কর্নেল হাসলেন,–হালদারমশাই কোনও মৃত মানুষের হাতের মুঠিতে আটকে থাকা কোনও জিনিস সহজে খুলে নেওয়া যায় না। আপনি তো এসময় পুলিশের চাকরি করেছেন, ওই সহজ কথাটা আপনার চোখ এড়িয়ে গেল কী করে?
অমনি হালদারমশাই নড়ে সিধে হয়ে বসলেন। তারপর কাঁচুমাচু হেসে বললেন,–হঃ, আমারই ভুল।
এবার আমি জিগ্যেস করলুম,–কর্নেল, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন খুনিই ওই চুলগুলো ইচ্ছে করে পুলিশকে মিস গাইড করার জন্য হাতে গুঁজে দিয়েছিল। তাই কি?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–এজন্যই তোমাকে বলি জয়ন্ত, তুমি বোঝে সবই, তবে দেরিতে।
এবার আমি খবরটা পড়ার জন্য হালদারমশাইয়ের কাছ থেকে কাগজটা নিলুম। হেডিংটা ছোট্ট ‘কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে রহস্যময় খুন’। খবরটা এক লাইন পড়েই বুঝতে পারলুম, ওটা আমাদের নতুন ক্রাইম রিপোর্টার দীপকেরই লেখা।
সবে দুটো লাইন পড়েছি, এমনসময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল অভ্যাসমতো হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–এবার দ্যাখেন কে আসে!
কথাটা শুনে বুঝতে পারলুম বরাবর যেমন হয়, কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রইংরুমে যখনই আমরা কোনও রহস্যময় ঘটনা নিয়ে আলোচনা করি, তখনই সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ-না-কেউ এসে পড়েন।
কিন্তু আমাদের নিরাশ করে ঘরে ঢুকলেন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের এক ভদ্রলোক। তার পরনে সাদা-সিধে ধুতি-পাঞ্জাবি। হাতে একটা বাদামি রঙের ব্রিফকেস। তিনি ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–কর্নেলসাহেব কি আমাকে চিনতে পারছেন?
কর্নেল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছিলেন। বললেন, আমি যদি ভুল না করি তাহলে আপনি যদুগড়ের মধুরবাবু।
ভদ্রলোক সোফায় বসে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনার স্মৃতিশক্তির ওপর আমার বিশ্বাস এখনও আছে। আপনি আমাকে ঠিক চিনেছেন। আমি যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার হতভাগ্য মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেই বটে।
লক্ষ করলুম কর্নেলের চোখে যেন বিস্ময় ফুটে উঠেছে। তিনি বললেন, আমি আপনাকে চিনেছি বটে, কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যে আপনার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর রুদ্রনারায়ণ রায় আপনাকে ‘বাবুর বাবু’ বলে পরিহাস করতেন, কারণ
আমিও দেখেছি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ বিলাসিতা ছিল। আপনার চেহারাতেও প্রাণবন্ত। ভাব ছিল। কিন্তু এখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি যেন দীর্ঘকাল রোগে ভুগেছেন।
মধুরবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার জীবনে এই তিনবছরে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। আমি যদুগড় ছেড়ে এসেছি তিন বছর আগে। কলকাতায় এক বিধবা দিদির কাছে বাস করছি। দিদির একটি মাত্র ছেলে। সে থাকে বোম্বেতে। যাই হোক, যেজন্যে আজ হঠাৎ আপনার কাছে এসে হাজির হয়েছি, তা বলি।
বলে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই, জয়ন্ত চৌধুরি, দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক, আর উনি প্রাইভেট ডেটেকটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার। তবে আমরা ওঁকে হালদারমশাই বলি।
মধুরবাবু এবং আমাদের মধ্যে নমস্কার বিনিময় হল। তারপর তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন,–আমার কথাগুলো গোপনীয়।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–যত গোপনীয়ই হোক, আপনি এদের সামনে স্বচ্ছন্দে খুলে বলতে পারেন। কারণ এরা দুজনেই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তবে আগে কফি খান। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। বলে কর্নেল হাঁক দিলেন,ষষ্ঠী, কফি কোথায়?
ঠিক সেই মুহূর্তেই কফির-ট্রে হাতে নিয়ে ষষ্ঠী ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ট্রে সেন্টার-টেবিলে রেখে নিঃশব্দে চলে গেল। আমি জানি কর্নেলের ঘরে নতুন কেউ এলেই ষষ্ঠী দ্রুত কফি তৈরি করে ফেলে।
মধুরবাবুকে কর্নেল এক পেয়ালা কফি তুলে দিলেন। তারপর নিজে এক পেয়ালা কফি তুলে নিয়ে বললেন,–মধুরবাবু, কুমারবাহাদুরের কোনও খবর রাখেন?
মধুরবাবু মাথা নেড়ে বললেন,–না। তবে কুমারবাহাদুরের মেয়ে বল্লরীকে আমি আমার দুঃখ জানিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলুম। বল্লরীকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলুম। সে আমাকে আগের মতোই আপনজন ভেবে চিঠির উত্তর দিয়েছিল। তার বাবা নাকি এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই প্রায়ই আমার কথা বলেন। বল্লরী রাগ করে বাবাকে আমার ঠিকানা দেয়নি। লিখেছিল,–কাকাবাবু আপনি এখানে ফিরে আসুন।
কফি শেষ করে মধুরবাবু বললেন,–এবার তা হলে ব্যাপারটা বলি।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন,–হাঁ বলুন।
মধুরবাবু আবার একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ঘটনাটা ভারি অদ্ভুত। গত পরশু, শুক্রবার বিকেলে অভ্যাস মতো আমি গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলুম। গঙ্গাদর্শনে আমার মন শান্ত হয়। তো আউটরাম ঘাটের দিকে একটা খালি বেঞ্চে বসে গঙ্গাদর্শন করছিলুম। রবিবার ছাড়া অন্যদিন গঙ্গার ধারে লোকজন কমই থাকে। কিছুক্ষণ পরে প্যান্টশার্ট পরা এক ভদ্রলোক বেঞ্চের অন্য কোণে এসে বসলেন। তাকে একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। এর কোনও কারণ ছিল তা নয়। বেড়াতে গিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। যদি দৈবাৎ ভদ্রলোক যেচে পড়ে কথা শুরু করেন সেই ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের মুখে একরাশ কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ, মাথায় তেমনই এলোমেলো একরাশ কাঁচাপাক চুল। প্যান্ট-শার্ট-জুতো অবশ্য বেশ পরিচ্ছন্ন। একটু পরে চোখের কোনা দিয়ে দেখলুম তিনি ব্রিফকেসের ওপর একটা কাগজ রেখে কিছু লিখছেন। লেখা শেষ হলে কাগজটা তিনি ভাঁজ করলেন। তারপর গঙ্গার দিকে আপন মনে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে সূর্য লাল হয়ে যখন অস্ত যাচ্ছে তখন লক্ষ করলুম তিনি ডানদিকে ঘুরে কী যেন দেখলেন। তারপর আমাকে ভীষণ অবাক করে বললেন,–কিছু যদি মনে করেন একটা অনুরোধ করব। আমি বললুম,–অনুরোধের কী আছে, বলুন। তিনি বললেন,–প্লিজ, আমার এই ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখুন। আর এই চিঠিটা পড়ে দেখুন। কথাটা বলেই তিনি ব্রিফকেসটা একরকম জোর করেই আমার দুই উরুর ওপর রেখে সেই ভাঁজকরা কাগজটা আমার বুক পকেটে গুঁজে দিলেন। তারপর সবেগে পিছনের রেললাইন ডিঙিয়ে তিনি গাছপালার আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। আমি তো ভীষণ হতবাক হয়ে গেছি। তারপর পকেট থেকে সেই ভাঁজ করা কাগজটা খুলে পড়তে-পড়তে আমার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে গেল। কাগজটা আপনাকে দেখাচ্ছি।
