কর্নেল বললেন, আপনার হাতে যে ব্রিফকেসটা দেখছি, ওটা নিশ্চয়ই সেই ভদ্রলোকের ব্রিফকেস।
-ঠিক ধরেছেন। এটা আমার হাতে মানায় না। বেশ দামি ব্রিফকেস। বলে তিনি বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ কর্নেলকে দিলেন।
কর্নেল ভাঁজ খুলতে-খুলতে জিগ্যেস করলেন,–একটা কথা। ওই ব্রিফকেসটা কি আপনি খুলেছিলেন, বা খোলার চেষ্টা করেছিলেন?
মধুরবাবু বললেন,–আজ্ঞে না কর্নেলসাহেব। আপনি তো আমাকে ভালোই জানেন। আমি কী প্রকৃতির মানুষ। হ্যাঁ, বলতে পারেন, মানুষের স্বভাব বদলায়, কিন্তু আমি বদলাইনি। তা ছাড়া আমার একটা ভয়ই পিছু ছাড়ছে না। যদি ব্রিফকেসটা খুলতে গেলেই কোনও সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটে যায়। আপনি তো জানেন আজকাল সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিরা এভাবে বিস্ফোরণ ঘটায়।
হালদারমশাই কান খাড়া করে কথা শুনছিলেন। তিনি বলে উঠলেন,–হঃ, ঠিক কইসেন। ওটার মধ্যে সাংঘাতিক এক্সপ্লোসিভ কিছু থাকতেও পারে। আর একটা কথা কই আমি। চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করসি। তাই আমার সন্দেহ হইত্যাসে সেই ভদ্রলোক আপনার কোনও শত্রুর চর হইতেও পারে। কী কন কর্নেল স্যার!
কর্নেল কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ে মধুরবাবুর দিকে তাকালেন, এটা একটা চিঠি। দেখা যাচ্ছে সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ ‘বারিন’ বলে যিনি স্বাক্ষর করেছেন, তাকে কি আপনি একটুও চিনতে পারেননি?
–নাঃ এটাই আমার দুর্ভাগ্য। বারিনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা বছর দশেক আগে। সে যদুগড়ে তার ব্যবসার ব্যাপারে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। দৈবাৎ রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা হয়। তখন তার মুখে দাড়ি ছিল না। তাছাড়া গায়ের রং ছিল খুব ফরসা। দশ বছর পরে সে মুখে একরাশ গোঁফদাড়ি নিয়ে আমার পাশে বসলে আমার পক্ষে তাকে চেনা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
কর্নেল বললেন,–দ্যাখা যাচ্ছে সে আপনাকে চিনতে পেরেই আপনার কাছে এসে বসেছিল। বরং আমার অনুমান, তার কোনও শত্রু ওই সময়েই গঙ্গার ধারে তাকে ফলো করে আসছিল। তা ছাড়া চিঠি পড়ে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, সেই শত্রুর লক্ষ ছিল তাকে খুন করে ব্রিফকেসটা হাতানো। যাই হোক, চিঠির কথা পরে। এবার আপনি বলুন, তার অনুরোধমতো আপনি কী কাল সকালে তার ঠিকানায় ব্রিফকেসটা পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন।
–আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলুম আর শুনলুম—
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন,–বারিনবাবু তার ঘরে খুন হয়েছেন, তাই না? ..
মধুরবাবু দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। আত্মসম্বরণ করার পর তিনি ধরা গলায় বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে গিয়ে দেখি, একটা দোতলা বাড়ির সামনে পুলিশের কয়েকটা গাড়ি আর বাড়ির ভেতরে-বাইরে পুলিশ গিজগিজ করছে। আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন আগেই, কিন্তু কী ঘটেছে তা জানার জন্য একজন পান-সিগারেট বিক্রেতার কাছে একটা সিগারেট কিনলুম। তারপর তাকে জিগ্যেস করলুম, এখানে এত পুলিশ কেন দাদা? লোকটা বলল, ওই বাড়ির দোতলায় এক ভদ্রলোক থাকতেন। তাকে কে বা কারা গতরাত্তিরে কখন খুন করে গেছে। সকালে একটা হোটেল থেকে ওর জন্যে ব্রেকফাস্ট নিয়ে গিয়েছিল একটা লোক। সে দরজা বন্ধ দেখে ডাকাডাকি করে। কিন্তু সাড়া পায়নি। তারপর হঠাৎ তার চোখে পড়ে দরজার বাইরে চাপ-চাপ খানিকটা রক্তের ছোপ। অমনি সে হোটেলে খবর দেয়। তারপর পাড়ার লোকেরা জড়ো হয়, পুলিশ ডাকে।
মধুরবাবু দম নিয়ে বললেন,–কথাগুলি শোনামাত্র আমি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলুম। তারপর আমার দিদি নিরুপমাকে সব কথা খুলে বলেছিলুম। সে খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমাকে পুলিশের কাছে যেতে বারণ করেছিল। তার মতে পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করবে না, উলটে আমাকেই হয়তো খুনি সাব্যস্ত করবে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্রিফকেসে যদি চোরাই মাল থাকে? দিদির কথা শুনে আমি আর থানায় যাইনি। তারপর গত রাতে নানাকথা ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় আপনার কথা। আপনার নেমকার্ডটা আমি খুঁজে পাইনি। তাছাড়া দিদির বাড়িতে টেলিফোনও নেই। তাই সকাল হলে সোজা আপনার বাড়ি চলে এলুম। আপনার এ-বাড়িতে আমি একবার কুমারবাহাদুরের চিঠি নিয়ে এসেছিলুম, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তবে আপাতত একটা কাজ জরুরি বলে মনে হচ্ছে। কাজটা হল এই ব্রিফকেসটা খুলে ফেলা। চিন্তার কারণ নেই আমার কাছে মেটাল বা এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর যন্ত্র আছে।
বলে কর্নেল উঠে গেলেন। আমরা হতবাক হয়ে বসে রইলুম।
.
দুই
লক্ষ করছিলুম হালদারমশাইয়ের চোখদুটি যথারীতি গুলি-গুলি হয়ে উঠেছে এবং গোঁফের দুই সুচাল ডগা তিরতির করে কাঁপছে। তিনি আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, আমার বিশ্বাস ব্রিফকেসটার ভেতরে টাকাকড়ি কিংবা সোনাদানা আছে।
আমি কিছু বলার আগেই কর্নেল এসে ব্রিফকেসটার ওপর একটা ছোট্ট ডিটেকটর ছোঁয়ালেন। কোনও শব্দ শোনা গেল না। মধুরবাবুকেও উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন,–মেসিনটা দিয়ে কী বুঝলেন কর্নেলসাহেব?
কর্নেল দ্বিতীয় ডিটেকটরটা ব্রিফকেসের ওপর ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে হাসিমুখে বললেন, –আমাদের নিরাশ করল ব্রিফকেসটা। এতে বিস্ফোরকও নেই, আবার কোনো অস্ত্রশস্ত্রও নেই।
গোয়েন্দপ্রবর বলে উঠলেন, তা হলে আমি যা কইসিলাম জয়ন্তবাবুরে, তাই-ই সইত্য।
