একটু থমকে দাঁড়ালেন চণ্ডীবাবু ও হালদারমশাই। তারপর বেপরোয়া ভঙ্গিতে কিচেনে গিয়ে ঢুকলেন। বললুম, “কর্নেল, আপনার ইচ্ছেই পূর্ণ হল তাহলে! রাত বারোটায় পরোটা আর বেগুনভাজা। খাসা। কিন্তু শেয়ালের ডাক শুনে মনে হচ্ছে আরেকজন গেস্ট আসছেন হয়তো!”
তারপরই হঠাৎ বাইরে ফান্টুর চিৎকার শোনা গেল। “মামা মামা!”
সব্বাই বেরিয়ে গেলাম। দণ্ডীবাবু হাঁক দিলেন, কী হয়েছে রে?
বেগুনখেতের দিকে হাত তুলে আবার বলল, “কাকতাড়ুয়াটা আবার নাচছে–ওই দ্যাখো।”
চমকে উঠতেই হল। জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যাছে, কাকতাড়ুয়া দু’হাত ছড়িয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে। দণ্ডীবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, বন্দুক! বন্দুক! বন্দুক নিয়ে আয় ফান্টু!”
অমনি কাকতাড়ুয়া পদ্যে বলে উঠল :
বেগুনখেতে কাকতাড়ুয়া
নিশুত রেতে নাচ করে
ডাকে শেয়াল কেয়া হুয়া
ভূরিভোজন আঁচ করে
দণ্ডীভায় এ কী বিচার
করবে গুলি বন্দুকে
উপকারী বন্ধুকে?
দণ্ডীবাবু সহাস্যে বললেন, “ভাণ্ডারীভায়া নাকি? আরে, এসো, এসো! সুস্বাগতম! তবে এ কেমন আসা হে? বেগুনখেতে বড্ড কাটা। জামাকাপড় আটকে ফর্দাফাই হয়ে যাবে যে!”
কবি নন্দলাল ভাণ্ডারী কাকতাড়ুয়াটির আড়াল থেকে বেরোলেন।
না, বেরোলেন বলা ভুল হচ্ছে। দেখা দিলেন। তারপরই আর্তনাদ করলেন,
“ওরে ওরে ফান্টা
সত্যিই কাটা রে
আগে কে জানত
শেয়ালের ফাঁদ তো
হয় এইরকমই
কণ্টকে জখমই
আঃ উঃ বাবা রে
বাঁচা রে বাঁচা রে
ফান্টু কাটারি এনে উদ্ধার করতে গেল তাঁকে। হালদারমশাই ক্রমাগত খি-খি-খি-খি করছিলেন। শেষে বললেন, “কী কাণ্ড! বাইগনখ্যাতখান এক্কেরে লণ্ডভণ্ড!”
বললুম, “সাবধান হালদারমশাই! আবার আপনাকে পদ্যে পেয়েছে।”
অমনি হালদারমশাই গম্ভীর হয়ে বললেন, “না, না। কথার কথা!”
৩.০৮ রাজবাড়ির চিত্ররহস্য
প্রাইভেট ডিকেটিভ কে. কে. হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন,–খাইসে!
জিগ্যেস করলুন,কী হল হালদারমশাই?
হালদারমশাই একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে নোংরা রুমালে নাক মুছলেন। তারপর বললেন, জয়ন্তবাবুরে একখান কথা জিগাই।
-বলুন হালদারমশাই।
গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন,–আপনাগো কাগজে আইজ দুইখান মার্ডারের খবর লিখসে।
–তাতে কী হয়েছে? কোথাও মার্ডার হয়েছে, তাই খবর লেখা হয়েছে।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একখান মার্ডার তেমন কিসু না। ভিটিম চায়ের দোকানে বইসা চা। খাইত্যাছিল, কারা তারে বোম মারসে। কিন্তু আর একখান মার্ডার হইসে এক্কেরে ঘরের মধ্যে। ভিকটিমের মাথায় গুলি করসে খুনি। ভিকটিম তখন দরজার কাছাকাছি মেঝের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়সে। কিন্তু তার ডাইন হাতের মুঠায় একগোছা কঁচাপাকা চুল।
এবার একটু কৌতূহলি হয়ে বললুম-তা হলে বোঝা যাচ্ছে ভিকটিম খুনির মাথার চুল উপড়ে নিয়েছে।
হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন,–প্রথম কথা, দরজা বন্ধ ছিল। পুলিশ দরজা ভাইঙা ওই অবস্থায় ভিকটিমরে দেখসে। কিন্তু এমন একখান হেভি মিস্ত্রির খবর আপনাগো কাগজে এইটুকখান কইরা ছাপসে। ওদিক প্রথমে যে মার্ডারের কথা কইলাম, সেইখবর ছাপসে বড় কইরা প্রথম পাতায়। ক্যান?
আমি আমাদের কাগজ মন দিয়ে পড়ি না। তা ছাড়া কাল শনিবার আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসেও যাইনি। হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে বললাম,–এমন হতে পারে প্রথম পাতার ভিকটিম একজন ভি.আই.পি। আর দ্বিতীয় খবরটা হয়তো দেরিতে পাওয়া গিয়েছিল। তখন কাগজে যেটুকু জায়গা ছিল, খবরটা কাটছাঁট করে কোনওরকমে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নাইট এডিটর।
হালদারমশাই তেমনই উত্তেজিতভাবে বললেন,–নাইট এডিটর ঠিক করেন নাই। অমন হেভি মিস্ত্রি! ভিকটিমের হাতের মুঠোয় খুনির চুল! তারপর আরও হেভি মিস্ত্রি, দরজা যখন বন্ধ ছিল তখন খুনি পলাইল কোন পথে?
কর্নেল তার টাইপরাইটারে সম্ভবত প্রজাপতি, অর্কিড বা দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির পাখি নিয়ে প্রবন্ধ লিখছিলেন। এতক্ষণে তার কাজ শেষ হল। তারপর টাইপ করা কাগজগুলো গুছিয়ে ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন। এবং বললেন,–হালদারমশাই, খবরটা ছোট করে লেখা হলেও আপনি কয়েকটা পয়েন্ট মিস করেছেন।
-মিস করসি? কী মিস করসি কন তো কর্নেল স্যার।
কর্নেল টাইপরাইটারের কাছ থেকে উঠে এসে আমাদের কাছাকাছি তার ইজিচেয়ারে বসলেন। তারপর চুরুট ধরিয়ে বললেন,–একটা লাইন আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে। দরজার ল্যাচ-কি ছিল। তার মানে কেউ ঘরের ভেতর থেকে ল্যাচ-কি তে চাপ দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাইরে থেকে আর খোলা যায় না। আমার অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার দরজা কী আপনি লক্ষ করেননি? হা
লদারমশাই বলে উঠলেন,–হঃ! আপনি ঠিক কইসেন।
বলে তিনি আবার সেই অংশটা পড়ার জন্য কাগজটা তুলে নিলেন। তারপর যথারীতি বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ হলে তিনি বললেন,–আর কী মিস করসি বুঝলাম না।
কর্নেল বললেন,–ভিকটিমের মুঠোয় ধরা পঁচাপাকা চুলের গোছা উল্লেখ করে খবরে লেখা হয়েছে, চুলগুলো পুলিশ সহজেই টেনে বের করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।
হালদারমশাই বললেন,–ওই লাইনটা আমি মিস করি নাই কর্নেল স্যার! ওই চুল তো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোই লাগবো।
