হ্যাঁ আমার অনুমান সঠিক। ফান্টুর কাছে শোনা সেই ভাণ্ডারী মাস্টারমশাই। কিন্তু দেখলে হাসি পাবে বলেছিল, পেল না। একটু রোগা, টিঙটিঙে, একটু কুঁজো, প্রচণ্ড লম্বা নাক। চিবুক থেকে অন্তত আট ইঞ্চি লম্বা গোঁফের মতো দাড়ি ঝুলছে, আর মাথায় লম্বা সন্নেসি-চুল। মুখে অমায়িক হাসি। পরনের পাঞ্জাবি এত লম্বা যে, ধুতি ঢেকে ফেলেছে প্রায়।
গাছ ও ঝোঁপের ভেতর কোনওরকমে টিকে থাকা, দরজা জানালার কপাট লোপাট হওয়া, হাঁ-হাঁ করা একটা ঘর। ছোট্ট গেরস্থালি পাতা। ফান্টু বলেনি এখানেই কবি ভাণ্ডারীমশাইয়ের ডেরা। হয়তো সে জানে না এই ডেরার খবর। ভাণ্ডারীমশাই সাধুবেশী হালদারমশাইকে দেখে চোখ নাচিয়ে বললেন,
হচ্ছে সন্দেহ
সাধু নন অন্য কেহ।
হালদারমশাই নিশ্চয় পদ্য বানাতে পারেন না। কারণ তিনি জবাবে তার প্রসিদ্ধ “খি-খি-খি-খি” উপহার দিলেন। কর্নেল বললেন, “ঠিক ধরেছেন নন্দবাবু, ইনিই সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে কে হালদার।”
“তা হলে নমস্কার।” বলে কবিবর মিষ্টি হাসলেন।
ডিটেকটিভ এনেছে দণ্ডী।
খবর পেয়েই চণ্ডী।
কালীগঞ্জে প্রেজেন্ট।
একটা ইনসিডেন্ট
বাধতে পারে শেষটা–”
হালদারমশাই বলে উঠলেন, “কী এই কেসটা?”
কবি নন্দ ভাণ্ডারী কেটলিতে ফুটন্ত জলে চা-পাতা ফেলে, সেটা নামিয়ে রেখে দুধ গরম করতে দিলেন। তারপর তক্তাপোশের তলা থেকে কাপ-প্লেট বের করে বাইরে ধুতে গেলেন। হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের জবাব দিলেন না। কর্নেল মিটিমিটি হাসছিলেন। বললেন, “শেষটার সঙ্গে কেসটা বেশ মিলেছে হালদারমশাই।”
হালদারমশাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি হাসতে হাসতে বললুম, “কেসটা বুঝতে দরকার একটু চেষ্টা।”
হারদারমশাই একটু চটে গেলেন।”ধুর মশাই! খালি পদ্য। এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি। পদ্য-দ্য আমার আসে না। ওদিকে এতক্ষণ কী হচ্ছে কে জানে! বেগুনখেতে”
বাইরে থেকে কবিবর বললেন–
বেগুনখেতে রাতবিরেতে নাচত কাকতাড়ুয়া।
চুপিসাড়ে ঝোপেঝাড়ে বলত শেয়াল ক্যা হুয়া।
দণ্ডীবাবু ফন্দি করে যেই আনল ডিটেকটিভ।
চণ্ডীচরণ বুঝল তখন এবার সে ইনএফেকটিভ।
তারপর ঘরে ঢুকে দুধের পাত্র নামিয়ে কুকার নেবালেন। চা তৈরি করতে করতে ফের ভাণ্ডারীমশাই আপনমনে আস্তে বললেন,
“হচ্ছে ভয়।
কী হয়, কী হয়।
ছেলেটা যে বোকা।
জিনিয়াস একরোখা।
ওরে পোড়ামুখো।
তোর হাতেই হুঁকো।
খেয়ে যাচ্ছে ভূত—”
হালদারমশাই চটেই ছিলেন। বলে উঠলেন, “কী অদ্ভুত!”
কর্নেল তারিফ করার ভঙ্গিতে বললেন, “আসছে হালদারমশাই, আসছে!”
হালদারমশাই চমকে উঠে বললেন, “ক্কী!”
“পদ্য।”
আমি ফোড়ন না কেটে পারলুম না। “এবং ছন্দও।”
হালদারমশাই গুম হয়ে বসে রইলেন। মনে হল, যা ঘটছে সেটা তলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করছেন। কবি নন্দ ভাণ্ডারীর মুখেও সেই আমুদে ভাবটা নেই। হাতে-হাতে চা এগিয়ে দিলেন। প্রচণ্ড একটা ধকলের পর গরম চা আমাকে চাঙ্গা করতে থাকল। হালদারমশাইকেও বটে। কারণ তার সন্নেসি-মুখে প্রশান্তি ফুটতে শুরু করল। ভাণ্ডারীমশাই চা শেষ করে বললেন,
অনারেবল গেস্ট।
নাউ টেক রেস্ট।
ওয়ান থিং টু ক্লিয়ার।
ইফ ইউ হিয়ার
দা জ্যাকল হাউলস।
সামথিং ইজ ফাউল।
তক্তপোশের তলা থেকে তিনি একটা পুটুলি বের করলেন। তারপর সেটা বগলদাবা করে কর্নেলের দিকে চোখ নাচিয়ে মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলেন।
দেখলুম, হালদারমশাই কর্নেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। কর্নেল লণ্ঠনের দম কমিয়ে দিলেন। বললেন, “কী বুঝলেন বলুন হালদারমশাই!”
“প্রচুর–প্রচুর রহস্য।”
“হ্যাঁ, রহস্য প্রচুরই। আপনাকে বলেছিলুম, ‘ণ্ড’ বর্ণটি যেখানে, সেখানেই গণ্ডগোল। কবি নন্দলাল ভাণ্ডারীকেও দেখলেন। ণ্ড বর্ণটি তার নামেও আছে। কাজেই কিছু গণ্ডগোল তারও আছে, তবে সেটা মাথায়।”
আমি বললুম, “কিন্তু আপনার সঙ্গে এর পরিচয় হল কীভাবে?”
কর্নেল একটু হাসলেন। “গত একমাস যাবৎ নন্দবাবু আমাকে পদ্যে চিঠি লিখে আসছেন। পাগলের পাগলামি ভেবে গ্রাহ্য করিনি। তারপর কাগজে সত্যিই ভূতুড়ে কাকতাড়ুয়ার খবর বেরোল। আজ সকালে হালদারমশাই আর তুমি গেলে। হালদারমশাইয়ের কাছে দণ্ডীবাবুর আসার খবর পেলুম। তখন নন্দলালবাবুর পদ্যগুলোকে গুরুত্ব দিতেই হল। উনি লিখেছিলেন :
ভাঙা কেল্লাবাড়ি আমার ইদানীংকার আস্তানা।
মুখে দাড়ি দুজনকারই সেটাই চেনার রাস্তা না?
“অতএব পরস্পর চেনাচিনির অসুবিধে হয়নি।”
“শ্মশানে গিয়েছিলেন কেন?”
“হরিধ্বনি শুনেই নন্দবাবু আমাকে শ্মশানে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। উনি ভেবেছিলেন দণ্ডীবাবুকে কিডন্যাপ করা হচ্ছে। তো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলুম। আমাকে দেখে পিশাচবাবা ভেবে লোকগুলো খাঁটিয়া ফেলে পালিয়ে গেল। তখনও ভাবিনি, তোমাকে ওরা ধরে এনেছে! তোমার কান্নাকাটি শুনে তবে বুঝলুম”।
“মোটেও কান্নাকাটি নয়” প্রতিবাদ করলুম। “আমি যে জ্যান্ত মানুষ, সেটাই জানাতে চাইছিলুম।”
হালদারমশাই প্রচণ্ডভাবে খি-খি-খি-খি করলেন এতক্ষণে। তারপর বললেন, “খাইছে আর কি!”
বললুম, “কিন্তু পিশাচবাবার ব্যাপার কী? ফান্টুও বলছিল, তাকে দেখেছে।”
কর্নেল বললেন, “কাটরার মাঠের নরমাংসভোজী পিশাচবাবার থান তোমাকে বলেছিলুম, মনে নেই? শুনলুম দণ্ডীবাবু আর চণ্ডীবাবু দুজনেরই দিকে নাকি তার নজর।”
