কয়েক হাত নিচেই গঙ্গা। বেগড়বাঁই না করে হুকুম তামিল করলুম। তারপর সত্যিই ঘিলু চাঙ্গা হল এবং রুমাল বের করে মুখ মুছতে-মুছতে বললুম, “তা হলে স্বপ্ন নয়!”
“নয়, সেটা এখনও বুঝতে না পারলে আরও খানিকটা জলের ঝাঁপটা দাও।”
“দরকার হবে না। কিন্তু আমাকে উদ্ধারের জন্য আপনি কি মন্ত্রবলে উড়ে এলেন কলকাতা থেকে?”
“মন্ত্রবলে নয়, ডার্লিং! চার চাকার মোটরগাড়িতে–এক্সপ্রেস বাসে।”
“কিন্তু রাতবিরেতে এই শ্মশানে ছুটে আসার কারণ কী? “পিশাচবাবার হুকুমে। তার সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেছে।”
প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, দূরে বিকট চাঁচানি শোনা গেল, “বলো হরি! হরি বো-ওল! বলো হরি! হরি বো-ও-ল!” কর্নেল আমাকে টানতে-টানতে ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে গেলেন। কঁধ ধরে ঠেলে বসিয়ে দিলেন। কিন্তু নিজে দাঁড়িয়ে রইলেন। ফিসফিসিয়ে বলে উঠলুম, “ওরা নির্ঘাত হালদারমশাইকে আমার মতো বেঁধে আনছে। উনি শিবমন্দিরে সাধু সেজে-”
“চুপ! স্পিকটি নট।”
চুপ করে থাকলুম। হরিধ্বনি ক্রমশ এগিয়ে আসছে। সাবধানে উঁকি মেরে দেখলুম, একটু দূরে চার ছায়ামূর্তি কী একটা বয়ে আনছে! তবে খাঁটিয়া নয়। কাছাকাছি আসামাত্র কর্নেল বিদঘুঁটে গলায় একখানা হুঙ্কার ছাড়লেন, কতকটা বাঘের গজরানির মতো।
শোনামাত্র ওরা থমকে দাঁড়াল। তারপর কাঁধের লম্বাটে জিনিসটা ফেলে দিয়ে পিটটান দিল। কর্নেল দৌড়ে গেলেন। আমিও।
হ্যাঁ, জটাজুটধারী হালদারমশাই-ই বটে। মুখে টেপ সাঁটা আমারই মতো। আগাগোড়া দড়ি জড়ানো গায়ে। আশ্চর্য ব্যাপার, জটা ও দাড়ি খুলে যায়নি এবং কাঁধ থেকে ফেলে দেওয়ায় চোটও খাননি। কর্নেল বাঁধন খুলে দিতেই প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দুই ঠ্যাঙে সিধে দাঁড়ালেন এবং জটা-দাড়ি নিজেই খুললেন। দেখলুম, টেপটি নকল গোঁফদাড়ির সঙ্গে সেঁটে থাকায় ওঁর সুবিধে হয়েছে বেশি। সহজেই খুলে গেল।
তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার, আলখাল্লাধারী হালদারমশাই অবাক হলেন না কর্নেলকে দেখে। মুখ দিয়ে যে ধ্বনি বেরোল, তা হল, “খি-খি-খি-খি….!”
কর্নেল বললেন, “আছাড় খেয়ে ব্যথা লাগেনি তো হালদারমশাই?”
“হঃ কি যে কন! সয়েল না, স্যান্ড। বালু, বালু!” বলে খালি পায়ে বুড়ো আঙুলে নরম মাটির অবস্থাটা বুঝিয়ে দিলেন।
কর্নেল বললেন, “মুখে জলের ঝাঁপটা দিয়ে নিন বরং–”
“ক্যান?”
“আপনার ওপর এমন একটা সাঙ্ঘাতিক ধকল গেল। মনে হচ্ছে, এখন আপনি ধাতস্থ হতে পারেননি।”
“অ্যাঁ! হালদারমশাই এতক্ষণে চমকালেন। কর্নেল এবং আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে লম্বা পায়ে জলের ধারে গেলেন।
একটু পরে আলখাল্লায় মুখ মুছতে মুছতে ফিরে এসে বললেন, “ক্কী…..ক্কী আশ্চর্য ঘটনা। কর্নেল স্যার, আপনি? এতক্ষণ তাই চেনাচেনা ঠেকছিল। আপনি কখন এলেন? আর এই শ্মশান-মশান জায়গায় কী…কী অবাক!”
কর্নেল বললেন, “সব কথা পরে হবে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয় হালদারমশাই! যে-কোনও সময়ে পিশাচবাবার আবির্ভাব ঘটতে পারে। চলুন, কেটে পড়া যাক।”
হালদারমশাই বললেন, “পিশাচবাবা! সে আবার কে?”
“ভুলে গেছেন দেখছি। নোটবইতে টুকেছিলেন না?”
হালদারমশাই চুপ করে গেলেন।
জ্যোৎস্না খানিকটা ঝলমলে হয়েছে। কোথাও গমখেত, কোথাও ধবধবে সাদা ন্যাড়া চষা-মাটি, কোথাও ঝোঁপঝাড় আর গাছের জটলা। মাঠের মধ্যে দূরে বা কাছে বিদ্যুতের আলো দুলদুল করছিল। বাঁ দিকে পশ্চিমে সোজা এগিয়ে সামনে কালো চাপ-চাপ উঁচু-নিচু পাঁচিলের মতো জিনিসটা দেখিয়ে কর্নেল বললেন, “কেল্লাবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।”
জিজ্ঞেস করলুম, “ওখানে গিয়ে কী হবে? বরং দণ্ডীবাবুর ফার্মে যাই চলুন।”
কর্নেল আস্তে আস্তে বললেন, “এসো তো।” তারপর পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বেলে নাড়তে থাকলেন।
কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্কৃপের দিকে একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোটা এদিকে-ওদিকে নড়াচড়া করে নিবে গেল। কর্নেলও টর্চ নেবালেন। আলখাল্লাধারী হালদারমশাই বললেন, “এক মিনিট! এক মিনিট! জটা-দাড়ি না পরলে এ পোশাকে বড্ড বিচ্ছিরি দেখাবে। জয়ন্তবাবু, একটু হেল্প করুন। বিটকেল টেপটা ছাড়ানো যাচ্ছে না।”
টেপটা ছাড়িয়ে দিলুম। কিন্তু কিছু গোঁফ আটকে থাকল তাতে। হালদারমশাই সেটা ফেলে দিয়ে কষে জটা-দাড়ি আঁটলেন। তারপর বললেন, “চলুন, আই অ্যাম রেডি অ্যান্ড স্টেডি।”
পায়ের কাছে আলো ফেলে কর্নেল আগে হাঁটছিলেন। একটু পরে শুকনো খাল অর্থাৎ গড়খাইয়ের সামনে পৌঁছলুম। সাবধানে নেমে গেলুম। নরম দূর্বাঘাসে গড়খাইটা ভরে আছে। ওপারের ঢালে একফালি পায়ে-চলা রাস্তা। উঠতে অসুবিধে হল না। রাস্তার ওপর ঝোঁপঝাড় ঝুঁকে রয়েছে। সামনে আবার সেই রহস্যময় টর্চের আলো জ্বলে উঠল। কর্নেল সাড়া দিয়ে বললেন, “সঙ্গে গেস্ট আছে নন্দবাবু! আগে চা দরকার! হবে তো?”
অবাক কাণ্ড! জবাব পদ্যে এল :
খাবেন নেহাত চা
সে আর এমন কী।
কুকারে কেটলিটাও
চাপিয়ে রেখেছি।
গেস্ট পেলে তো ধন্যই
প্রস্তুত সেজন্য।।
কর্নেল থামিয়ে না-দিলে পদ্যটা চলত। তবে মজাটা হল, কর্নেলও পদ্যেই থামলেন :
যথেষ্ট যথেষ্ট
খামোকা কেন কষ্ট।।
একটা লণ্ঠন জ্বালানো হচ্ছিল। জবাব এল ফের পদ্যেই এবং সঙ্গে সঙ্গে চাপা খিকখিক হাসি :
পদ্য বলা কষ্ট নয় বদভ্যাস
ব্রেনে যদি বসত করেন বেদব্যাস।।
