বললুম,–হ্যাঁ, টাকাকড়ি সোনাদানা থাকতেও পারে। তবে সে সব থাকলে বারিনবাবু কি তার পুরোনো বন্ধুর হাতে বিশ্বাস করে রেখে যেতে পারতেন কি না, সেটা মধুরবাবুই বলতে পারবেন।
মধুরবাবু বললেন,–বারিন চিঠিতে লিখেছে ইচ্ছে হলে আমি তালা ভেঙে ব্রিফকেস খুলে দেখতে পারি কী আছে। কারণ সে জানে আমি তার কোনও জিনিস হাত দেব না, বা তালাও ভাঙব না।
কর্নেল বললেন, তা হলে কী করা যায় আপনিই বলুন মধুরবাবু?
–আজ্ঞে? আমি কী বলব? আপনি যদি ওটার তালা ভেঙে ভেতরে কী আছে দেখতে চান, আমার তাতে আপত্তি নেই। বরং জয়ন্তবাবু আর হালদারমশাই দুজন সাক্ষী থাকবেন।
কর্নেল হালদারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–হালদারমশাই, আপনি কী বলেন?
হালদারমশাই এবার গম্ভীরমুখে বললেন,–আমি কী আর কমু, ব্রিফকেসের মালিক তো খুন হইয়া গেসেন। কাজেই এটা একটা মার্ডার কেস। তাই আমার মতে ওটা না ভাইঙা ও.সি. হোমিসাইডেরে খবর দিলে ভালো হয়।
মধুরবাবু হাত তুলে মাথা নেড়ে আপত্তি জানিয়ে বললেন,–না-না, ওকাজ করলে আমি মারা পড়ে যাব। পুলিশ আমাকে ছাড়বে না।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন,–তা ঠিক। কিন্তু আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি। আপনি তো আমার কাছে এসেছেন। পুলিশের কাছে গেলে ঝামেলা হবে বলেই এসেছেন–তাই না?
মধুরবাবু ব্যস্তভাবে বললেন,–হা, কর্নেলসাহেব।
–তা হলে এটার ভেতর কী আছে তা জানতে আমাদের যেমন আগ্রহ, আপনারও তাই। মধুরবাবু বললেন,–হা। বারিনের কাজকর্মের খবর বহুকাল আমি জানি না। আমার ধারণা ব্রিফকেসটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েই আমাকে দিয়ে কেটে পড়েছিল। কাজেই আপনি যদি তালা ভেঙে ভেতরের জিনিস দেখে নেন, তাহলে বারিনকে খুনের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।
এবার কথাটা হালদারমশাইয়ের মনঃপুত হল। তিনি বললেন,–হঃ, এটা একটা পয়েন্ট বটে। পুলিশ খুনের মোটিভ বুঝে পাওয়ার আগেই আপনি তা পাইয়া যাবেন।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা ছোট বড় ভ্রু-ড্রাইভার এবং একটা ছোট্ট হাতুড়ি বের করলেন। তারপর ব্রিফকেসটা কোলে রেখে একটা ভ্রু-ড্রাইভারের মাথায় আস্তে হাতুড়ির ঘা দিতে থাকলেন। দুমিনিটের মধ্যেই একটা লক খুলে গেল। দ্বিতীয় লকটা খুলতে তার চেয়ে কম সময় লাগল। তারপর ব্রিফকেসটা তিনি টেবিলে রেখে ডালা খুললেন।
আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলুম ব্রিফকেসের ভেতর একটা টার্কিস তোয়ালে ভরা আছে। কর্নেল সেটা তুলে নিতেই দেখা গেল খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা প্রায় ব্রিফকেসের তলার সাইজের। কাগজের মোড়ক খোলার পর দেখলুম তিনটে একই সাইজের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি।
কর্নেল একটা-একটা করে ছবি আমাদের দেখালেন। তিনটে ছবিই পোর্ট্রেট। ফটোগ্রাফ নয়, অয়েল পেন্টিং। একটা ছবি নানা অলঙ্কারে সেজে থাকা এক মহিলার। বাকি দুটো দুজন পুরুষের। একজন যুবক, অন্যজন বয়স্ক। তিনটি ছবি দেখেই বোঝা যায় এই মানুগুলি অভিজাত পরিবারের। কর্নেল আতস কাঁচের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–তিনটি ছবির চিত্রকর একজন সাহেব বলে মনে হচ্ছে। জড়ানো ইংরেজি হরফে লেখা আছে “আর মার্লিন’ বা মার্টিন। আমি বিখ্যাত চিত্রকরদের অনেকের নামই জানি না। তবে আমার কাছে বিদেশি চিত্রকরদের একটা এনসাইক্লোপিডিয়া আছে। সঠিক নামটা পেতেও পারি, কারণ দেখে তো মনে হচ্ছে এরা রাজা মহারাজা পরিবারের লোক। আর ছবিগুলোও আঁকা বহুবছর আগে।
মধুরবাবু বললেন,–এবার ছবির তলায় কিছু আছে নাকি দেখুন তো।
কর্নেল ছবি তিনটে টেবিলে রাখলেন তারপর ব্রিফকেসটা উপুড় করে ঝাড়বার ভঙ্গি করলেন। বললেন,–নাঃ, আর কিছু নেই।
আমি বললুম,–ওপরের ডালার ভেতরে একটা চেন দেখতে পাচ্ছি।
আমি আর কিছু বলার আগেই কর্নেল চেন টেনে ভেতর থেকে কতকগুলো নেমকার্ড বের করলেন। তারপর বললেন,–নানা জায়গার নানা লোকের নেমকার্ড। এদের কেউ-কেউ কোনও কোম্পানির লোক।
মধুরবাবুকে হতাশ দেখাচ্ছিল। তিনি বিস্ময়ের সুরে আস্তে বললেন,–এই তিনটে ছবির জন্য। বারিন অমন করে ভয় পেয়ে পালালই বা কেন? সে কি এই ছবিগুলোর জন্যই খুন হয়ে গেল? কর্নেলসাহেব আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে আপনিই এই অদ্ভুত ঘটনার পিছনে কী আছে তা জানতে পারবেন, কারণ আপনার পরিচয় আমি ভালোই জানি।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,–ঘটনাটা রহস্যজনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই রহস্য ফাঁস করতে হলে আপনার সাহায্য দরকার। একটা কথা আপনাকে খুলেই বলি, আপনি যদি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন তবেই আমার পক্ষে ঠিকভাবে হাঁটা সম্ভব হবে।
মধুরবাবু বললেন, আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। অবশ্য যদি এমন কোনও প্রশ্ন করেন যে বিষয়ে আমার জানা নেই তাহলে আমি ঠিক উত্তর দিতে পারব না।
এবার কে জানে কেন গোয়েন্দাপ্রবরের মুখে খি-খি হাসি শোনা গেল। তিনি বললেন,–এটা যে আদালতের ব্যাপার হইয়া গেল। যাহা বলিব সইত্য বলিব, মিথ্যা বলিব না।
কর্নেল হেসে উঠলেন। বললেন,–ঠিক ধরেছেন। যাইহোক, মধুরবাবু প্রথমে আপনি আমার এই প্রশ্নটার উত্তর দিন। বারিনবাবুর পুরো নাম কী? আর তার সঙ্গে কবে কোথায় কোন সূত্রে আপনার পরিচয় হয়েছিল?
