বারকতক হোয়া-হোয়া করে ডেকে শেয়ালটা চুপ করে গেল। কেমন একটা ভয়-জাগানো অনুভূতি আর গা ছমছম করা ভাব পেয়ে বসল আমাকে। আবছা জ্যোৎস্নায় নিঝুম পরিবেশের ভেতর ফান্টুর দেখা পিশাচটার সবে ঘুম ভাঙল বুঝি! একটা প্যাচা ক্রাও-ক্রাও করে ডাকতে ডাকতে শিবমন্দিরের দিকে চলে গেল।
মুকুন্দের ডাকে রমজান চলে গেল। দণ্ডীমশাই আস্তে বললেন, “চ্যালেঞ্জ না কী বলছিলেন যেন?”
“হ্যাঁ। পদ্যটা কেমন যেন রহস্যজনক!”
দণ্ডীমশাই কাগজটা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মন দিয়ে পড়লেন। তারপর বাঁকা মুখে বললেন, “খুলি উড়িয়ে দেব। ফিচলেমি করে দেখুক না! ঢের ফাঁদ আমার দেখা আছে।”
বলে উঠে দাঁড়ালেন। কাঁধে বন্দুক, এক হাতে লম্বা টর্চ। বেগুনখেতের দিকে আলো ফেলতে ফেলতে এগিয়ে গেলেন। সাহসী মানুষ, সন্দেহ নেই। চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতেই গেলেন নিশ্চয়!
একটু পরে কাকতাড়ুয়াটির ওপর তার টর্চের আলো পড়লে আঁতকে উঠলুম। পাঞ্জাবি পরে কাকতাড়ুয়ার খুলি-মুণ্ডুটি দাঁত বের করে আঁধার চোখে তাকিয়ে যেন হিহি করে হাসছে। দৃষ্টি সরিয়ে নিলুম সঙ্গে সঙ্গে।
ফান্টু এসে গেল। “রিপোর্টারদা, প্রিন্স অ্যালবার্ট মুখ খুলেছে। মামা কোথায়?
বললুম, “তোমার মামা বেগুনখেতে ঢুকেছেন।”
ফান্টু জোরালো হেসে বলল, “এই রে, কাঁটায় আটকে ফঁদে পড়ার অবস্থা হবে সেদিনকার মতো। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বেগুনখেতে ঢুকলে কী হয়, এখনও শিক্ষা হয়নি মামার?”
“আচ্ছা” ফান্টু, তুমি পদ্য লেখো কি?”
ফান্টু কান পর্যন্ত হাসি টেনে একটু পরে বলল, “লিখতে ইচ্ছে করে রিপোর্টারদা। পারি না। বেগুনের সঙ্গে মিল দিতে গেলে সেগুন আনতে হয়। কিন্তু বেগুন আর সেগুনে কত তফাত, বলুন!”
“আহা, তুমি পদ্য লিখেছ কি না জানতে চাইছি।”
“নাঃ, পোষায় না। ততক্ষণ সয়েল টেস্ট করতে মাথা ঘামানো ভাল।” ফান্টু ঠিক কর্নেলের মতোই চুল থেকে একটা পোকা বের করে উড়িয়ে দিল। দিয়ে বলল, “তবে এই এরিয়ায় পদ্য লিখতে পারে একজনই। কাগজে ছাপাও হয়।”
“কে তিনি?”
“ভাণ্ডারী মাস্টারমশাই!” ফান্টু প্রশংসা করে বলল। “আমাদের স্কুলে বাংলা পড়াতেন। রিটায়ার করেছেন গতবছর। বিকেলে গঙ্গার ধারে একলা ঘুরে বেড়ান। মাথায় লম্বা চুল, চিবুকে তেমনি লম্বা একগোছা ছুঁচলো দাড়ি। ওঁকে দেখে আপনি হেসে সারা হবেন। কিন্তু গুণী মানুষ।”
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে ফান্টু চাপা স্বরে ফের বলল, “মামা জানতে পারলে বকবেন। কিন্তু লুকিয়ে ফার্মের এটা-সেটা দিয়ে আসি। খুব গরিব হয়ে গেছেন ভাণ্ডারীমশাই! সেদিন একটা বেগুন পেয়ে দেখুন না, একখানা পদ্য দিয়েছেন। দারুণ পদ্য।”
ফান্টু ঘরে ঢুকে পদ্যটা নিয়ে এল। ভাণ্ডারী-তে ‘ণ্ড’ আছে। শুনেই অস্বস্তি লেগেছিল। এবার হাতের লেখা দেখে অস্বস্তিটা বেড়ে গেল এবং রহস্যটা জটিল হয়ে পড়ল।
একই ছাঁদের হরফ। তবে নীলচে কালিতে লেখা।
কেল্লাবাড়ির দারোয়ানের বংশ
তাই পদবী দণ্ডী
তারই এক মাসতুতো ভাই চণ্ডী
চোর-জোচ্চোর দেশটা করছে ধ্বংস
হস্তে তৌল দণ্ড
পাষণ্ড আর ভণ্ড
বেচছে ভেজাল ভুসি ও খোল সর্ষের
ষণ্ডদুটি আছে বড়ই হর্ষে
অ্যায়সা দিন নেহি রহেগা বাপ
বস্তার ভেতর রাস্তা ঢুঁড়ছে সাপ!
পদ্যটা পড়ে বললুম, “এর মানে কী বলো তো? ‘বস্তার ভেতর রাস্তা টুড়ছে সাপ। একথা কেন লিখেছেন ভাণ্ডারীমশাই?”
ফান্টু বলল, “পদ্যের আবার মানে থাকে নাকি? পদ্য পদ্য। কই, দিন। লুকিয়ে রেখে আসি। মামা দেখলেই হয়েছে!”
“এটা আমার কাছে থাক, ফান্টু।”
“রাখবেন, রাখুন। কিন্তু সাবধান রিপোর্টারদা, মামার চোখে যেন পা পড়ে!”
“না, না। তুমি ভেবো না।” বলে পদ্যটা ভাঁজ করে জ্যাকেটের ভেতর পকেটে চালান করে দিলুম। শিগগির হালদারমশাইকে দেখানো দরকার। মুকুন্দের কথায় টের পেয়েছি, শিবমন্দিরের সাধুটি কে!
এইসময় বেগুনখেতের দিক থেকে দণ্ডীবাবুর ডাক শোনা গেল, “ফান্টু, ফান্টু।”
ফান্টু বলল, “এই রে! যা ভেবেছিলুম। মামা আটকে গেছেন কাঁটায়!” সে ঘরে ঢুকে একটা কাটারি বের করে নিয়ে দৌড়ে গেল।
অবস্থাটা দেখার জন্য এগিয়ে গেলুম। বেগুনখেতের অনেকটা ভেতরে আবছা জ্যোৎস্নায় একটা কালো মূর্তির বুক থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। খুব নড়াচড়া করছেন দণ্ডীমশাই। ফান্টু বুক সমান উঁচু বেগুনগাছের জঙ্গলে দিব্যি ঢুকে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, টর্চ কী হল মামা?”
দণ্ডীবাবু চি চি করুণ স্বরে বললেন, “কাটা ছাড়াতে গিয়ে কোথায় পড়ে গেছে। খুঁজে পাচ্ছিনে!”
“বন্দুক পড়ে যায়নি তো?”
“না, না! খালি কথা বাড়ায়। অ্যাই যাঃ! গেল, নতুন জামাকাপড় পর্দাফাই হয়ে গেল। কী…কী সাঙ্ঘাতিক বেগুনগাছ রে বাবা! যেন জ্যান্ত! নড়লেই খিমচি”উঃ! ইঃ!”
আমার কাছে টর্চ আছে। কিন্তু দণ্ডীবাবুর দুর্দশা উপভোগ করার চেয়ে এই সুযোগে ঝটপট ভাণ্ডারীমশাইয়ের পদ্যটা শিবমন্দিরে সাধুবেশী গোয়েন্দার কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি মনে হল। ফার্মের মাঝ-বরাবর একচিলতে রাস্তা। দু’ধারে সুন্দর কেয়ারি-করা বেড়া-গাছ। গেট খুলে গঙ্গার ধারে ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতর দিয়ে সাবধানে পায়ের কাছে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে দক্ষিণ পূর্ব কোণে শিব মন্দিরের দিকে চললুম। কানে ভেসে এল, ‘ঔং হ্রীং ক্লীং ফটু ফটু মারয় মারয় তাড়ায় তাড়ায় স্বাহা!’ তারপর ধুনির আলোও চোখে পড়ল।
