মধুরবাবু বললেন,–বারিনের পুরো নাম, বারীন্দ্রনাথ সিনহা। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ যদুগড় রাজ হাইস্কুলে। ওর বাবা ছিলেন রেলের অফিসার। যদুগড়ে বদলি হয়ে আসার পর বারিনকে তিনি ক্লাস সিক্সে ভরতি করে দেন। বারিন ছিল খুব আলাপি ছেলে। আমার সঙ্গে ওর হৃদ্যতা ছিল সবচেয়ে বেশি। তখন আমার বাবা ছিলেন যদুগড় রাজপরিবারের ম্যানেজার। যাইহোক, আমরা দুজনে ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে পাটনার কলেজে পড়েছিলুম। বি.এ. পাশ করে বারিন কোথায় চলে গিয়েছিল জানি না। ওর বাবা রিটায়ার করে যদুগড়েই বাড়ি করেছিলেন। তার কাছে বারিনের কথা জানতে চাইলে তিনি রাগ করে বলতেন, ওই হতভাগার কথা তুমি জিগ্যেস কোরো না আমাকে। আমি জানি না সে কোথায় কী করছে।
কর্নেল বললেন, তারপর বারিনের সঙ্গে আপনার আবার কবে দেখা হয়েছিল?
–আগেই বলেছি বছর দশেক আগে। সে যদুগড়ে কোনও কোম্পানির ব্যবসার কাজে এসেছিল।
–বারিনবাবুর বাবা কি তখন বেঁচে ছিলেন?
–না, তিনি মারা যাওয়ার পর বারিনের মা তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ভাগলপুরে। তারপর তিনি যদুগড়ের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে জামাইয়ের কাছে গিয়ে থাকতেন।
–বারিন আপনার কাছে এসব কিছু জানতে চায়নি? নাকি সে তার মায়ের এবং বোনের খবর জানত?
মধুরবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–বারিন এ কথা জানত। সে বলেছিল, সে তখন বম্বেতে বড় একটা কোম্পানিতে কাজ করে। সেই কাজের সূত্রেই তাকে যদুগড়ে আসতে হয়েছে। আমি তাকে রাজবাড়িতে আমাদের কোয়ার্টারে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল তার হাতে আর সময় নেই। এখুনি তাকে পাটনায় চলে যেতে হবে।
-–আচ্ছা মধুরবাবু একটু স্মরণ করার চেষ্টা করুন তো, যদুগড়ে কোন ব্যবসায়ীর কাছে। বারিনবাবু এসেছিলেন? তা কি তিনি আপনাকে বলেছিলেন?
মধুরবাবু চোখ বুজে কিছুক্ষণ আঙুল খুঁটলেন। তারপর চোখ খুলে বললেন,–হা, বারিন আমাকে বলেনি, কিন্তু আমি তাকে হরদয়াল ট্রেডিং এজেন্সির অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলুম।
কর্নেল বললেন,–ওই অফিসটা যে ব্যবসা সংক্রান্ত তা বোঝা যাচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন বা জানতেন ওরা কীসের ব্যবসা করত।
মধুরবাবু এবার বিকৃত মুখে বললেন,–হরদয়াল ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ব্যবসা করত। কিন্তু যদুগড়ে ওর বদনাম ছিল স্মাগলার বলে। একবার ওকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছিল। হংকং থেকে নেপাল থেকে যেসব ইলেক্ট্রনিক জিনিস চোরাচালান হয়, সেই চক্রের সঙ্গে হরদয়ালের যোগাযোগ ছিল।
–এখন কি ওই ট্রেডিং এজেন্সিটা আছে?
–তিন বছর আগে আমি যদুগড় থেকে চলে এসেছি। তখন ওটা ছিল, তা দেখেছি। হরদয়াল মারা গেলে তার ছেলে রামদয়াল ব্যবসা চালাত। এই তিন বছরে সেটা উঠে গেছে কি না জানি না।
কর্নেল বললেন, আপাতত আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। এবার আপনি আপনার কলকাতার ঠিকানা দিন।
বলে কর্নেল একটা কাগজের প্যাড আর কলম এগিয়ে দিলেন। মধুরবাবু তাতে নিজের নাম, বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলেন।
কর্নেল সেটা হাতে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রেখে ব্রিফকেসের ছবিগুলো আগের মতো কাগজের মোড়কে ভরে রেখে দিলেন। তারপর তোয়ালেটা হঠাৎ কী খেয়ালে খুলে পায়ের কাছে ঝাড়লেন। তখনই দেখলুম তোয়ালের ভেতর থেকে একটা লম্বা-চওড়া খাম মেঝেয় ছিটকে পড়ল। মধুরবাবু বলে উঠলেন,–আরে ওটা আবার কী?
কর্নেল খাম খুলে একটা ভাঁজ করা খুব পুরোনো কাগজ বের করলেন। কাগজের ভাঁজগুলো কোথাও-কোথাও একটু আধটু ছিঁড়ে গেছে। সাবধানে ভাঁজখুলে অভ্যাসমতো তিনি আতস কাঁচের সাহায্যে দেখতে-দেখতে বললেন,–মধুরবাবু, রহস্য আরও ঘনীভূত হল মনে হচ্ছে।
মধুরবাবু সোফা থেকে একটু উঁচু হয়ে কাগজটা দেখতে-দেখতে বললেন, এটা একটা ম্যাপ মনে হচ্ছে! ম্যাপটাতে শুধু আঁকিবুকি ছাড়া স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই।
কর্নেল বললেন,–আছে, তবে সেগুলোতে ইংরেজি এ বি সি ডি ইত্যাদি অক্ষর লেখা আছে। ম্যাপের দাগগুলো মোটা কিন্তু অক্ষরগুলো ছোট তাই সহজে চোখে পড়ে না।
মধুরবাবু জিগ্যেস করলেন,–এটা কীসের ম্যাপ বলে মনে হচ্ছে আপনার?
কর্নেল একটু থেমে বললেন,–এটা কোনও জায়গার ম্যাপ হতে পারে, তবে ও ম্যাপ আঁকার উদ্দেশ্য কী এখন অনুমান করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।
হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে বললেন,–কর্নেলস্যার, কোথাও কোনও দামি জিনিস লুকোনো আছে-এটা তারই ম্যাপ হইতে পারে না? জয়ন্তবাবু কী কন?
সায় দিয়ে বললুম,–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই। এটা যাকে বলে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের ম্যাপ।
মধুরবাবু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন,–গুপ্তধন? বারিন কি কোনও গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছিল? তা না হলে এ ম্যাপ সে এঁকে লুকিয়ে রাখল কেন? কর্নেলসাহেব এখন আমার মনে হচ্ছে ছবিগুলোর জন্য নয়, এই লুকিয়ে রাখা ম্যাপটার জন্যই বারিনকে কেউ অনুসরণ করেছিল। আর এটা না পেয়েই রাগের চোটে সে বারিনকে খুন করে চলে গেছে।
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–মধুরবাবু আপনি কি ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখতে চান?
মধুরবাবু হাত এবং মাথা জোরে নেড়ে বললেন,–না-না কর্নেলসাহেব, ওই সর্বনেশে জিনিস আমার কাছে রেখে আমি কি স্বেচ্ছায় কারও হাড়িকাঠে গলা গলিয়ে দেব? ওসব সাংঘাতিক জিনিস আপনিই রাখুন। আর আমার একটা অনুরোধ, বারিন আমার এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তার এই শোচনীয় পরিণতির জন্য আমার মনে খুব আঘাত লেগেছে। আপনি দয়া করে বারিনের খুনিকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। আর সেইসঙ্গে সেই ম্যাপের রহস্য ফাঁস করুন। আমাকে আপনি সবসময়েই পাবেন।
