ফান্টু বড় আকারে নিঃশব্দে হেসে বলল, “হিমালয়ে গেলে সাধুবাবার দেখা পেয়ে যাবে, মামা।”
“যাচ্ছি!” দণ্ডীবাবু ভেংচিকাটা মুখ করে বললেন, “বলিস তোর পিশাচব্যাটাচ্ছেলেকে, দণ্ডীবাবু লড়ে যাচ্ছে, লড়বে। কাকতাড়ুয়া নই, দু’ঠেঙে মানুষ। হাতে বন্দুক। খুলি উড়িয়ে দেব।”
এ-সব কথার নিশ্চয় একটা মানে আছে, আমার বুঝে নেওয়ার দরকার। তাই বললুম, “দণ্ডীমশাই, পিশাচটি আপনার মতে মানুষ?”
আমার কথা শেষ করার আগেই দণ্ডীবাবু বললেন, “আলবাত মানুষ। নইলে রক্তের ছাপ কেন? বেগুনখেতের পেছনকার কাঁটাতারের বেড়ায় খোদল ছিল কেন? বুঝলেন না! প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড বেগুনগাছ। ঝকড়া ইয়াব্বড় পাতা। ব্যাটাচ্ছেলে করে কি, বেড়ার খোদল দিয়ে গুঁড়ি মেরে বেগুনখেতে ঢোকে। ঢুকে কাকতাড়ুয়ার নিচেটা ওপড়ায়। গুঁড়ি মেরে সেটাকে নাচাতে নাচাতে খেতময় ঘোরে আর ভূতুড়ে সুর ভাঁজে, ওই দেখেই ভয় পেয়ে আমি ফার্মহাউসে রাত্রিবাস ছেড়ে দেব। দিচ্ছি! যাও-বা কোনও-কোনও রাতে বাড়িতে থাকতুম, আর থাকছি না। দেখি তোমার দৌড়!”
বললুম, “ব্যাপারটা পরিষ্কার হল এতক্ষণে। কিন্তু কে সে?”
দণ্ডীবাবু ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “সেটাই তো বোঝা গেল না!” তারপর চাপা স্বরে ফের বললেন, “সেজন্যই ডিটেকটিভ এজেন্সিতে যাওয়া। বুঝলেন না?”
“হুঁ, এ তো স্পষ্ট, কেউ বা কারা আপনার ফার্মহাউসে রাত্তিরে থাকা পছন্দ করছে না।”
“করছে না?”
“কিন্তু কেন?” দণ্ডীবাবু এবার আমার ওপর চটলেন। “আহা, সেজন্যই তো ডিটেকটিভ ভাড়া করা। আপনাদের কাগজের লোকেরা খালি প্রশ্ন করতেই জানেন। তলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করেন না।” বলে ফের আগের মতোই বেমানান একটি ফাঁচ করলেন, অর্থাৎ হাসলেন। “সরি, আপনি আমার গেস্ট। কিছু মনে করবেন না। ব্যাপারটা যত ভাবছি, তত প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। আমি মশাই টি, আর দণ্ডী, এ তল্লাটের বাঘ বলে আমাকে। আর আমাকে ওই বিটকেল কাকতাড়ুয়ার নাচ দেখিয়ে ভড়কাননার চেষ্টা! বড্ড অপমানজনক ব্যাপার নয়? বলুন আপনি!”
সায় দিয়ে বললুম, “সত্যি অপমানজনক। তবে আপনি বলছিলেন, জেলাসি!”
দুঃখিত মুখে অর্থাৎ আরও তেতো গেলার ভলিতে দণ্ডীবাবু বললেন, “আপাতদৃষ্টে জেলাসিই মনে হচ্ছে। এর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না। দেখি, ডিটেকটিভদ্রলোক কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করতে পারেন কি না!”
ফান্টু আমাদের দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ কথা শুনছিল। এতক্ষণে বলল, “রিপোর্টারদা ক’টা বাজছে দেখুন তো?”
ঘড়ি দেখে বললুম, “ছ’টা তেতাল্লিশ!”
“আর সতেরো মিনিট পরে প্রিন্স অ্যালবার্ট ফুটতে শুরু করবে। যাই, কাছে গিয়ে বসে থাকি।”
ফান্টু উঠে দাঁড়ালে জিজ্ঞেস করলুম, “কী ফুল ফান্টু!”
ফান্টু বলল, “গোলাপ। দেখবেন তো আসুন না।”
দণ্ডীমশাই বললে, “দিনে দেখবেন জয়ন্তবাবু। ফান্টু বসে থাকতে হয় তো তুই থাকবি। খালি বাতিক।”
ফান্টু বলল, “রিপোর্টারদা, সকালে কিন্তু ফোটো তুলতে হবে। পুরো ফুটতে ভোর হয়ে যাবে। দেখবেন কত্ত বড় গোলাপ।”
সে চলে গেলে কর্নেলের কথা মনে পড়ল। হায় বৃদ্ধা প্রকৃতিবিদ! না এসে কী হারালেন, জানেন না। এই ফান্টুচন্দ্রের মধ্যে যেন কর্নেলের আদল। ছাদের বাগানে কোনও অর্কিডের ফুল ফোঁটার পথ চেয়ে উনি এমনি করে পাশে বসে রাত কাটান!
একটু পরে পূর্ব দিকে গঙ্গার ওপারে বিশাল লালরঙের জিনিসটি যে চাঁদ, বুঝতে সময় লাগল। রঙ বদলে চাঁদটা ছোট হলে মুকুন্দ গান গাইতে গাইতে দু’হাতে ব্যাগ নিয়ে ফিরল। রমজান তার সঙ্গে। দণ্ডীবাবু বললেন, “নন্দী-ভৃঙ্গী! বুঝলেন জয়ন্তবাবু? একজন গেল বাজারে একজন জমি দেখতে। ফিরবে জোড় বেঁধে। যত্ত সব!”
ওঁর চটে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারলুম না। মুকুন্দ মুচকি হেসে বলল, “স্যার, শিবমন্দিরে আবার এক সাধু এসে ধুনি জ্বেলেছেন দেখে এলুম। মাথায় পেল্লায় জটা।”
দণ্ডীবাবু বললেন, “তাহলে তো এ-রাতে শিবমন্দিরে তোদের মড়া গড়াবে।”
দু’জনেই জিভ কাটল। মুকুন্দ বলল, “বাবা ধ্যানে বসছেন। দেখে মনে হল ধ্যান ভাঙতে ভোর হয়ে যাবে। তাছাড়া স্যার, ঘরে গেস্ট। রাঁধাবাড়া ফেলে সাধুসঙ্গ করা কি উচিত?” সে হন্তদন্ত হয়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।
রমজান পকেট থেকে একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ বের করে চণ্ডীবাবুর হাতে দিল। বলল, “গেটের কাছে পড়ে ছিল। মুকুন্দ বলল, ফেলে দে। ফেলে দিলে চলে? যদি বেনামী চিঠি হয়! যা ভূতুড়ে কাণ্ড চলেছে রাতবিরেতে।”
দণ্ডীমশাই ব্যস্তভাবে পড়ে বললেন, “ধুস, পদ্য লিখেছে কেউ। ফান্টুও হতে পারে, কিচ্ছু বলা যায় না। নেচারের মধ্যে থাকলে মনে কত ভাব জাগে মানুষের!”
ওঁর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখি, লাল আঁকাবাঁকা হরফে লেখা আছে :
নিঝুম রাতে গাছগাছালির মাথার ওপর
উঠলে চাঁদ,
বেগুনখেতে পাততে যাব শেয়াল ধরার
ফিচেল ফাঁদ।
বললুম, “দণ্ডীবাবু পদ্যটা হয়তো নিছক পদ্য নয়। কেউ যেন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে! শেয়াল-ধরা ফঁদ পাততে আসবে বেগুনখেতে এবং ‘ফিচেল’ কথাটাও কেমন সন্দেহজনক!”
ঠিক এই সময় কোথায় বিকট শব্দে সত্যিই শেয়াল ডেকে উঠল। আমার বুক ধড়াস করে উঠেছিল। দণ্ডীমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “কাটারার মাঠে এখনও শেয়াল আছে তা হলে?”
রমজান বলল, “কেল্লাবাড়ির জঙ্গলে দু’একটা আছে। কখনও-সখনও ডাকে শুনেছি।”
