এইসব ভাবতে-ভাবতে দৃষ্টি গেল সোফার নিচে। যেখানে মধুরবাবু বসে ছিলেন সেখানে সোফার তলায়ে কী একটা ছোট্ট চাকতির মতো জিনিস পড়ে আছে। তখনই হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিলুম। ততক্ষণে ঘরের আলো কমে এসেছে। আগে কর্নেলের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে জিনিসটার দিকে তাকালাম। একটা তামার চাকতি বলেই মনে হল। চাকতিটার সাইজ এক টাকার কয়েনের মতো। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেখতে-দেখতে আবিষ্কার করলুম চাকতির গায়ে অজানা ভাষার হরফে কীসব লেখা আছে। উলটো পিঠে একটা মূর্তি আঁকা। মূর্তিটা দেখতে ভয়ঙ্কর।
খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলুম। কর্নেলের ড্রইং রুমে দেশ বিদেশের বিস্ময়কর বহু জিনিস আছে বটে, কিন্তু সেগুলো সবই কাঁচের আলমারির ভেতর সাজানো আছে। এটা নিশ্চয়ই কর্নেলের নয়। তাহলে কি এটা মধুরবাবুর পকেট থেকে দৈবাৎ তার অজান্তে পড়ে গিয়েছিল? মনে পড়ল মাঝে-মাঝে তিনি রুমাল বের করে মুখ মুছছিলেন।
মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতায় শীতের আর পাত্তা নেই বরং বাইরে বেরুলে গরম লাগে। কিন্তু কর্নেলের ড্রইং রুমের ফ্যানের হাওয়া সত্ত্বেও উত্তেজনা মানুষকে ঘামিয়ে তুলতে পারে।
আরও একটু চিন্তার পর আমার বিশ্বাস দৃঢ় হল, এটা কোনও দেশের প্রাচীন মুদ্রাও হতে পারে। কিন্তু মধুরবাবু এটা পাঞ্জাবির ডান পকেটে না রেখে বাঁ-পকেটে রেখেছিলেন কেন, যে পকেটে কি না রুমাল ভরা আছে।
ইতিমধ্যে ষষ্ঠী ছাদ থেকে নেমে এসে ঘরের সব আলো জ্বেলে দিল। তারপর মুচকি হেসে বলল,–দাদাবাবু টিকটিকিবাবু আসছেন।
ষষ্ঠী হালদারমশাইকে টিকটিকিবাবু বলে। মিনিট দুই-তিন পরে ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী পিছনের করিডোর দিয়ে গিয়ে বাইরের লোকেদের জন্য দরজা খোলে। কিন্তু তাকে দরজা খুলতে নিষেধ করে আমি নিজেই ড্রইংরুমের সংলগ্ন ছোট ওয়েটিং রুমটা দিয়ে এগিয়ে গেলুম। তারপর দরজা খুললুম।
হালদারমশাইকে দেখে অবাক হয়ে বললুম,–কার সঙ্গে মারামারি করে এলেন? আপনার কপালে ছোট একটা ব্যান্ডেজ দেখছি। ডান হাতের বুড়ো আঙুলেও পট্টি বাঁধা।
হালদারমশাই বাঁকা হেসে বললেন,–ও কিছু না। কর্নেল স্যার ফেরেন নাই?
বললুম,–না।
ড্রইংরুমে এসে হালদারমশাই ধপাস করে সোফায় বসে বললেন,–এক গ্লাস জল খামু। ষষ্ঠীরে ডাকেন।
আমি হাঁক দিলুম,–ষষ্ঠী, শিগগির এক গ্লাস জল নিয়ে এসো।
ষষ্ঠী তখনই জল এনে দিল। তারপর তার টিকটিকিবাবুর ক্ষতচিহ্নের দিকে তাকিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে ঠোঁট ফাঁক করল। কিন্তু আমি তাকে চোখ টিপে নিষেধ করে ইশারায় চলে যেতে বলুলম। কারণ, হালদারমশাই এখন অন্য মেজাজে আছেন। ষষ্ঠীকে ধমক দিতেও পারেন।
ষষ্ঠী চলে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলুম,–মনে হচ্ছে আপনার ওপর কেউ হামলা করেছিল। হালদারমশাই জলের গ্লাস রেখে এক টিপ নস্যি নিলেন, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে সেই নোংরা রুমাল বের করে নাক মুছে বললেন,–আইজ একটু ভুল করসিলাম। সঙ্গে আমার লাইসেন্সড রিভলভারটা ছিল না। আর্মস ছাড়া আমি কখনও কোনও স্পটে যাই না। আসলে কর্নেল স্যারের কথা শুইন্যাই সোজা স্পটে চলে গিসলাম।
–তা আপনার ওপর হামলা করল কে?
গোয়েন্দাপ্রবর ক্ষোভের সঙ্গে বললেন,–আমি তখন আপনার লগে ফোনে কথা কইতেসিলাম। সেই ফোনটা পাইসিলাম একটা ফামের্সিতে। আইজ রবিবার, কিন্তু ফার্মেসিটা খোলা ছিল। আপনার লগে কথা কইত্যাসি, এমনসময়ই এক হালায় হঠাৎ আমার পিছন থিক্যা ফোনটা কাড়বার চেষ্টা করল। ফার্মেসির মালিক কর্মচারী সবাই মনে হল লোকটারে ভয় পায়। তারা চুপচাপ দাঁড়াইয়া থাকল। এদিকে আমি এমন কাণ্ড দেইখ্যা একটুখন অবাক হইসিলাম। ফোনটা কাড়িয়া লইয়া লোকটা কইল,–এক্ষুনি এখান থেইক্যা কাইট্যা পড়ো। নইলে এই দেখসো আমার কী আসে!
জিগ্যেস করলুম,–ছোরা ছুরি নাকি ফায়ার আর্মস?
হালদারমশাই জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ছয়-সাত ইঞ্চি লম্বা একখান ছোরা।
জিগ্যেস করলুম,–আপনাকে কি সে ওটা দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল?
গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন, নাঃ, আমিই হালার হাত থেইক্যা ড্যাগারখান কাইড়া লইছি। কাড়াকাড়ির সময় আমার কপালে আর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে ড্যাগারের ডগা একটুখানি লাগসে।
–তারপর কী হল?
–হালার প্যাটে হাঁটুর গোঁত্তা এমন জোরে মারসি, সে তখনই টেলিফোন শুঙ্কু নিচে গড়াইয়া পড়সিল। তারপর আর সাড়াশব্দ নাই।
–তার মানে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল?
–হঃ! তো আমি ফার্মাসিতে কইলাম আমারে দুইখান ব্যান্ডেজ লাগাইয়া দিন।
দোকানের একজন কর্মচারী আমার হুকুম পালন করল। আমি তারে কইলাম,–আমি কে আপনারা জানেন? লালবাজারের ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক। অমনি দ্যাখলাম যেটুকু ভিড় জমসিল, তখনই সাফ হইয়া গেল। আমি বুক ফুলাইয়া রাস্তায় নাইম্যা একটা ট্যাক্সি ডাকলাম।
–আর লোকটা ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল?
এবার গোয়েন্দ্ৰপ্ৰবর খোলা মনে হেসে বললেন, আমি আর পিছু ফিরি নাই।
–লোকটা কে তা চিনতে পেরেছিলেন?
–না। তবে এইটুকু বুঝঝি হালা আমারে জগদীশবাবুর বাড়ি থিক্যা ফলো কইরা আইছিল।
–জগদীশবাবু কে?
–কমু। কর্নেল স্যারেরে আইতে দিন, তারপর ডিটেলস সব জানতে পারবেন।
কর্নেল এলেন প্রায় আধঘণ্টা পরে। তখন প্রায় ছ’টা বাজে। তিনি এসেই হালদারমশাইকে দেখে বলে উঠলেন,–যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটেছে দেখছি। তখন আপনি আমার কথা শুনেই বেরিয়ে গেলেন, আমি সুযোগ পেলুম না যে আপনাকে একটু সাবধান করে দেব।
