কথাটা শুনতে পেরেছিলেন। তাই দারোয়ানকে বলেন, হালদারমশাইকে যেন নিচের বসার ঘরে নিয়ে আসে।
এরপর জগদীশবাবুর সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথাবার্তার আর বাধা ছিল না। জগদীশবাবু বলেন, নিহত বারিনবাবু ছিলেন তার একজন বন্ধুমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। গত মাসে বারিনবাবুকে তার বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ জানান। জগদীশবাবুর ফ্যামিলি মাসখানেকের জন্য দেশে গেছে। তার দেশের বাড়ি হরিয়ানায়। কাজেই দোতলার যে ঘরটা আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠ কারো জন্য খালি রাখা হয়, অর্থাৎ তার গেস্টরুম, সেখান তিনি বারিনবাবুকে অস্থায়ী ভাবে থাকতে দিয়েছিলেন। বারিনবাবুর কাছে এযাবৎ কোনও লোক দেখা করতে আসেননি। ওঘরে একটা বাড়তি টেলিফোন আছে, সেটা তিনি বারিনবাবুকে ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছিলেন।
এসব কথা হালদারমশাই তাঁকে প্রশ্ন করেই জানতে পেরেছেন। এরপর হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে জগদীশবাবু বলেন, গতরাত্রে কখন এমন একটা শোচনীয় কাণ্ড ঘটেছে তিনি টের পাননি। দারোয়ানও এতটুকু জানতে পারেনি। বারিনবাবু পাড়ার একটা হোটেলের সঙ্গে নিজের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কারণ, উনি কখন খাবেন তার কোনও সময়ের ঠিক ছিল না।
এরপর হালদারমশাইকে নিয়ে তিনি দোতলায় বারিনবাবুর ঘরে যান। পুলিশ যা তদন্ত করার করে নিয়ে চলে গেছে। তাই ঘরের চাবি জগদীশবাবুর কাছে আছে। ঘরে ঢুকে হালদারমশাই যথাসাধ্য খুঁটিয়ে দেখে কোনও সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘরের রক্ত ততক্ষণে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। জগদীশবাবু তাকে বলেন, তার ধারণা কোনও চেনা লোক বারিনবাবুর কাছে এসেছিল। কিন্তু সে তা হলে নিশ্চয়ই পাঁচিলের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে ছিল। এমনকী জগদীশবাবুর ধারণা, তাকে বারিনবাবুই গভীর রাতে কোনও এক সময় পাঁচিল ডিঙিয়ে আসতে বলেছিল। পুলিশ দেখেছে দারোয়ানের ঘরের পাশে একটা বকুলগাছ আছে। সেই বকুলগাছে খুনির আসার চিহ্ন পুলিশ খুঁজে পেয়েছে। এখন জগদীশবাবুর আক্ষেপ, তিনি বারিনবাবুর ওপর কেন যে এত আস্থা রেখেছিলেন বুঝতে পারছেন না।
এসব কথা বলার পর হালদারমশাই একটু দম নিয়ে বললেন,–ঘরে বারিনবাবুর যেসব জিনিস ছিল, তা পুলিশ সিজ কইরা লইয়া গ্যাসে, কিন্তু আমার মনে একখান ধন্ধ ঢুকসে।
কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–কী ধন্ধ? গোয়েন্দপ্রবর খুব চাপা স্বরে বললেন,–কর্নেলস্যার, আমার সন্দেহ, বারিনবাবুরে ওই জগদীশবাবুই খুন করসেন।
কর্নেল বললেন,–সেটা অসম্ভব কিছু নয়।
এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন, –বলুন মধুরবাবু…বলেন কী? আপনার লেটার বক্সে হুমকি দেওয়া চিঠি? ঠিক আছে, কাল দিনের বেলায়-ধরুন, সকাল নটার মধ্যে আপনি চলে আসুন।
.
চার
সেই সন্ধ্যায় কর্নেল হালদারমশাইকে জগদীশবাবুর কাজ কারবারের খোঁজ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। হালদারমশাই চলে যাওয়ার পর আমি সোফার নিচে কুড়িয়ে পাওয়া সেই চাকতিটা কর্নেলকে দেখিয়েছিলুম। চাকতিটা যে মধুরবাবুর পকেট থেকেই পড়েছে, আমার এই ধারণার কথাও বলেছিলুম। কিন্তু কর্নেলের মতে ওই চাকতিটা তোয়ালের ভঁজের ভেতরেই সম্ভবত রাখা ছিল। সোফার নিচে কার্পেটের ওপর ভোয়ালেটা লম্বা করে ঝেড়ে ফেলার সময় অবশ্য কোনও শব্দই শোনা যায়নি। তারপর কর্নেল আমাকে অবাক করে বলেছিলেন, তুমি এটাকে তামার চাকতি ভাবছ, কিন্তু এটা আসলে একটা ব্রোঞ্জের সিল।
