হালদারমশাই বললেন, “জিনিয়াস ছেলেটার হাতে ভূতের হুঁকো খাওয়ার কথা বললেন পোয়েটমশাই। বড়ই রহস্যজনক! কর্নেল স্যার কি কিছু কু পেলেন?”
“কীসের?” কর্নেল আনমনে জবাব দিলেন। কারণ তিনি যেন কিছু শোনার চেষ্টা করছিলেন।
হালদারমশাই বললেন, “হুঁকোর।”
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছেন। সেই সময় শেয়ালের ডাক শোনা গেল। অমনি উঠে দাঁড়ালেন। “ইফ দ্য জ্যাক্স হাউলস/ সামথিং ইজ ফাউল” বলে বেরিয়ে গেলেন। প্রায় দৌড়েই গেলেন বলা উচিত।
হালদারমশাই বলে উঠলেন, “খাইছে! পোইদ্য। বুঝলেন না? পোইদ্য–পইট্টি! কর্নেলসারেরে খাইছে!” ওই-কারের মতো একটা আঙুল উঁচিয়ে ধরলেন গোয়েন্দাবর। তারপর গেরুয়া আলখাল্লার ভেতর থেকে নস্যির কৌটো বের করে নস্যি নিলেন। শেয়ালটা থেমে গেল হঠাৎ। তার একটু পরে বন্দুকের গুলির শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। পরপর দু’বার। হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন। এখানে বসে থাকার মানে হয় না আর। চলুন জয়ন্তবাবু, কী ঘটছে দেখে আসি!” বলে আমাকে টেনে ওঠালেন।
সেই গড়খাই পেরিয়ে মাঠে পৌঁছানোর পর শ্মশানের দিক থেকে হরিধ্বনির শব্দ ভেসে এল। অমনি হালদারমশাই দম-আটকানো গলায় বললেন, “আবার কারে বাঁধল?”
বলে আচমকা টাট্ট ঘোড়ার মতো গমখেত ভেঙে উধাও হয়ে গেলেন। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। তারপর গা ছমছম করতে থাকল। জ্যোৎস্নার রাতে কাটরার মাঠে একা পড়ে গিয়ে এখন প্রতি মুহূর্তে ভয়, হুঁ–সেই নরমাংসভোজী পিশাচবাবারই! কে জানে, সামনে বা পেছনে কোনও গর্ত থেকে বা ঝোঁপঝাড় ফুঁড়ে আবির্ভূত হলেই গেছি।
দণ্ডীবাবুর ফার্মটা কোনদিকে ঠাহর করার চেষ্টা করলুম। বাঁ দিকে একটু দূরে বিদ্যুতের আলো জুলজুল করছে। ওইটেই হবে। মরিয়া হয়ে সেইদিকে নাক-বরাবর হাঁটতে থাকলুম।
.
পাঁচ
ফার্মহাউস এলাকা একেবারে সুনসান নিশুতি। বেগুনখেতে কালো হয়ে কাকতাড়ুয়াটি দাঁড়িয়ে আছে। মড়ার খুলি এমনিতেই দেখতে বিটকেল, তার ওপর সময়টা এরকম। শেয়ালের ডাক শুনে কর্নেলের দৌড় এবং শ্মশানের হরিধ্বনি শুনে ডিটেকটিভদ্রলোকের নিমেষে অন্তর্ধান, ওদিকে। নরমাংসভোজী পিশাচবাবার ব্যাপারটাও কম সাঙ্ঘাতিক নয়। কাজেই কাকতাড়ুয়াটির দিকে এখন তাকানো উচিত।
খোলা বারান্দায় ফান্টু দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে গল্প করছিল, তার হাতে দোনলা বন্দুক। সেই বন্দুকটাই হবে। কিন্তু ইনি তো দণ্ডীবাবু নন, তার বিপরীত। নাদুস, নুদুস, বেঁটে। মুখের ভাব অমায়িক। প্রথমে ফান্টুই আমাকে দেখতে পেল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “রিপোর্টারদা, কোথায় গিয়েছিলেন হঠাৎ? আমি তো আপনার জন্য ভেবে-ভেবে সারা। শেষে বড়মামা খুঁজতে গেলেন আপনাকে।”
বেঁটে ভদ্রলোক একটু যেন চমকে গিয়েছিলেন। তারপর মিঠে হাসলেন। আসুন-আসুন! এতক্ষণ ফান্টু আপনার কথাই বলছিল। কাগজে ওর ছবি বেরোবে শুনে খুব ভাল লাগল।”
ফান্টু বলল, “আপনি পিশাচবাবার পাল্লায় পড়েননি তো রিপোর্টারদা!’
“নাঃ।” বলে বেতের চেয়ারে বসে পড়লুম। বেজায় ক্লান্ত। শুতে পেলে বাঁচি, এমন অবস্থা। শরীরের গিটে গিটে ব্যথা, যা বাঁধা বেঁধেছিল ব্যাটাচ্ছেলেরা! মাথা ঝিমঝিম করছে রহস্যের চোটে।
ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন। “আমার নাম চণ্ডীচরণ খাঁড়া। তুলোদা আমার মাসতুতো দাদা। আর বলবেন না স্যার! ভুসির বস্তায় মড়ার খুলি ঢুকিয়ে দিয়েছিল কেউ। নেহাতই রসিকতা। কিন্তু তুলোদর আবার সবতাতে বড় বাড়াবাড়ি। বেগুনখেতের কাকতাড়ুয়ার মাথায় সেটি বসিয়ে দিয়ে কেলেঙ্কারি বাধিয়েছেন। খবর পেয়ে ছুটে এলুম। হচ্ছেটা কী, হাতে নাতে দেখে তারপর ব্যবস্থা।”
ফান্টু বলল, তোমাকে দেখে কিন্তু আর নড়ছে না, দেখছ ছোটমামা!
“নড়ুক না। তুলোদা’র চেয়ে আমার হাতের টিপ কেমন দেখিয়ে ছাড়ব!”
“কিন্তু বন্দুকে তো আর কার্টিজ নেই, ছোটমামা। বড়মামা দুটোই ফায়ার করে ফেলেছেন!” চণ্ডীবাবু বন্দুক মোচড় দিয়ে খালি কার্তুজ দুটো বের করে দেখে ফেলে দিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “তুলোদার একটুতেই বাড়াবাড়ি।”
ফান্টুও খুব হাসতে লাগল। “উড়ো পদ্য পেয়ে শেয়াল-ধরা ফাঁদ খুঁজতে জামাকাপড় ফাফাই হয়ে গেছে বড়মামার। বের করে আনতে সে এক ঝামেলা! মেজাজ খাপ্পা হয়েই ছিল, আরও খাপ্পা করে দিল।”
“কে?”
“আবার কে? কাকতাড়ুয়া।”
“নড়াচড়া করছিল নাকি?”
“তুমি শুনলে কী এতক্ষণ? পর পর দুটো ফায়ার করেও বড়মামার রাগ পড়তে চায় না। মুকুন্দদা আর রমজানদা এসে অনেক করে বোঝাল। তারপর মাথা ঠাণ্ডা হল। তারপর এই রিপোর্টারদার কথা বললুম। তখন বড়মামা রিপোর্টারদাকে খুঁজতে বেরোলেন টর্চ নিয়ে।
“হ্যাঁ রে ফান্টু, তুলোদা পিশাচবাবার পাল্লায় পড়েনি তো?”
ফান্টু একটু ভেবে বলল, “একটা কথা মাথায় আসছে ছোটমামা!”
“কী কথা বল তো?”
“বড়মামাকে পিশাচবাবা কিছু বলবে না। কেন জানো? আজ সন্ধে থেকে শ্মশানে তিনটে মড়া গেল।”
“গেল বটে। হরিধ্বনি দিচ্ছিল।”
“পিশাচবাবা এখন ওই তিনটে মড়া খেতেই ব্যস্ত। পেট ফুলে ঢোল হবে।”
‘ঠিক বলেছিস। বলে চণ্ডীবাবু আমার দিকে ঘুরলেন। “সওয়া দশটা বাজে প্রায়। স্যারকে খুব টায়ার্ড দেখাচ্ছে। ফান্টু, ওঁর খাওয়ার ব্যবস্থা কর। তোদের নন্দী-ভৃঙ্গীর সাড়া নেই–দ্যাখ, গাঁজা টেনে পড়ে আছে নাকি?
