কাঁটায় কাঁটায় রাত বারোটা
বেগুনভাজা আর পরোটা
কিংবা লুচি অর্ধডজন
ইচ্ছে হয় করি ভোজন
দিচ্ছে কেডা
রাত বারোটায়
হালদারমশাই খি-খি সহযোগে বললেন, “খাইছে! পোইদ্যে পাইছে!”
বললুম, “আপনাকেও, হালদারমশাই! পদ্যে পেয়েছে। সাবধান!”
হালদারমশাই সম্ভবত সাবধানতাবশেই চুপ করে গেলেন। পদ্যের সঙ্গে পিশাচ ও শেয়ালের সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন উনি। পিশাচ যদি বা সাজতে পারেন, শেয়ালের ডাক ডাকতে পারবেন কি না সন্দেহ আছে!
.
ছয়
দণ্ডীবাবু ঘরের ভেতর তক্তপোশের বিছানায় সত্যিই কম্বল মুড়ি দিয়ে বসেছিলেন। আমাদের দেখে করুণ মুখে বললেন, “আসুন, আসুন! ফান্টুর মুখে সব শুনলুম। শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে। ওই চণ্ডীপাষণ্ড ষণ্ড, ভণ্ড আমার মাসতুতো ভাই! আমাকে ফাসাবার কী ষড়যন্ত্র করেছিল, দেখুন! তারপর লোকে বলত, চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই! উঃ কী সাঘাতিক ঘটনা!”
দেখলুম, বারান্দার বেতের চেয়ারগুলো ঘরে ঢোকানো হয়েছে এবং তা আমাদেরই খাতির করে বসতে দেওয়ার জন্যে তো বটেই! আমরা বসলুম। হালদারমশাই বললেন, “দণ্ডীবাবু, কর্নেল স্যারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই! ইনি–”
কথা কেড়ে দণ্ডীবাবু বললেন, “কী আশ্চর্য, শ্মশানে ইনিই আমার বাঁধন খুলে দিলেন মনে পড়ছে, দাড়ি দেখেই চিনতে পারছি। নমস্কার স্যার, নমস্কার! বুঝতেই পারছেন, ওই অবস্থায় শত্রু-মিত্র চেনা কঠিন। আমি ভাবলুম, পিশাচবাবার চেলা-টেলা হবে। পিশাচ বাবার খাওয়াদাওয়ার সুবিধে করে দিচ্ছে।” বলে সেই অদ্ভুত ‘ফাঁচ’ শব্দটি বের করলেন মুখ থেকে। অর্থাৎ দুর্লভ হাসিটি হাসলেন।
হালদারমশাই বললেন, “ইনি স্বনামধন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমার গুরুদেব কইতে পারেন এনারে। ইনি না আইয়া পড়লে কী যে হইত, কওন যায় না।”
আবেগে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “অমন করে জলে ঝাঁপ দেওয়া উচিত হয়নি দণ্ডীবাবু! আপনি বিচক্ষণ মানুষ। ভাল করে তাকিয়ে দেখবেন তো?”
দণ্ডীবাবু বললেন, “ওই যে বললুম, শত্রু-মিত্র চেনার অবস্থা ছিল না। গেলুম জয়ন্তবাবুকে খুঁজতে, আর আচমকা কারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পিছমোড়া করে বাঁধল। তারপর চ্যাংদোলা করে তুলে হরি বোল বলতে-বলতে শ্মশানে ফেলে পালিয়ে গেল। এদিকে ইদানীং পিশাচবাবার গল্পটা প্রচণ্ড রটেছিল। আপনি আমার বাঁধন খুলছেন, তখন সাক্ষাৎ পিশাচবাবা এসে আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আচে। হাঁউ মাউ খাউ করে হুঙ্কারও দিচ্ছে। ওই অবস্থায় জলে ঝপ না দিয়ে উপায় কী, বলুন স্যার?”
কর্নেল বললেন, “যাই হোক, গতস্য শোচনা নাস্তি। আমার কিছু প্রশ্ন আছে, দণ্ডীবাবু।
“বলুন, বলুন!”
“আপনার ফার্মে পপিফুলের খেতটা যে আসলে ওপিয়াম পপির খেত সেটা কি আপনি জানতেন না?”
“বিশ্বাস করুন। ওপিয়াম কী থেকে হয়, আমি জানতুম না। একটু আগে ফান্টু সব বলে গেল। আমি জানতুম ফুল, তো ফুল! পপিফুল! ফান্টুর ফুলের বড্ড শখ। চণ্ডী যে সেই সুযোগ নেবে, কে জানত! গত অক্টোবরে চণ্ডী নিজের হাতে একটা বীজের প্যাকেট দিয়ে গেল। বলল, “ফান্টুকে দিও। এগুলো পপিফুলের বীজ। দারুণ ফুল ফুটবে। গন্ধে মউমউ করবে। বদমাস! জোচ্চোর! পরের হাতে হুঁকো খাওয়ার ফন্দিটা কেমন দেখুন?”
“ইদানীং আপনি ফার্মে এসে রাত্রিবাস করছিলেন কেন, দণ্ডীবাবু?”
দণ্ডীবাবু একটু চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে শ্বাস ফেলে বললেন, “সারাটা দিন আড়তে কাজ-কারবারে ব্যস্ত থাকি। বড্ড একঘেয়ে লাগে। ছেলেমেয়েও নেই বাড়িতে, শুধু গিন্নি আর আমি। তাই অনাথ ভাগনেটাকে এনে রেখেছিলুম। সে থাকে ফার্মে। ছেলেমানুষ তো! রাতবিরেতে কী হয়, যা অবস্থা আজকাল! এও একটা কথা। তবে আরেকটা কথা হল, খটকা।”
“কীসের খটকা?”
ফান্টু বলেছিল, চণ্ডী আজকাল প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে ফার্মে আসে। বুঝুন ব্যাপারটা। কোথায় ঔরঙ্গাবাদ, আর কোথায় কাটরার মাঠ! চণ্ডী আসে, অথচ আমার সঙ্গে দেখা করে যায় না। তার চেয়ে বড় কথা, সন্ধ্যাবেলায় কেন? ফান্টুটার এগ্রিকালচারে মাথা আছে। আর সব ব্যাপারে আস্ত বোকা। এদিকে চণ্ডী লোক ভাল নয়। কাজেই খটকা লেগেছিল। সন্ধ্যার আগেই ফার্মে এতে রাত কাটাতে শুরু করলুম। ব্যস! কাকতাড়ুয়া নাচিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর খেলা আরম্ভ হল।”
ফান্টু এসে গেল। বড় করে হেসে বলল, “জ্বালিয়ে দিয়েছি মামা। ফিনিশ!”
চণ্ডীবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। “গেস্টদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ফান্টু! অনেক রাত হয়ে গেছে।”
ফান্টু বলল, “মুকুন্দদা রান্না করে রেখেছে মামা!”
চণ্ডীবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “চোর! চোর! চোরদের রান্না গেস্টদের খাওয়াব কী রে হাঁদারাম! তা ছাড়া তুই তো বললি, খাবারে আফিমের রস মিশিয়ে দেবার চক্রান্ত করছিল। কাল সকালে সব খাবার শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসব। মড়াখেকো শেয়াল-কুকুরের পেটে যাক। তুই এক কাজ কর বরং। বেগুনখেতে যা। বেগুন নিয়ে আয়। আমি ময়দা ছেনে পরোটা বানাচ্ছি। লুচি করতে হলে রাত পুইয়ে যাবে। তার চেয়ে পরোটা ইজ ইজি। কী বলেন স্যার? কর্নেল সায় দিলেন। হালদারমশাই উৎসাহে দাঁড়ালেন। তারপর “চলুন, আমিও হাত লাগাই” বলে পা বাড়িয়েছেন এমন সময় বাইরে কাছেই শেয়াল ডেকে উঠল, “হেয়ো হোয়া হোয়া!”
