কর্নেল ম্যাপটা খামে ভরে ভোয়ালের ভাঁজে রেখে ব্রিফকেসে ঢোকালেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার একটা নেমকার্ড বের করে মধুরবাবুকে দিলেন। বললেন,–দরকার হলে আপনি আমাকে ফোন করবেন। আর যদি প্রয়োজন মনে করেন, আপনার দিদিকেও আমার কথা খুলে বলবেন। কারণ তাঁর সাহায্যও যে আমার লাগবে না এমন কথা বলা যায় না।
মধুরবাবু চলে যাওয়ার সময় আমাকে ও হালদারমশাইকেও নমস্কার করে গেলেন।
কর্নেল ব্রিফকেসটা নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। বুঝতে পারলুম তিনি এই কেসটাতে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। গুরুত্ব দেওয়ারই কথা, কারণ এই ব্রিফকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে তা প্রচণ্ড রহস্যময়।
হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–আচ্ছা জয়ন্তবাবু, মধুরবাবুরে দেইখ্যা আপনার কী ধারণা হইল কন শুনি।
বললুম,–আপাত দৃষ্টিতে সাধাসিধে লোক বলেই মনে হল। একসময় খুব বিলাসিতায় জীবন কাটাতেন তা তো শুনলুম, কিন্তু এখন হয়তো তার তেমন কিছু রোজগার নেই। বিধবা দিদির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ইচ্ছে করলে তিনি তো ব্রিফকেসটার তালা ভেঙে টাকাকড়ি সোনাদানা আছে কি না দেখতে পারতেন। অন্য লোকে অন্ততত আগ্রহের জনও তেমনটি করে। কিন্তু উনি তা করেননি।
গোয়েন্দাপ্রবর একটিপ নস্যি নিয়ে নোংরা রুমালে নাক মুছে বললেন,–কিছু কওন যায় না। মাইনসের চেহারা দেইখ্যা বা কথা শুইন্যা কিছু বোঝা যায় না। জয়ন্তবাবু, চৌত্রিশ বৎসর চাকরি করসি–
এই সময়েই কর্নেল ফিরে এসে বললেন,–হালদারমশাই আপনার চৌত্রিশ বছরের পুলিশি অভিজ্ঞতা দিয়ে আপাতত একটা কাজ করে ফেলুন।
হালদারমশাই ব্যগ্রভাবে বললেন,–কন কর্নেলস্যার।
কর্নেল বললেন,–আপনাকে আমি নিহত বারিনবাবুর ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। আপনি আজ সন্ধ্যার মধ্যেই একটা খবর এনে দিন। ও বাড়িতে বারিনবাবু কি একা থাকতেন, নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ থাকত?
কথাটা শোনামাত্র গোয়েন্দাপ্রবর কোনও কথা বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
.
তিন
এমনিতেই রবিবারের দিনটা আমি কর্নেলের বাড়িতে কাটাই। কিন্তু কোনও রহস্যজনক ঘটনার পিছনে দৌড়াতে হলে কর্নেলের হাত থেকে আমার রেহাই মেলে না। তাছাড়া আমার স্বার্থও থাকে। কারণ সেই ঘটনার ভিত্তিতে পাতার পর পাতা রিপোর্টিং লিখে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় প্রকাশের সুযোগ পাই এবং তাতে পত্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে সুনাম কুড়োই।
দুপুরে খাওয়ার পর অভ্যাসমতো ডিভানে চিত হয়ে ছিলুম। সেই সময় লক্ষ করলুম কর্নেল ঘরের ভেতর থেকে সেই ব্রিফকেসটা নিয়ে এলেন। তারপর সেটার ভেতর থেকে সেই ম্যাপটা বের করলেন। আমার চোখে ঘুমের টান এসেছিল, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল কর্নেল ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে তা থেকে কোনও সূত্র বের করবেন।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। ঘুম ভাঙল ষষ্ঠীচরণের ডাকে। তার হাতে যথারীতি চায়ের কাপ-প্লেট। এটা বহুদিনের রীতি। ষষ্ঠী জানে ঘুমের পর আমি চা খেতেই ভালোবাসি। ডিভানে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে জিগ্যেস করলুম,–ষষ্ঠী তোমার বাবামশাই কি সাধের বাগান পরিচর্যা করতে গেছেন?
ষষ্ঠী ফিক করে হেসে বললে,–আজ্ঞে দাদাবাবু, উনি আমাকে বলে গেছেন, তোর দাদাবাবুকে বলবি তার গাড়িটা আমি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি।
এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু বরাবরই এতে আমার রীতিমতো অভিমান হয়। কেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে ওঁর কোনও অসুবিধা হয়? বললুম,–তোমার বাবামশাই কখন ফিরবেন তা কি বলে গেছেন?
ষষ্ঠী বলল,–আজ্ঞে না। বলেই সে চমকে ওঠার ভঙ্গি করল–এই রে! সাড়ে-চারটে বাজতে চলল। ছাদের বাগানের কথা ভুলেই বসে আছি।
সে দ্রুত চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। চা খাওয়ার পর কাপ প্লেটটা নিয়ে সোফার কাছে গেলুম এবং সেটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিলুম। ঠিক এই সময়ই টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই হালদারমশাইয়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,কর্নেল স্যার, আমি হালদার কইত্যাদি।
কর্নেলের কণ্ঠস্বর নকল করার চেষ্টা করে বললুম-বলুন হালদারমশাই।
কিন্তু গোয়েন্দপ্রবরকে যতই অবহেলা করি, তার কান প্রাক্তন পুলিশের কান। তিনি বললেন, –জয়ন্তবাবু, এখন জোক করার মুডে আমি নাই।
অগত্যা হাসতে-হাসতে বললুম,–আপনি কি ছদ্মবেশে আছেন, নাকি কেউ আপনাকে অ্যাটাক করেছিল?
হালদারমশাই বললেন,–বুসছি, কর্নেল স্যার ছাদের বাগানে আছেন। থাকলে প্লিজ শিগগির ডেকে দ্যান।
বললুম,–হালদারমশাই আপনার কর্নেল স্যার আমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে পালিয়েছেন।
–কী কাণ্ড! ষষ্ঠীরে কইয়া জাননি কিছু?
–ওই তো বললুম, ষষ্ঠীকে ঠিক ওই কথাটাই তিনি বলে গেছেন–জয়ন্তর গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি!
–আপনি তখন কী করত্যাসিলেন?
–ঘুমোচ্ছিলুম। আপনি তো ভালোই জানেন দুপুরে আমার ভাত-ঘুমের অভ্যাস আছে।
–তা হইলে তো একটু গণ্ডগোল হইয়া গেল।
–কীসের গণ্ডগোল?
–কর্নেল স্যার থাকলে তেনার লগে কনসাল্ট করতাম।
–আপনি আমার সঙ্গে কনসাল্ট করতে পারেন।
হঠাৎ ফোনের লাইন কেটে গেল। আমি কয়েকবার হ্যালো-হ্যালো করার পর রিসিভার নামিয়ে রাখলুম। তারপর কেন যেন মনে হল কেউ কি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল? একটু উদ্বেগ বোধ করলুম। এই প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোক মাঝে মাঝে ভুলে যান তিনি এখন পুলিশ ইন্সপেক্টর নন, তাছাড়া জেদের বসে অনেক সময়েই এমন হঠকারি কাজ করে বসেন যে কর্নেলকে সেজন্য অনেক ছোটাছুটি করতে হয়।
