চণ্ডীবাবুর বন্দুক রমজানের কাঁধে। সে আর মুকুন্দ আমাদের দিকে, চণ্ডীবাবু উল্টোদিকে সবে কয়েক-পা হেঁটেছেন, অমনি কোথাও একটা অমানুষিক গর্জন শোনা গেল। কতকটা এইরকম, “খ্রাঁ-ও-ও! খ্রাঁ -ও-ও! খ্রাঁ -ও!”
তারপর চণ্ডীবাবুর সামনাসামনি ঝোঁপ ফুড়ে কালো একটা মূর্তি বেরোল। চণ্ডীবাবু টর্চ জ্বেলেই “বাবা রে” বলে আর্তনাদ করে উঠলেন। টর্চটা বোধ করি আতঙ্কের চোটে হাত থেকে পড়ে নিবে গেল। কিন্তু ওই এক পলকের আলোয় দেখতে পেলুম দু’ঠেঙে কালো গরিলার মতো একটি প্রাণীকে। ভয়ঙ্কর মুখ থেকে সাদা দুটো কষদাঁত বেরিয়ে আছে। দু’হাতে বড়-বড় নখ।
ফান্টু আমাকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করল, “পিশাচবাবা। পিশাচবাবা!”
রমজান ও মুকুন্দের এক-গলায় আর্তনাদ শুনলুম। তারপর তারা দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়েই পালিয়ে গেল। চণ্ডীবাবু পালাতে যাচ্ছেন, সেই সময় চালাঘরের পেছন থেকে কেউ এসে তাকে জাপটে ধরল। জ্যোৎস্নায় আবছা যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, তাতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ধস্তাধস্তি বেধেছে মনে হচ্ছে। তারপরেই, কী আশ্চর্য, কর্নেলের গলা শুনতে পেলুম, “হালদারমশাই, চালাঘরের আলোটা জ্বেলে দিন! শিগগির।”
আলো জ্বলল।
কর্নেলকে দেখলুম, সবে ধরাশায়ী দশা থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। টুপিটা পড়ে গেছে। টাক ঝকমক করছে। চণ্ডীবাবু অদৃশ্য। হাত ফসকে পালিয়ে গেছেন বোঝা গেল।
পিশাচবাবা দাঁড়িয়ে আছে। আলখাল্লা ও জটাজুটধারী হালদারমশাই চালাঘর থেকে নেমে খি-খি-খি-খি করলে। পিশাচবাবার ভয়ঙ্কর মুখ থেকে মানুষের ভাষায় পদ্য বেরোল, সঙ্গে ফোঁস করে একটি দীর্ঘশ্বাস।
গঙ্গায় দিল দণ্ডী ঝম্প
চণ্ডীও দিল লম্বা লম্ফ।।
পদ্য শুনেই ফান্টু লাফিয়ে উঠল এবং ‘মাস্টারমশাই’ বলে চিকুর ছেড়ে দৌড়ে গেল।
আমিও গেলুম। ভয়ঙ্কর মুখোশ এবং কালো কাপড়ে তৈরি মনুষ্যাকৃতি খোলসের টিপ-বোতাম পুট পুট করে খুলে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন কবি নন্দলাল ভাণ্ডারী। সহাস্যে ফান্টুকে বললেন,
ওরে বাবা ফান্টুস
একটুকু চাই হুঁশ
বললেও ইঙ্গিতে
পারিসনি বুঝে নিতে
মামা এনে দিল বীজ
যত্ন করে চষেছিস
জানিস এইগুলো কী
ওপিয়াম পপি রে!
বলে পায়ের কাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে ফেললেন। ফান্টু বলল, এগুলো তো ফুল মাস্টারমশাই, পপিফুল!”
কবি ভাণ্ডারীমশাই চটে গেলেন।
এই দ্যাখো ছেলেটা
কী যে ভেলভেলেটা
বোঝালেও বোঝে ভুল
বলে কিনা পপিফুল!
ফান্টু অবাক হয়ে বলল, “তা হলে কী এগুলো?”
ভাণ্ডারীমশাই বললেন,
শোন্ তবে আগাগোড়া
সব সাপ নয়, ঢোঁড়া
কোনওটার থাকে বিষ
এইবার বুঝেছিস
এই পপি ডেঞ্জারাস
আফিং এরই নির্যাস।”
ফান্টু একটু গুম হয়ে থাকার পর বলল, হু, বুঝেছি। তাই মুকুন্দদা রমজানদা গাছগুলোর ডগা চিরে রাখত। রস বেরিয়ে আঠার মতো জমে থাকত আর ওরা চুপিচুপি রাত্তিরে এসে সেগুলো খুলে নিয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরত। আমাকে বলত, মামাকে যেন না বলি। আমি অত কি জানি, বলুন
ভাণ্ডারীমশাই তাঁর পৈশাচিক ছদ্মবেশ গুটিয়ে পুঁটলি বানালেন এবং সেটি বগলদাবা করে বললেন,
ওরে সোনা গুড বয়
করে ফ্যাল ডেস্ট্রয়
বিলম্ব নয় বাপ
হাতে দেবে হ্যান্ডকাপ
আবগারি দারোগা
তব তেরা ক্যা হোগা
ব্রিং সাম গুড বিষ
আভি করে দে ফিনিশ।।
ফান্টু বলল, “এখনই বিষ স্প্রে করে দিচ্ছি। কর্নেল বললেন, আসুন নন্দবাবু, ফান্টু ওপিয়াম পপি জ্বালিয়ে দিক। আমরা ফার্মহাউসে গিয়ে দেখি, দণ্ডীবাবু সাঁতার কেটে ফিরতে পারলেন নাকি!”
ভাণ্ডারীমশাই হাই তুলে বললেন,
রাত নিঝুম
পাচ্ছে ঘুম
উঠছে হাই
ডেরায় যাই।।
তারপর সটান ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। জ্যোৎস্নায় তার ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পরে শেয়ালের ডাক শোনা গেল! সেদিকে। অদ্ভুত মানুষ!
হালদারমশাই ততক্ষণে চালাঘরে গিয়ে ছদ্মবেশ ছেড়েছেন এবং সেটি তিনিও পুটুলি বানিয়ে বগলদাবা করে বেরোলেন। প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গোটানো ছিল। বোঝা গেল, আলখাল্লার ভেতর প্যান্ট-শার্ট পরেই ছিলেন। অবশ্য পা-দুটো খালি। বললেন “কী কাণ্ড! পোইদ্যের লগে পিশাচ আর শৃগালের সম্পর্ক আছে শুনি নাই। এক্কেরে শৃগালের ডাক!”
বললুম, “উনি শেয়াল ডাকতে পারেন নাকি?”
“ওই তো ডাকছেন! শুনছেন না?”
কর্নেল বললেন, “আমার টর্চটা খুঁজে বের করতে হবে। দণ্ডীবাবুর বন্দুকটাও।”
খোঁজাখুঁজি করতে করতে ফান্টু এসে পড়ল। হাতে স্প্রে। হাসতে-হাসতে বলল, “ওদিকে এক কাণ্ড। বড়মামা এসে গেছেন। কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। বললেন, গঙ্গাস্নান করে এলুম। আমি তো জানি, পিশাচবাবার ভয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন! বলতে গেলে রেগে যাবেন। তাই সে-কথা বললুম না। তবে পপিফুলের ব্যাপারটা আর যা-যা হয়েছে এখানে, সব বলেছি। শুনে মামা হতভম্ব।”
বললুম, “তোমার মামা জানেন না এগুলো আফিংগাছ!”
ফান্টু বলল, “না। বড়মামাকে তো চণ্ডীমামা–মানে, ছোটমামা ফুলের বীজ বলে কোত্থেকে এনে দিয়েছিলেন! বড়মামা আপনাদের জন্য ওয়েট করছেন। শিগগির যান। মামার অবস্থা শোচনীয়। কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকলে কী হবে? রাত্তিরে গঙ্গার জল যা ঠাণ্ডা!”
কর্নেল টর্চ খুঁজে পেলেন। তারপর বন্দুকটাও পাওয়া গেল। হালদারমশাই বন্দুক কাঁধে এবং পুটুলি বগলদাবা করে মার্চের ভঙ্গিতে পা বাড়ালেন। কর্নেল হাঁটতে-হাঁটতে বললেন,
