তারপরেই আচমকা উলটে পড়ে গেলুম।
হোঁচট খেয়ে পড়িনি। কে বা কারা পেছনে ঝোঁপের আড়াল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমার ওপর। টু শব্দটি করার সুযোগ পেলুম না। আমার মুখে টেপ সেঁটে দিল। তারপর আমার হাতদুটো পিঠমোড়া করে বাঁধতে বাঁধতে কেউ ফিসফিসিয়ে বলল, “চুপচাপ না থাকলে শ্বাসনলি কেটে যাবে।” কাজেই চুপচাপ থাকতেই হল। শ্বাসনলি কাটা মড়া হয়ে এখানে পড়ে থাকার মানে হয় না।
.
চার
কিন্তু তারপর সত্যিই আমাকে মড়া হতে হল, শ্বাসনলি কাটা না হলেও। অর্থাৎ জ্যান্ত মড়া। পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলুম, একটা খাঁটিয়া এল। চারটে ছায়ামূর্তি এসে খাঁটিয়ায় আমাকে তুলে চিতপাত শুইয়ে দিল। তারপর খাঁটিয়া কাঁধে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, “বলো হরি! হরি বো-ও-ল!”
মন্দির চত্বরে ধুনির আলোয় জটাজুটধারী হালদারমশাইকে স্পষ্ট দেখলুম, উঁচুতে থাকার দরুন। চোখ বুজে ধ্যানস্থ। মাত্র হাত-দশেক পাশ দিয়ে খাঁটিয়ায় শুয়ে শ্মশানযাত্রার পথে মনে-মনে ওঁর মুণ্ডুপাত করছিলুম তাকিয়ে তো দেখবেন কী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! বিকট স্বরে হরিধ্বনি কানে যাচ্ছে, একবার অন্তত মুখ তুলে চোখ ভোলা উচিত ছিল না কি?
বটতলার পর ফাঁকা মাঠ। এখানে-ওখানে ঝোঁপঝাড়, কিছু গাছ। এতক্ষণে প্রচণ্ড ভয়ে সিটিয়ে গেলুম। রসিকতা বলে মনে হচ্ছে না। আর, মড়ার খাঁটিয়ায় তোলার সময় যদিও তাই ভেবেছিলুম। এরা নির্ঘাত আমাকে চিতায় শুইয়ে আগুন জ্বেলে দেবে, তাই যত হরিধ্বনি দিচ্ছে, তত চমকে-চমকে উঠছি। হৃৎপিণ্ড তুমুল লাফালাফি করছে।
অন্তত আধ-কিলোমিটার পরে খাঁটিয়া মাটিতে নামল। চাঁদটা গঙ্গার ওপর থেকে ফান্টুর মতো কার্টুনহাসি হাসছে আমার দুশা দেখে। এবার ছায়া মূর্তি চতুষ্টয় আমাকে খাঁটিয়ার সঙ্গে সেঁটে আগাগোড়া বাধল। একজন শিশি শব্দে হেসে ভূতুড়ে গলায় বলল, “জলে ফেলে দে রে, তলিয়ে যাক।”
অন্যজন বলল, “পাঁজাটাক কাঠ থাকলে চিতেয় দিতুম।”
আরেকজন বলল, “অ্যাই, আর এখানে নয় দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ভূতুড়ে গলাটি সেইরকম শিশি করে হেসে বলল, “পিশেচবাবা এসে কড়মড়িয়ে খাবে বরং। চ, এবার সাধুবাবার একটা ব্যবস্থা করি।”
একজন হঠাৎ নড়ে উঠল। “অ্যাই! পিশেচবাবা আসছে!”
চারজন বিকট স্বরে’”বলো হরি! হরি বো-ও-ল” বলতে বলতে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেল। জায়গাটা যে শ্মশান, পোড়া কাঠের গন্ধে অনুমান করতে পারছিলুম। খাঁটিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে বাঁধায় এখন আমার নড়াচড়ার সাধ্যি নেই। অতি কষ্টে চোখের তারা কোণস্থ করে জ্যোৎস্না ঝিলমিল জল এবং একটা উঁচু ন্যাড়া গাছ দেখতে পাচ্ছিলুম। শিমুলগাছই হবে। সেখান থেকে অলক্ষণে পাচার ডাক শোন গেল। তারপর দূরে ডেকে উঠল একটা শেয়াল–সেই শেয়ালটাও হতে পারে। শেয়ালের ডাক থামলে শুকনো পাতায় খড়খড় মসমস শব্দ শোনা গেল। পিশেচবাবা বলতে নিশ্চয় পিশাচ, যাকে ফান্টু দেখেছে এবং সেই পিশাচ নরমাংসভোজী হওয়াই সম্ভব! এখন কথা হল, আসছে, দুষ্টু-চতুষ্টয় তাকে আসতে দেখে পালিয়ে গেল। খড়মড়, খসখস শব্দ ক্রমাগত শুনছি। সে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, তাও বুঝতে পারছি। পিশাচ বলে যদি কিছু সত্যিই থাকে, তার জ্যান্ত মাংসে অরুচি হলে তবেই আমার বাঁচার চান্স অন্তত নব্বই শতাংশ। নইলে তো গেছিই!
ভেবে ঠিক করলুম, গোঁ-গোঁ আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে দেব, আমি মড়া নই, জ্যান্ত। খড়খড় খসখস শব্দটা আমার বাঁদিকে ঝোঁপের ওধারে এসে থেমে গেল। চোখ কোণস্থ করে ঝোঁপের ওধারে লম্বাচওড়া পিশাচবাবার ছায়ামূর্তিও দেখতে পেলুম।
অমনি নাকে যথাসাধ্য দম টেনে নিয়ে সেই দম টেপআঁটা মুখ দিয়ে জোর ওঁ কিংবা গোঁ ধ্বনিসহযোগে ঠেলে দিলুম। ফুটুত করে একটা শব্দ হল এবং টেপটির একদিক উপড়ে গেল।
টের পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম, “পিশাচবাবা, আমি মড়া নই, জ্যান্ত মানুষ!”
অমনি বিদঘুঁটে গলায় পিশাচবাবা বলল, “হাউ মাউ খাঁউ! মানুষের গন্ধ পাঁউ!” তারপর ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে খাঁটিয়ার পাশে এসে দাঁড়াল এবং হা-হা-হা-হা করে অট্টহাসি হাসল।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, অট্টহাসিটা চেনা ঠেকছে। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, পিশাচবাবার মুখে সাদা দাড়ি। জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পরনে জ্যাকেট ও পাতলুন। গলা থেকে ঝুলন্ত ক্যামেরা ও বাইনোকুলার। মাথায় টুপি। পিঠে কিটব্যাগ আঁটা। হাতে একটি ছড়িও দেখতে পাচ্ছি। হু, ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে এরকম অসুখ আছে! সেই অসুখে ধরলে মানুষ ভুলভাল দেখে শুনেছি।
অথবা মৃত্যুকালীন সুখস্বপ্ন! অবশ্য, যক্ষ-ক্ষ-ভূত-প্রেত-পিশাচ নানারকম রূপ ধরতেও পটু। এই শ্মশানের মানুষখেকো পিশাচবাবা আমাকে কামড়ে খাওয়ার সময় যাতে বেশি চাচামেচি, কান্নাকাটি না করি, সেজন্যই আমার সুপরিচিত রূপটি ধরেই দেখা দিয়েছে এবং কোন্ জায়গা থেকে খেতে শুরু করবে, তাই নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। মরিয়া হয়ে চোখ বুজে ফেললুম।
তারপর টের পেলুম, দড়িগুলো ঢিলে হয়ে যাচ্ছে! পায়ের দড়ি খুলে গেল এবং ছদ্মরূপধারী পিশাচবাবা আমাকে ঠেলে অন্যপাশে কাত করে হাতের দড়িও খুলে দিল। এমন সুযোগ ছাড়া উচিত নয়। তড়াক করে উঠেই পালানোর চেষ্টা করলুম।
কিন্তু পারলুম না। আমার কাঁধে থাবা পড়ল এবং আবার সেই হা-হা-হা-হা অট্টহাসি। “জল ডার্লিং! এ-মুহূর্তে খানিক জল দরকার। চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিলে ঘিলু চাঙ্গা হবে। ওঠো, উঠে পড়ো।”
