ফান্টু চলে গেল কিচেনের দিকে। চণ্ডীবাবু গুলিশূন্য বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে বললেন, “খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ুন স্যার। আমি তুলোদাকে খুঁজে নিয়ে আসি। মাঠে তুলকালাম করে বেড়াচ্ছে হয়তো!”
চণ্ডীবাবু চলে গেলেন গেটের দিকে। একটু পরে ফান্টু ফিরে এসে বলল, “রিপোর্টারদা, ওরা নেই। না মুকুন্দদা, না রমজানদা!” সে একটু রাগ করেছে বোঝা যাচ্ছিল। ফের বলল, “বড়মামা আসুন, এবার সব বলে দেব।”
“কী বলে দেবে ফান্টু!”
ফান্টু পাচার মতো মুখ করে বলল, “ওরা বোজ রাত্তিরে চুপিচুপি কোথায় যায়! আমাকে বলতে বারণ করছিল, তাই বলিনি মামাকে। এবার দেখছি বলতেই হবে।”
একটু অবাক হয়ে বললুম, “তা হলে ওরা সত্যি গাঁজা খেয়ে মড়ার মতো ঘুমিয়ে থাকে না বলছ?”
“হ্যাঁ!” বলে ফান্টু হাই তুলল। “চলুন রিপোর্টারদা, আমরা খেয়ে নিই।”
“তোমার মামারা ফিরে আসুন। একসঙ্গে খাব বরং।”
ফান্টু হঠাৎ হাসল। “তা হলে চলুন রিপোর্টারদা, প্রিন্স অ্যালবার্টকে দেখে আসি। একা যেতে ভয় করছে। আজ রাতে বড্ড বেশি শেয়াল ডাকছে। শেয়াল ডাকলেই বুঝতে পারি পিশাচবাবা বেরিয়েছে।”
ফার্মহাউসের পাশ দিয়ে একফালি পায়ে চলা রাস্তা। কয়েক পা এগিয়ে সে থমকে দাঁড়াল। বললুম, “কী হল?”
ফান্টু বলল, “টর্চ? আমার টর্চটা বড়মামা নিয়ে গেছেন। আপনার কাছে টর্চ নেই?”
“ছিল,” বলতে গিয়ে সামলে নিলুম। কারণ, তা হলে ওকে সব কথা খুলে বলতে হয়। বলার মুড নেই। তাই বললুম, “নেই।”
“নার্সারির ওখানে একটা চালাঘর আছে। আলোটা জ্বেলে দেব, চলুন। একটু দূরে অবশ্যি–তা হলেও দেখা যাবে।” বলে ফান্টু হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকল। ওর সঙ্গ ধরতে বারকতক পা হড়কে আছাড় খাওয়ার উপক্রম। তারপর সামনের দিকে গমখেত পড়ল। আঁকাবাঁকা আলপথে অনেকটা যাওয়ার পর ফান্টু বলল, “নার্সারির এরিয়ায় এসে গেছি রিপোর্টারদা! এই দেখুন, কতরকম ক্যাকটাস, পাতাবাহার আর ঝাউ লাগিয়েছি। ওইখানে গোলাপবাগান। পাঁচ রকমের গোলাপ আছে। প্রিন্স অ্যালবার্ট”।
ফান্টু থেমে গেল। খানিকটা দূরে হঠাৎ আলো জ্বলল। বিদ্যুতের আলো। সেই আলোয় দেখলুম, চণ্ডীবাবু একটা চালাঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে মুকুন্দ ও রমজানের সঙ্গে কথা বলছেন। ফান্টু খুব অবাক হয়ে বলল, “ছোটমামা ওখানে কী করছেন?”
সে দৌড়তে যাচ্ছিল, টেনে ধরে আটকে দিলুম। বললুম, “চুপ! বরং দু’জনে আড়ালে গিয়ে ব্যাপারটা বুঝে নিই, চলো!”
ফান্টুর মনে ধরল কথাটা। ঝাউ, ক্যাকটাস, পাতাবাহারের ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে কাছাকাছি এক জায়গায় বসে পড়লুম। হাত-বিশেক দূরে চালাঘরটা, সবকিছুই দেখা ও শোনা যাচ্ছে। চণ্ডীবাবু দুটো ছোট্ট প্লাস্টিকের থলে পাঞ্জাবির দুই পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, “বন্দুকটা তুলোদার ঘরে রেখে দিয়ে যাও! আর এই নাও, পাঁচ টাকা করে বাড়িয়েই দিলুম।”
রমজান ও মুকুন্দ টাকাগুলো পকেটে ঢোকাল। তারপর মুকুন্দ ফিক করে হেসে বলল, “পিশাচবাবা এতক্ষণ দণ্ডী-স্যারের হাড় চুষছে। খুব রাগী লোকের হাড়ে টক-ঝালটা বড্ড বেশি থাকে।”
চণ্ডীবাবুও ভুড়ি নাচিয়ে হাসলেন। রমজান বলল, “কাগজের বাবুটিকে আমার কেমন সন্দেহ হয়। বাবুমশাই।”
চণ্ডীবাবু বললেন, “ঠিক বলেছ হে! শ্মশান থেকে দিব্যি ফেরত এল দেখে আমি তো তাজ্জব! পিশাচবাবা ওকে খেল না কেন? তা ছাড়া বাঁধন খুলে পালিয়ে এল কী করে?”
মুকুন্দ বলল, “আপনার লোকগুলো কোনও কম্মের নয়। বরাবর দেখে আসছি, সবতাতেই বড্ড তাড়াহুড়ো করে। কাকতাড়ুয়া নাচাতে গিয়ে গুলি খেয়ে রক্তারক্তি হল।”
“ধুস, রক্ত নয়, কুমকুমের ছোপ।” চণ্ডীবাবু মুখ বাঁকা করে বললেন।”ওদিন দোলপূর্ণিমা ছিল! হোলির কুমকুম-পটকা। বোটা অতি চালাক। কে ওকে বলেছিল, কাকতাড়ুয়ার গলায় কুমকুম-পটকা বাঁধতে? জানা কথা, তুলোদা আগের রাত্তিরের মতো মুণ্ডু তাক করেই গুলি ছুঁড়বে। হাঁদারাম!”
মুকুন্দ ও রমজান বেজায় হাসতে লাগল। মুকুন্দ বলল, “তাই বলুন! পটকা ফেটে রঙবেরঙ!”
চণ্ডীবাবু বললেন, “রঙবেরঙ করতে গিয়ে আমাকেও বিপদে ফেলেছিল আর কি! তুলোদার তো হাড়ে-হাড়ে বুদ্ধি। কলকাতা থেকে গোয়েন্দা এনে–যাকগে, আলো নেবাও। আর শোনো, গোয়েন্দাবাবু তো পিশাচবাবার পেটে গেছে। কাগজের বাবুটিকেও ফের শ্মশানে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। বেন্দার দল তোমাদের হেল্প করবে।”
রমজান বলল, “এক কাজ করা যাক। কাগজবাবুর খাবারে আফিমের রস মিশিয়ে দিলেই, ব্যস, মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়বে। তখন ওকে চ্যাংদোলা করে শ্মশানে রেখে আসা যাবে।”
মুকুন্দ সায় দিয়ে বলল, “পিশাচবাবার শেষরাত্তিরে নিশ্চয় খিদে পাবে! তখন ওকে খাবে।”
কথাগুলো শুনে শিউরে উঠেছিলুম। ফান্টু আমাকে চিমটি কাটলে ফিসফিসিয়ে বললুম, “চুপ।”
আলো নিবে গেল। তারপর কাছেই কোথাও শেয়ালের ডাক শোনা গেল। চণ্ডীবাবু চালাঘর থেকে নেমে জ্যোৎস্নায় দাঁড়ালেন। বললেন, “ফার্মের জমি তুলোদা ফান্টুর নামে উইল করে রেখেছে। ফান্টু তো আমারও ভাগনে। আশা করি, বেগড়বাঁই করবে না।”
“মুকুন্দ বলল, না, না। ফান্টু তো জানেই না কীসের চাষ করছে! চণ্ডী-স্যার বীজ এনে দিতেই সয়েল টেস্ট করে কতরকমের সার দিয়ে ফুলে ফুলে ছয়লাপ করে দিয়েছে। মাথা আছে বটে!”
